
অনীক নেই। প্যানিক নেই। আপাতত আবার শান্তিকল্যাণ টালিগঞ্জের মধ্যবিত্ত পরিসরে। অনীকের ‘ভুতের ভবিষ্যৎ’ এক অন্য স্বপ্ন দেখিয়েছিল বাংলা ছবিকে। প্রেম, পরকীয়া, ক্রাইম, রিমেক-এর বাইরে ছকভাঙা বিনোদন।বাঙালি দর্শক সাদরে নিয়েছিল এই ভবিষ্যৎকে। কিন্তু ছকে বাঁধা টালিগঞ্জ বোধহয় ভয় পেয়েছিল এই ভবিষৎ দর্শনকে। তাই অনীক দত্তকে তাঁরা চিহ্নিত করলেন প্যানিক দত্ত হিসেবে। অনীক একা হয়ে গেলেন। নিঃসঙ্গ। আপন বন্ধুটিও সরে গেল তাঁর কাছ থেকে। অর্থ, কীর্তি, সচ্ছলতা সবই ছিল তাঁর। তবুও এক বিপন্ন বিস্ময় কাজ করল অনীকের রক্তে। স্ত্রীর ফ্ল্যাটের বন্ধ দরজায় একবার নক করে উঠে গেলেন সেই বহুতলের ছাদে। সেখান থেকেই নিজেকে উড়িয়ে দিলেন আদিগন্ত আকাশে। সমস্ত প্যানিকের অবসান।
একবিংশ শতাব্দীর দোলাচলে দাঁড়িয়ে, বিশ্বায়নের চাকচিক্যে যখন বাঙালি নিজের শিকড় আর মেরুদণ্ড দুটোই প্রায় হারাতে বসেছিল, তখন একগাল হেসে ভাঙাচোরা চশমাটা নাকের ওপর ঠেলে সমাজকে এক অদ্ভুত আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন অনীক দত্ত। সেই আয়নায় ধরা পড়েছিল আমাদের ভন্ডামি, আমাদের হারিয়ে যাওয়া বনেদিয়ানা আর আমাদেরই ঘরের কোণে জমে থাকা ধুলোবালি।

আজ তিনি নেই। কিন্তু রেখে গেছেন এক আশ্চর্য রূপকথা, যেখানে ভূত আর মানুষ পাশাপাশি বসে কফি হাউসের আড্ডা জমায়, যেখানে কর্পোরেট লোভের মুখে চুনকালি মাখিয়ে দেয় ইতিহাস। বাংলা চলচ্চিত্রের সেই ক্ষুরধার, আপোসহীন এবং প্রকৃত অর্থে ‘ভদ্রলোক’ পরিচালকের প্রয়াণে এক যুগের অবসান ঘটল।
অনীক দত্তের বেড়ে ওঠা কলকাতার এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে। তাঁর ঠাকুরদা নরেন্দ্র চন্দ্র দত্ত ছিলেন 'ইউনাইটেড ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া'-র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ফলে আভিজাত্য, বনেদিয়ানা এবং কলকাতার ইতিহাসকে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। এই পারিবারিক পটভূমি তাঁর ছবিতে বারবার ফিরে এসেছে— কখনও ক্ষীয়মাণ জমিদার বাড়ির দীর্ঘশ্বাসে, কখনও বা পুরনো কলকাতার স্থাপত্য রক্ষার আকুল আবেদনে।
কলকাতার পাঠ ভবন স্কুল ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ছাত্র অনীক দত্ত পড়াশোনার দিন থেকেই ছিলেন তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী। ইংরেজি সাহিত্য, বিশ্ব চলচ্চিত্র এবং বিজ্ঞাপনের দুনিয়া তাঁকে আকর্ষণ করত। চলচ্চিত্র পরিচালনায় আসার আগে তিনি দীর্ঘ সময় বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করেছেন। এই বিজ্ঞাপনী দুনিয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর ছবির চিত্রনাট্যকে করে তুলেছিল টানটান, চাবুকের মতো সংলাপ আর ভিজ্যুয়াল সেন্সকে করেছিল আন্তর্জাতিক মানের।
বাংলা সিনেমার দর্শকরা যখন হিন্দি ছবির সস্তা রিমেক অথবা অতি-আঁতেল মার্কা মেলোড্রামায় ক্লান্ত, ঠিক তখনই ধূমকেতুর মতো মুক্তি পেল ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’। অনীক দত্তের প্রথম ছবি। আসলে প্রথম ছবি অবশ্য ২০০৯ সালে তৈরি ‘যদুবাবুর নাতনী’, মুক্তি পায়নি।ৎকোনও বিশাল তারকা ছিল না, ছিল না মারমার-কাটকাট অ্যাকশন। কিন্তু যা ছিল, তা মেধা, মৌলিকতা এবং খাঁটি বাঙালি রসবোধ।

