
বুধবার সারা দিনই প্রায় টুটুদার শেষ যাত্রায় ছিলাম। আজ লিখতে গিয়ে ভাবছি শুরু করবো কোথা দিয়ে, শেষ করবোই বা কোথায়? দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে সম্পর্ক আমাদের।শুরু টা কোথায় আর শেষটা কোথায় কে বলে দেবে? ২৫ জুলাই, ২০২৫ সালে টুটু বসু মোহনবাগানের সভাপতিত্ব ত্যাগ করেন। এর চারদিন বাদে ২৯ জুলাই তিনি মোহনবাগান রত্ন হন। সেদিন ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে তাঁর বলা কথাগুলি কানে বাজছে - 'আমার বয়স হয়েছে। আমি একদিন থাকবো না, কিন্তু মোহনবাগান রত্ন হিসেবে প্রাপ্য একলাখ টাকার চেকের সঙ্গে আমি আরো চার লক্ষ টাকার চেক পাঠিয়ে দেবো। আমার নামটা যেন মোহনবাগানের কুড়িতম লাইফ মেম্বার হিসাবে নথিভুক্ত।হয়। আমি একদিন থাকবো না। কিন্তু আমার শরীর রেণু রেণু হয়ে মিশে থাকবে মোহনবাগান ক্লাবের ধূলিকনায়।' টুটু বসু কি তবে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ছিলেন? জানিনা সেকথা। কিন্তু তিনি যে সময়ের আগে ভাবতে জানতেন, তার বহু পরিচয় পেয়েছি তাঁর সংবাদপত্র 'সংবাদ প্রতিদিন'- এ কাজ করার সুবাদে। গত ক্লাব নির্বাচনে একটা ধুয়ো উঠেছিল, টুটু বসু ক্লাবকে যত টাকা দিয়েছেন তা নাকি তুলে নিয়েছেন মেম্বারশিপের টাকা থেকে। টুটুদা সেদিন আমাকে এবং আর এক সাংবাদিককে তাঁর বুক অফ একাউন্টস দেখার অধিকার দিয়েছিলেন। আমরা দেখেছিলাম, এ আই এফ এফ -এর তখনকার সভাপতি প্রফুল্ল প্যাটেল মোহনবাগানকে দু কোটি টাকার যে জরিমানা করেছিলেন, তা মেটানোর ব্যবস্থা করেন টুটুদাই। এছাড়া কতবার যে খেপে খেপে মোহনবাগানকে আর্থিক অনুদান দিয়েছেন তার কোনো ইয়ত্বা নেই। বন্ধু অঞ্জন মিত্রর সঙ্গে নিয়মিত খেলা দেখতে আসতেন হাওড়ার রামকৃষ্ণপুরের বাসিন্দা টুটু বসু। ইস্টবেঙ্গলের সামনে তাঁর দলের কুঁকড়ে যাওয়া অবস্থা তাঁকে বিদীর্ণ করত। বন্ধু অঞ্জনকে প্রায়ই বলতেন - একদিন মোহনবাগানের ভার নেব আর বুক চিতিয়ে লড়াই করব বাঙালদের সঙ্গে। সুযোগ মিলে গেল গৌর সাহার নেতৃত্বে তখন মেম্বার্স ফোরাম লড়াই করছে শাসক গোষ্ঠী ধীরেন দের বিরুদ্ধে। টুটু, অঞ্জন ভিড়ে গেলেন মেম্বার্স ফোরাম- এ। নির্বাচন হল, কিন্তু সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের ডানহাত সুশোভন বসু ও গজু বসুর চেষ্টায় মোহনবাগানে মিলিজুলি সরকার গঠিত হল। অঞ্জন মিত্র হিসাবরক্ষক আর টুটু বসু কার্যকরী কমিটির সদস্য। এর পরের ইতিহাস উত্তরণের ইতিহাস। ধীরে ধীরে মোহনবাগান ক্লাবের দখল টুটু, অঞ্জনের হাতে গেল। মোহনবাগান বিদেশী খেলোয়াড় খেলায় না - এই মিথ ভেঙে টুটু, অঞ্জন চিমাকে খেলালেন । এরপর লক গেট খুলে গেল। মোহনবাগান সমৃদ্ধ হল বিদেশীদের দ্বারা। ২০১৭ সাল পর্যন্ত টুটু -অঞ্জন জুটি থাকলেও ভাঙ্গন ধরে ২০১৭ তেই। তবে, আজ থাক সেই সব অপ্রিয় কথা।
টুটুদার 'সংবাদ প্রতিদিন'- এর জার্নির কথা তো বলাই হল না, যার সংগে অঙ্গাঙ্গিভাবে আমি জড়িত। ইদানিং একবার টুটুদা ডেকে পাঠিয়েছিলেন -- 'তোকে বড় দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে।' টুটুদার যে কোনো ইচ্ছাই আমার কাছে আদেশ। গেছিলাম বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িতে। হুইল চেয়ারে সমাসীন টুটুদাকে দেখে আমার আহত সিংহর কথা মনে হয়েছিল। টুটুদা আমাকে বলেছিলেন - 'এই বয়সে স্ত্রী চলে গেলে তা বড় কষ্টের, বেদনার।'
আমি নিশ্চিত, টুটুদা অঞ্জনদা স্বর্গে আড্ডায় মেতেছেন। আর পিছনে বাঁশি মুখে রেফারির ভূমিকায় দাঁড়িয়ে আছেন শম্পা বৌদি। একটু বেচাল দেখলেই সতর্ক করার জন্য হলুদ কার্ড!