
জয়সলমের থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরে খাবা ও কূলধারার কথা শুনে ও পড়ে ঐ পরিত্যক্ত গ্রাম দুটি দেখতে বশিষ্ঠ আগ্রহী হয়ে ওঠে। একসময়ে এই দু'টি গ্রাম সমৃদ্ধ ছিল, এখন শুধু ধ্বংসাবশেষ। কূলধারার মন্দিরের চূড়ো এখনও অক্ষত রয়েছে, দূর থেকে দেখা যায়। খাবা-এর উঁচু জায়গায় এসে দাঁড়ালে দূরে দেখা যায় যেন হালকা পর্দায় ঢাকা জয়সলমের-এর দুর্গ। স্কেচ খাতাটা বার করে আঁকতে লাগল। কখন সকালের মিঠে সোনা গড়িয়ে গেল তপ্ত রৌদ্রকণায়--খেয়াল ছিল না।
পাথরের বেষ্টন পেরিয়ে বড় একটা অঙ্গনে বসে ছিল বশিষ্ঠ। সূর্যোদয়ের আলোতে হঠাৎ ওর মনে হল ইতিহাসের গর্ভ থেকে গ্রাম দু'টি যেন উঠে এসেছে। পাথরের তৈরি গ্রাম, সবই আছে, শুধু মানুষ নেই। চৌপালে বসে গোটা গ্রামটা দেখা যাচ্ছে। ঢুকতেই গোয়ালঘর; পাশে উটের বা মোষের গাড়ি। মাঝখানে রাস্তা, জ্যামিতিক নকশায় তৈরি রাস্তার ধারে ধারে নানা লোকের নানা মহল্লা । দরজা-জানলায় অপূর্ব কাজ। শোবার ঘর, রান্নাঘর, স্নানঘরের সঙ্গে লাগোয়া নর্দমা। গ্রামের মোড়ল থাকে একদিকে; অন্য দিকে কুমোর পাড়া, কামার, ছুতোরমিস্ত্রি, ব্যবসায়ী ও কারিগর। না জানি কত সুন্দর ছিল এই দু'টি গ্রাম। চৌপালে সন্ধ্যার পরে বুড়ো অশ্বত্থ গাছের নীচে পঞ্চায়েত বসেছে। গ্রামের সবাই এসে জড়ো হয়েছে।
দুই শতাব্দী আগের কথা; এই দুই গ্রামের বাসিন্দা ছিল কৃষক সম্প্রদায়ের পালিওয়াল ব্রাহ্মণ। ওরা এই শুষ্ক বালিয়াড়িতে নানা বৈজ্ঞানিক উপায়ে ফসল ফলাত। বড় বড় গর্ত--যাকে এরা বলত ‘খাদান’--এক একটা ভূমিক্ষেত্র। তার চারপাশে লাগাত বড় বড় গাছ-- খেজ়ী, বাবলা, নিম, অশ্বত্থ ও আম। এসব গাছই জমির আর্দ্রতা বজায় রাখত; তার সঙ্গে লাগাত ক্যাকটাসের ঝাড়। পাশে কুয়ো; বড় বড় চৌবাচ্চা। বৃষ্টির সবটুকু জল ধরে রাখার পাকা ব্যবস্থা। এত ঘেরাটোপের মধ্যে জমি সুরক্ষিত থাকত বলে বালির ঝড়েও আবাদী জমির কোন ক্ষতি হত না। এভাবে এরা অনেক রকম ফসল ফলাত, এমন কি গমও।
সেটা ১৭৬২ সাল। জয়সলমের-এর রাজা মুলরাজের সময় রাজার নামে রাজ্য শাসন চালাত তাঁর অত্যাচারী দেওয়ান মেহতা সালিম সিংহ। দেওয়ানের নজর পড়ল পালিওয়ালাদের ওপর--এত ফসল ফলাচ্ছে, খাজনা দেবে না কেন? পালিওয়ালাদের বক্তব্য, এত পরিশ্রম করে যেখানে শস্য ফলাতে হয় সেখানে আবার খাজনা কিসের! দেওয়ানজী এই যুক্তি মানতে রাজি নয়। ফলে ওদের কারাগারে পুরে রাখা হল। পালিওয়ালারা বুঝে গেল এই শোষণের শেষ নেই; ছাড়া পাবার জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়ে এল যে, এবার থেকে খাজনা দেবে। ছাড়া পাবার পর তারা ঠিক করল এখানে আর থাকা চলবে না; রাতারাতি তাই গ্রাম খালি। বশিষ্ঠ। অবাক হয়ে ভাবছিল- যে গ্রাম একদিন প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর ছিল, কি এক অবিশ্বাস্য কারণে নিমেষের মধ্যে একদিন সব শেষ। আজ গ্রামের বেশিরভাগ সুন্দর কাজ-করা দরজা, লোভী ব্যবসায়ীরা তুলে নিয়ে গেছে। অর্থের বিনিময়ে ইতিহাসের পাতা দমকা হাওয়ায় ওড়ে।
