
নতুন সরকার রূপ নেবার পর দীর্ঘ চার বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবার শুরু হচ্ছে ১০০ দিনের কাজ প্রকল্প। গ্রামে-গঞ্জে উন্নয়নের নতুন জোয়ার আসার স্বপ্ন দেখছেন মানুষ। দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ থাকায় গ্রামীণ অর্থনীতির যে চাকা থমকে গিয়েছিল, তা ফের গতি পাওয়ার খবরে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। সরকারি এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, কারণ এই প্রকল্প গ্রামীণ পরিকাঠামো নির্মাণে এবং দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান করার ক্ষেত্রে এক শক্তিশালী হাতিয়ার। তবে উন্নয়নের এই বড়সড় আয়োজনে সাফল্যের আসল চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে ‘সর্বজনীন অংশগ্রহণ’-এর মধ্যে। অর্থাৎ, কোনো প্রকৃত শ্রমিক যেন তালিকা থেকে বাদ না যান।
মুর্শিদাবাদ , বাঁকুড়ার মতো জেলাগুলো রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড। মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জ বা ডোমকলের মতো এলাকায় কৃষিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশে এই প্রকল্প চাইলে কিন্তু সত্যিই নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে পারে। একইভাবে বাঁকুড়ার জয়পুর বা তালডাংরার মতো রুক্ষ অঞ্চলের মানুষদের জন্যও এই প্রকল্প এক অর্থে আশীর্বাদ । স্থানীয় প্রশাসন যেভাবে মাটি কাটার কাজ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের রূপরেখা তৈরি করছে, তা গ্রামীণ বাঁকুড়াকে নতুন রূপ দিতে পারে। তবে এসবের পাশাপাশি দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং, বাসন্তী বা বারুইপুরের মতো এলাকায় সাম্প্রতিক চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। জেলার বিডিও দপ্তরগুলোতে মানুষের যে ভিড় দেখা যাচ্ছে, তা কেবল কাজের দাবিতে নয়, বরং নিজের নাম ফের তালিকাভুক্ত করার আবেদন নিয়ে। ‘এসআইআর’ (SIR) বা সার্ভে লিস্টের ফিল্টারিং-এর চাপে পড়ে যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের বড় একটা অংশই প্রকৃত শ্রমিক বলে দাবি উঠেছে।
এই বঞ্চনা কেবল কাগজ-কলমের হিসাব নয়। ক্যানিং থেকে বারুইপুর—প্রতিটি বিডিও দপ্তরের সামনে এই হাহাকার প্রশাসনিক গাফিলতির দলিল। গত মাসে ক্যানিং-১ এবং বাসন্তী ব্লকের বিডিও অফিসের সামনে যে জনরোষ দেখা গিয়েছিল, তা ছিল এর উদাহরণ। শ্রমিকদের অভিযোগ ছিল, তাঁরা গত চার বছর কাজ পাননি, এখন অযোগ্য লিস্টে ঢুকে যাওয়ায় সমস্যা আরও প্রবল। প্রশাসন পুলিশ দিয়ে আন্দোলন সামলানোর চেষ্টা করলেও, মানুষের ক্ষোভের আঁচ যে প্রবল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাঁদের দাবি, স্রেফ কিছু নিয়ম আর প্রযুক্তির দোহাই দিয়ে যেন মানবিকতাকে বিসর্জন দেওয়া না হয়। তাঁদের দাবি, প্রশাসন স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্যদের মাধ্যমে ‘সমন্বয় শিবির’ আয়োজন করুক। সেখানে তালিকার বাইরে থাকা প্রকৃত শ্রমিকদের আবেদনপত্র যাচাই করা হোক। প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য, কিন্তু ভুল সংশোধনের জন্য একটি ‘স্পেশাল গ্রিভেন্স উইন্ডো’ খোলা যে প্রয়োজন, এই সত্যকেও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, অন্তত এই পরিস্থিতিতে।
বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশের বক্তব্য, তালিকার গলদ মেরামত করা মোটেও কঠিন নয়, যদি প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষ একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। এবং প্রকল্পটি সফল হলে রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র পুরোপুরি বদলে যাবে এতেও সন্দেহ নেই। কিন্তু তালিকার নামে এই যে বিভাজন—এটি কেবল সামাজিক বৈষম্যই তৈরি করবে না, বরং এই বঞ্চনার আগুন প্রশাসনের অন্দরেও পৌঁছতে পারে। ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের মতে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য সরিয়ে উন্নয়নের এই উৎসবে শেষ মানুষটিকেও শামিল করা জরুরি। কারণ, শক্তিশালী গ্রামই তো শক্তিশালী রাজ্যের মূল ভিত্তি।