
পশ্চিমবঙ্গে লগ্নি খাতে খরা দীর্ঘদিনের। একে যত দিন গেছে, বাঙালি জাতিগতভাবে ব্যবসা- বিমুখ হয়ে পড়েছে, তায় ৩৪ বছরের বাম শাসনে নানা ছ্যুঁৎমার্গের কারণে উল্লেখযোগ্য লগ্নি হয়নি। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ছিল একটা বড় কারণ লগ্নিকারীদের ভয় পাওয়ার। স্বাধীনতার আগে স্থাপিত বাঙালি মালিকানার বড় বাণিজ্য সংস্থাগুলিও একে একে ঝাঁপ বন্ধ করেছে। টিমটিম করে টিকে আছে হাতে গোনা কয়েকটি।
অথচ ১৯৪৭ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত এমন অবস্থা ছিল না। দেশের ২৪% শিল্প ছিল এই রাজ্যেই। পাট, হেভি ইঞ্জিনিয়ারিং, ইস্পাত,কয়লা শিল্পে রমরমা করত বাংলার শিল্পাঙ্গন। সত্তরের দশকে উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি শিল্পের কফিনে প্রথম পেরেক। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত একটা বদ্ধ জলার মত ছিল পশ্চিমবঙ্গের শিল্পক্ষেত্র। নতুন শতাব্দীতে পা দিয়ে বামফ্রন্ট সরকার ইংরেজি ও কম্পিউটার বিরোধিতার ভুল বুঝতে পারল, সেইসঙ্গে লগ্নি টানার ব্যাপারে সচেষ্ট হল। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। উত্তর ও পশ্চিম ভারত বিনিয়োগ টানার খেলায় অনেক এগিয়ে গেছে। ফলে উৎপাদন শিল্পের মরা গাঙে আর জোয়ার এলো না। বদলে পরিষেবা শিল্প আর আইটি নির্ভর হয়ে উঠল পশ্চিমবঙ্গ। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে বড়সড় ব্রেক আসতে চলেছিল সিঙ্গুরে টাটার হাত ধরে। কিন্তু তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা ব্যানার্জির আন্দোলনে টাটারা রাজ্য ছাড়লেন। ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর বছর বছর বাণিজ্য সম্মেলন আর মউ সইয়ের বন্যা বইলেও বলার মত লগ্নির শিকে ছেঁড়েনি বাংলার ভাগ্যে।

২০২৬-এ উল্টে গেল রাজ্য রাজনীতির পট। ক্ষমতায় বিজেপি। প্রথমবারের মত পশ্চিমবঙ্গে ডবল ইঞ্জিন সরকার। জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য হয়ে মমতা ব্যানার্জি, কেন্দ্রের বঞ্চনার কাঁদুনি শুনে কান ঝালাপালা হয়ে যাওয়া বাঙালি আশায় বুক বেঁধেছে, এবার রাজ্যের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। উচ্চশিক্ষিত চাকরিপ্রার্থী হোক কি পরিযায়ী শ্রমিক, কারোকে আর ভিনদেশে, ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে হবে না কাজের খোঁজে। এই পরিস্থিতিতে বাংলার রঙ্গমঞ্চে আদানির প্রবেশ। সম্প্রতি আদানি পোর্টস অ্যান্ড এস ই জেড-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও গৌতম আদানির পুত্র করন আদানি নবান্নে এসে দেখা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে। এরাজ্যে তাদের যে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া থমকে গেছিল তৃণমূল সরকারের সঙ্গে মতান্তরে, তা ফের চালু করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
আদানি গ্রুপ পশ্চিমবঙ্গের প্রধান পরিকাঠামো, লজিস্টিকস এবং শক্তি খাতে ১০,০০০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই বিনিয়োগের মূল ক্ষেত্রগুলি হলো প্রস্তাবিত ২৫,০০০ কোটি টাকার গভীর সমুদ্র বন্দর, হলদিয়া বন্দরের আধুনিকীকরণ এবং গ্রিন এনার্জি, এফএমসিজি ও ডেটা সেন্টার খাতে সম্প্রসারণ।
আদানির বিনিয়োগ ঘিরে সমস্যা নেই, সমস্যা ঐ গোষ্ঠীর আগ্রাসী মনোভাব ও দুর্নীতির ট্র্যাক রেকর্ড নিয়ে। যা ইতিমধ্যেই টের পাওয়া গেছে পূর্বাঞ্চলের অন্য রাজ্যগুলিতে। অসম, বিহার ওড়িশায় আগে থেকেই সক্রিয় কেন্দ্রীয় সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আদানি গোষ্ঠী।