বালির ঝড়ে, প্রকৃতির তাণ্ডবলীলায় জয়সলমের-এর ইতিহাসে কতবার যে দুর্যোগ নেমে এসেছিল, তার ঠিক ঠিকানা নেই। রাতের অন্ধকারে বা জ্যোৎস্না রাতে পালিওয়াল ব্রাহ্মণদের পালিয়ে যাবার চিত্রটা বশিষ্ঠ স্পষ্ট দেখতে পায় যেন। জয়সলমের এ বছরের পর বছর দুর্ভিক্ষের করাল ছায়া নামে, লোকেদের সে কি দুর্দশা! ১৮৯৫-এর আকাল চলেছিল পরপর তিন বছর। ১৮৯৯ সালে আবার এক ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ; ১৯০২ সালেও। চার বছর ধরে এই তাণ্ডবলীলা। বিপর্যয় হলেই লোকেরা তখন সিন্ধে পাড়ি দিত। সেবার ৫০ হাজার লোক সিন্ধে পালিয়ে গিয়েছিল; কত লোক মরেছিল তার হিসাব নেই। দেড় লক্ষের ওপর গবাদি পশু আর সাড়ে সাত হাজার উট নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সময় সারা দেশেই আকাল লেগে থাকত; ত্রাণকার্যের জন্য অর্থ পাওয়া ভার ছিল। জয়সলমের-এর জন্য মাত্র ৫২ হাজার টাকা খরচ করা হয়।
কান পাতলে বশিষ্ঠ এখনও শুনতে পায় দিগন্ত জুড়ে বুক-চেরা হাহাকার। অতীতের গর্ভ থেকে উঠে আসে কঙ্কালসার কালো কালো মানুষ। হলুদ-বরণ বালির ওপর কে যেন কালের কালি লেপে দিয়েছে। আকালের কঙ্কালসার চেহারা ফোটাতে ধূসর হলুদ রঙটাকে কাজে লাগাল বেশি। পালিওয়ালাদের ভয় আর ত্রাসের চেহারা ফোটাতে হালকা নীল রঙের সঙ্গে মেশাল একটু ব্ল্যাক ডায়মণ্ড। চাঁদের আলো পড়েছে অন্ধকারের বুকে; রূপোলী রঙের সঙ্গে মেশাল হালকা হলুদ ও সবুজ। ভিগনেটের ধোঁয়াশায় মনে হচ্ছে তারা যেন পালিয়ে যাচ্ছে।
অমাবস্যার রাত। এই পালিওয়ালাদের পাগড়ি-পরা যুবক, বৃদ্ধ আর সব খেটে-খাওয়া মানুষ ভীত ত্রস্ত হয়ে নিঝুম মরুপ্রান্তর দিয়ে হাঁটছে; মেয়ে, মা-বউ চলেছে নিঃশব্দে ঘোমটা টেনে। সঙ্গে চলেছে উটের গাড়ি। ঘুমন্ত শিশুসন্তান, বাপের কোলে, পিঠে, কাঁধে চড়ে যাচ্ছে অজানা দেশে। জল রঙে অদ্ভুত ফুটেছে এদের মুখেচোখের দৃষ্টি।
পালিওয়ালাদের ওভাবে পালিয়ে যেতে দেখেই বশিষ্ঠ রতনুকে বলেছিল--মানচিত্রে এই খাবা নামটা এখনও দেখছি। এখন খাবাতে যারা থাকে, তারা হয়ত কেউ পালিওয়াল ব্রাহ্মণদের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাবার কথা জানে না। আমি খাবা-র কাছাকাছি বা সাম-এর কোন গ্রামে গিয়ে মারুর পল্লীবাসীদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে চাই।
রতনু কি যাদু করেছিস কে জানে। কনহৈ-এর মেয়ে-বউ বাদে সবাই সিমেন্ট-বাঁধানো এক চত্বরের পাশে জড় হয়েছিল। গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধান, বি.ডি.ও., মাস্টার, ছাত্র আর ব্যবসায়ী। এক কৌতূহলী জনতা বশিষ্ঠের দাড়ি-গোঁফ ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
বশিষ্ঠ এদের এঁকে নিচ্ছিল মনে মনে। গোঁফ এরা রাখবেই। জোরাল ভ্রূ' জোড়া। অনেকের দাড়ি-গোঁফ। চোখ দুটো অচঞ্চল। অনেকে বলে আর্যদের হুবহু দেখতে চাও, রাজস্থানে যাও। পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে প্রৌঢ়ের চিবুক থেকে মাঝামাঝি চিরে দু'পাশে কানে খাদ-না-মেশানো সোনার মাকড়ি।
প্রায় আশি বছরের এক রাজপুত কেমন যেন বেমানান। বড় বড় ঢুলুঢুলু চোখ, উন্নত কপাল। হাসি ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল; এ বয়সেও অনেকগুলি দাঁত অক্ষত। হঠাৎ দেখলে মনে হয় যেন আলেকজাণ্ডারের আমল থেকে লোকটি উঠে এল। প্রথমেই সে অভিযোগ করল--দিল্লী থেকে এলেন, আফিং এনেছেন? বশিষ্ঠ আশ্বাস দিল--এবারে আনিনি; আসছে বার নিশ্চয় আনব। বুড়ো তৎক্ষণাৎ জবাব দিল--সবাই শুধু আশ্বাস দেয়, আনে না। একমাত্র ভোটের সময় দু’একবার আফিং পেয়েছি। হেসে বলল--ওটা না পেলে আমি ভোট দিই না।