
কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রিত্ব থেকে বিদায় নিলেন সিদ্দারামাইয়া এবং কেবল সময়ের অপেক্ষা, অভিষিক্ত হতে চলেছেন ডি কে শিবকুমার। কর্ণাটকে ক্ষমতার হাতবদল এখন চূড়ান্ত।
দিল্লি দরবার থেকে কর্ণাটকের রাজপথ—বিজেপির রণকৌশল যেখানে একটাই: ‘ভাঙো, শাসন করো আর কলঙ্ক লেপন করো’ সেখানে সম্পূর্ণ নতুন স্ট্র্যাটেজি নিয়ে লড়াইয়ে নামল না বলে বলা ভালো নেমে গেছে কংগ্রেস। এবং কেবল নেমে যাওয়াই নয়, রীতিমত চ্যালেঞ্জ দিতে তৈরি। আর কর্ণাটকের মাটি থেকে উঠে আসা এই চিত্রেই গেরুয়া শিবিরের অন্দরমহলে রীতিমতো শুরু হয়ে গেছে আতঙ্কের কম্পন। যারা ভেবেছিলেন কংগ্রেসের অন্দরে দুই মেরুর সংঘর্ষে এবার তাঁরা গুছিয়ে উত্তাপ নিতে পারবেন, তারা আজ দেখতে পাচ্ছেন—আগুনটা তাদের নিজেদেরই গদিতে লাগতে চলেছে অচিরেই। কর্ণাটক এখন আর শুধু একটি রাজ্য নয়, এটি বিজেপির অপরাজেয় ইমেজের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার ল্যাবরেটরি।
ডি কে শিবকুমারের উত্থানকে যারা ‘হাইকমান্ডের নিরুপায় সিদ্ধান্ত’ বলে প্রচার করছেন, তারা রাজনীতির মাঠের ‘আসল গেম’ বুঝতে ব্যর্থ। এই ‘আড়াই-আড়াই’ বছরের ফর্মুলা কংগ্রেসের কোনো আপস নয়, বরং বিজেপির মেরুকরণ রুখতে একটি পরীক্ষিত ভ্যাকসিন। কংগ্রেস এখন আর লড়ছে না, বরং কর্ণাটককে ল্যাবরেটরি বানিয়ে বিজেপির আগ্রাসনকে থামিয়ে দিতে তৈরি বলেই মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের। সিদ্দারামাইয়ার জনকল্যাণমুখী প্রশাসনিক ভিত আর শিবকুমারের দক্ষ সাংগঠনিক ক্ষমতা—এই ‘ডুয়েল ইঞ্জিন’ এখন বিজেপির সমস্ত মেরুকরণের চক্রান্তকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে একদম হুজুরে হাজির।
বিজেপির চিরকালীন অভ্যাস—কোনো জনপ্রিয় নেতাকে টার্গেট করে তার চরিত্রহনন করা। কিন্তু সিদ্দারামাইয়ার ‘অহিণ্ডা’ (দলিত-অনগ্রসর-সংখ্যালঘু) ভোটব্যাংক আর শিবকুমারের ‘ওক্কালিগা’ ---- সাংগঠনিক শক্তির এই মেলবন্ধন এখন এমন এক ‘ইনভিজিবল ফোর্ট্রেস’ তৈরি করেছে, যা ভেদ করা বিজেপির পক্ষে কার্যত অসম্ভব বললেও কম বলা হয়। যখনই ইডি-সিবিআই দিয়ে শিবকুমারকে কোণঠাসা করার চেষ্টা হবে, সিদ্দারামাইয়া ঢাল হয়ে দাঁড়াবেন। আবার সিদ্দারামাইয়াকে আক্রমণ করলে শিবকুমার তার ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’ দিয়ে প্রতিহত করতে তৈরি---- এই ‘ডুয়েল-ডিফেন্স’ মেকানিজম বিজেপিকে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পেতে দেবে বলে মনে হচ্ছে না বিশেষজ্ঞদের অনেকেরই।

বিজেপি কেবল কেন, অনেকেই ভেবেছিলেন ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় কংগ্রেসের ভেতরে দাঙ্গা বাধবে। কিন্তু এই সুশৃঙ্খল হস্তান্তরে বিজেপির ‘অপারেশন লোটাস’ সহ সব হিসেবই এখন স্রেফ বাসি খবর। সরকার স্থিতিশীল, প্রশাসন সচল, আর দল ঐক্যবদ্ধ। বিজেপির হাতে এখন আর কর্ণাটকের সরকারকে অস্থিতিশীল করার মতো কোনো ইস্যু নেই। তারা যে অস্থিরতার স্বপ্ন দেখছিল, তা, মজা হল, সম্ভবত তাদের নিজেদেরই দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়াতে চলেছে।
কংগ্রেসের এই ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট প্রমাণ করছে, পার্টি যদি ইগোর চেয়ে আদর্শ এবং লক্ষ্যের ওপর ফোকাস করে, তবে বিজেপিকে ঘোল খাওয়ানো মোটেই খুব কঠিন কিছু নয়।

কর্ণাটকের এই মডেল কেবল একটি রাজ্যের সমীকরণ নয়, এটি সারা ভারতের বিরোধী জোট, তথা ইন্ডিয়া ব্লকের জন্য একটি ‘প্রুফ-অব-কনসেপ্ট’ও বটে। ক্ষমতার ভাগাভাগি দিয়ে কোনো পরাজয়কে ডেকে আনা নয়, বরং বৃহত্তর স্বার্থে আপস করাটা রাজনৈতিক পরিপক্কতা। এটি বিজেপির সেই পুরনো প্রচার, যে, ‘কংগ্রেস মানেই অরাজকতা’কে পুরোপুরি খণ্ডন করে দিচ্ছে। বিজেপির হাতে থাকা পুরনো ক্যালকুলেটর আর অচল সমীকরণকে ভেঙে দিয়ে কংগ্রেস এখানে এক আধুনিক রাজনৈতিক গেম খেলতে বসেছে বলেই স্ট্র্যাটেজিস্টদের বক্তব্য।
সিদ্দারামাইয়া এবং শিবকুমারের মধ্যে কোনো রেষারেষি নেই, আছে কাজের ভাগ। এই লড়াই কর্ণাটকের মসনদ দখলের নয়, এই লড়াই বিজেপির ‘ইনভ্যানসিবিলিটি’ বা অপরাজেয় মিথ ভেঙে দেওয়ার। কর্ণাটক এখন প্রমাণ করছে, কংগ্রেস এখন আর আগের মতো দিশেহারা নয়। বিজেপির মেরুকরণের বিষের বিপরীতে কংগ্রেস এখন ‘সুসংহত পরিকল্পনা’-র প্রতিষেধক প্রয়োগ করতে শিখছে। ডি কে শিবকুমারের এই অভিষেক তাই বিজেপির জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা—দিল্লির সিংহাসন থেকে টেনে নামানোর ব্লু-প্রিন্ট হয়তো লেখা শুরু হয়ে গেল কর্ণাটকের এই মসনদ থেকেই।