আদানিরা অসমের দুটি প্রধান শক্তি প্রকল্পে প্রায় ৬৩,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে, যা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বেসরকারি খাতের বৃহত্তম বিনিয়োগ। আদানি গ্রুপ আগামী তিন থেকে চার বছরে বিহারে জ্বালানি, লজিস্টিকস, সিমেন্ট এবং সামাজিক পরিকাঠামো খাতে ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করেছে। আদানি গ্রুপ ওড়িশায় তিনটি প্রধান পরিকাঠামো ও উৎপাদন প্রকল্প নির্মাণের জন্য ৩৩,০৮১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, একটি সিমেন্ট উৎপাদন ইউনিট এবং একটি ডেটা সেন্টার।
এই সব প্রকল্পই দীর্ঘমেয়াদি। ফলে একবার কোনো রাজ্যে ঢোকার সুযোগ পেলে, সেখানকার রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের সর্বগ্রাসী সুযোগ আদায় করে নেয় আদানিরা।

এবার আসা যাক দুর্নীতি প্রসঙ্গে। গত কয়েক বছরে আদানি গ্রুপের বিনিয়োগ-জালিয়াতির ইতিহাস রোমাঞ্চকর। কিন্তু এই বহুজাতিক সংস্থাটির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি কোন জাদুমন্ত্রবলে ধারাবাহিকভাবে খারিজ হয়ে গেছে। সে আমেরিকা হোক কি ভারত, নিষ্পত্তি হয়নি কোথাও। এর শুরু ২০০৭ সালে। ২০০৭ এবং ২০১৪ সালে বিদ্যুৎ সরঞ্জামের অতিরিক্ত মূল্য দেখানো এবং অবৈধ হীরা ব্যবসার অভিযোগে আদানি কোম্পানিগুলো ভারতের ডিরেক্টরেট অফ রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স (ডিআরআই)-এর বিভিন্ন তদন্তের মুখোমুখি হয়েছিল। তবে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি ২০২৩ সালে যা হৈ চৈ ফেলেছিল গোটা বিশ্বে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে, মার্কিন শর্ট-সেলিং সংস্থা হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে 'কর্পোরেট ইতিহাসের বৃহত্তম প্রতারণা'র অভিযোগ তোলে। দাবি করা হয়, সংস্থাটি শেয়ারের দামে কারসাজি করেছে এবং বিদেশের অফশোর শেল কোম্পানির বিশাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তার তালিকাভুক্ত সম্পদের মূল্য বাড়িয়ে দেখিয়েছে ও ব্যালেন্স শিটে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। রিপোর্ট প্রকাশের পর আদানির শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ মুছে যায় এবং তারা ২.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি ফলো-অন পাবলিক অফারিং বাতিল করতে বাধ্য হয়। ভারতের বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি তদন্ত শুরু করে। ২০২৫ সালের শেষে সেবি শেষ পর্যন্ত শেয়ার কারসাজি এবং জালিয়াতির অভিযোগগুলি খারিজ করে দেয়। ২০২৪ সালের নভেম্বরে গৌতম আদানি এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হিন্ডেনবার্গের দ্বিতীয় রিপোর্টের ভিত্তিতে আমেরিকায় হয় ঘুষ মামলা। দাবি করা হয়, সেবি -র তৎকালীন চেয়ারপার্সন মাধবী পুরী বুচ এবং তাঁর স্বামীর অফশোর ফান্ডে অংশীদারিত্ব ছিল, যা আসলে আদানি গ্রুপের অর্থ আত্মসাৎ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু আমেরিকার ফেডারেল আদালত নিশ্চিত প্রমাণের অভাবে ফৌজদারি অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করে নেয়। আদানি গ্রুপ আর্থিক জরিমানা প্রদান করলেও অন্যায় স্বীকার করেনি।
এহেন আদানি গোষ্ঠীকে রাজ্যে আনার আগে বাংলা প্রবাদটা মনে রাখা দরকার, 'ছুঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরনো'।