রামপুরহাটের জমিদার দর্পণারায়ণ চৌধুরী, থিয়েটারের নটী কদলীবালা, স্বাধীনতা সংগ্রামী আত্মপ্রকাশ ঘোষ, নকশালপন্থী বিপ্লব দাশগুপ্ত, কিংবা কার্গিল যুদ্ধের সিপাহী কড়া সিং— সমাজের বিভিন্ন সময়ের, বিভিন্ন স্তরের চরিত্রদের এক ছাদের তলায় এনে অনীক দত্ত তৈরি করলেন এক অভিনব রূপক। প্রোমোটার রাজ এবং হেরিটেজ ভবন ধ্বংসের বিরুদ্ধে এই ছবি ছিল এক তীব্র চপেটাঘাত। ছবির গান থেকে শুরু করে সংলাপ— আজও বাঙালির মুখে মুখে ঘোরে। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ শুধু বক্স অফিসে ইতিহাস গড়েনি, এটি আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা ক্লাসিকের তকমা পেয়েছে।
অনীক দত্তের ছবির মূল হাতিয়ার ছিল ব্যঙ্গাত্মক রসিকতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষকে সিরিয়াস জ্ঞান দেওয়ার চেয়ে হাসাতে হাসাতে তার ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া বেশি কার্যকর। তাঁর পরবর্তী ছবিগুলোতেও এই দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায় -আশ্চর্য প্রদীপ, ভবিষ্যতের ভূত, বরুণবাবুর বন্ধু এবং অপরাজিত। ২০২২-এ শেষ ছবি ‘যত কান্ড কলকাতাতেই’ অবশ্য অন্য ঘরানার - গোয়েন্দা গল্প। অনীক দত্ত কেবল ক্যামেরার পেছনেই সাহসী ছিলেন না, বাস্তব জীবনেও তিনি ছিলেন এক লড়াকু এবং স্পষ্টভাষী মানুষ। ২০১৯ সালে তাঁর ছবি ‘ভবিষ্যতের ভূত’ মুক্তির মাত্র একদিন পরেই কলকাতার প্রেক্ষাগৃহগুলো থেকে রহস্যজনকভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়। অভিযোগ ছিল, ছবিতে তৎকালীন শাসক দলের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। অনীক দত্ত দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। তিনি এবং কলকাতার সংস্কৃতি মহলের একাংশ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেন। সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত এই লড়াই গড়ায় এবং শীর্ষ আদালত বাকস্বাধীনতার পক্ষে রায় দিয়ে ছবিটিকে পুনরায় প্রদর্শনের নির্দেশ দেয়, রাজ্য সরকারকে জরিমানাও করে। এই ঘটনা প্রমাণ করেছিল যে, অনীক দত্ত তাঁর মেরুদণ্ডটি কখনও কোনও রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে বন্ধক রাখেননি। ২০২২ সালে অনীক দত্ত বাঙালিকে উপহার দেন তাঁর অন্যতম সেরা সৃষ্টি— ‘অপরাজিত’ । সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে ‘পথের পাঁচালী’ নির্মাণের পেছনের সংগ্রামকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলা সহজ ছিল না। চরিত্রদের নাম বদলে (অপরাজিত রায়) তিনি যে সিনেমাটিক ম্যাজিক তৈরি করলেন, তা দর্শক ও সমালোচক মহলকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।

জিতু কামালের মধ্যে সত্যজিৎ রায়ের অবয়ব ফুটিয়ে তোলা থেকে শুরু করে সাদা-কালো ফ্রেমে কাশফুলের সেই চেনা দৃশ্য তৈরি— অনীক দত্তর নিখুঁত কাজের প্রমাণ দেয় এই ছবি। দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্র উৎসবে ‘অপরাজিত’ প্রশংসিত হয়েছিল এবং প্রমাণ করেছিল যে অনীক দত্ত কেবল হাসির ছবি নয়, গম্ভীর ও ঐতিহাসিক বিষয়কেও সমান দক্ষতায় পরিচালনা করতে পারেন। শোনা গেছিল, অনীক 'অপরাজিত'র সিক্যুয়েল তৈরির কথা ভাবছিলেন। বাঙালি বঞ্চিত হল আর একটি ক্লাসিক থেকে।
কাজের বাইরে অনীক দত্ত ছিলেন একজন আদ্যোপান্ত আড্ডাপ্রিয় মানুষ। কফি হাউস হোক বা নন্দন চত্বর, তাঁর চশমার পেছনের চোখ দুটো সব সময় সমাজকে পর্যবেক্ষণ করত। তিনি ছিলেন অসম্ভব পড়ুয়া, বিলিতি সিনেমা ও সাহিত্যের সমঝদার, অথচ শিকড়ে জড়িয়ে থাকা একজন খাঁটি বাঙালি। তরুণ পরিচালকদের জন্য তিনি ছিলেন মস্ত বড় অনুপ্রেরণা। ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাঘুরি করা তাঁর স্বভাব ছিল না, তিনি নিজের শর্তে বাঁচতেন এবং নিজের শর্তেই সিনেমা বানাতেন।
অনীক দত্তের চলে যাওয়া কেবল একজন পরিচালকের চলে যাওয়া নয়, বাংলা সিনেমা থেকে এক ক্ষুরধার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে যাওয়া। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে হাসতে হাসতে প্রতিবাদ করতে হয়, কীভাবে নিজের সংস্কৃতিকে ভালবেসেও আধুনিক হওয়া যায়।
বাংলা সিনেমার ‘অপরাজিত’ পরিচালক অনীক দত্ত, আপনাকে কুর্ণিশ।