
এবছর একটা জোরদার এল নিনোর সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। আবার গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বৃষ্টি নিয়েও তৈরি হয়েছে এক অনিশ্চয়তা। বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যেই সতর্কতা দিয়েছেন যে একই সময়ে এই দুটি আবহাওয়া সংক্রান্ত ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব হবে ফসলের পক্ষে মারাত্মক। আমাদের দেশে ফলন মূলত মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর কারণে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, যা মৌসুমি বায়ু বা বর্ষাকে দুর্বল করে দেয়। ২০২৬ সালের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাষ অনুযায়ী, এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুতে প্রভাব পড়তে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে সামগ্রিকভাবে মোট বৃষ্টিপাত কমলেও ভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনা বাড়তে পারে। শুকনো জায়গায় অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে সাধারণভাবে বন্যা ও ভূমি ধ্বসের ঝুঁকি তৈরি হয়।
স্প্যানিশ ভাষায় ‘এল নিনো’ শব্দের অর্থ ছোট ছেলে। মানে এর চরিত্রেই একটা খামখেয়ালী ব্যাপার রয়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন আবহাওয়ার ধরণে পরিবর্তন ঘটে। নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে এই পরিবর্তন ভারতেও গ্রীষ্মকালীন বর্ষাকে দুর্বল করে এবং দেশের নানা অংশে খরার পরিস্থিতি তৈরি করে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ভারত নয়, এল নিনোর ফলে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে খরার প্রবণতা দেখা দেয়। অন্যদিকে, প্রশান্ত মহাসাগরে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় বা হারিকেনের গতিপ্রকৃতি বদলে যায়।
‘হু’র মতে, এই চরম আবহাওয়া জোরদার করে স্বাস্থ্য সংকট। বাড়ে জলবাহিত রোগ। অতিরিক্ত বৃষ্টি ও বন্যার ফলে ছড়াতে পারে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া এবং জিকা ভাইরাস। তাপপ্রবাহ ও হিটস্ট্রোকের সমস্যা তো রয়েইছে। মূলত বয়স্ক, শিশু এবং বাইরে কাজ করা মানুষজনের মধ্যে হিটস্ট্রোক এবং শরীরে জলশূন্যতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
এল নিনোর দাপট ছাপ ফেলে কৃষির ওপরও। আমাদের মতো কৃষিপ্রধান দেশে এই সংকটের এক বিরাট গুরুত্ব রয়েছে। খরার কারণে ফসল নষ্ট হওয়া তো আছেই, তার সঙ্গে রয়েছে জনস্বাস্থ্যের সমস্যা। এল নিনোর ফলে সৃষ্ট খরার কারণে ফলন কমে তৈরি হয় খাদ্যসংকট। যার হাত ধরে আসে অপুষ্টি। এককথায় উন্নয়নশীল দেশগুলিতে এর ফলে জনস্বাস্থ্য বিপন্ন হয়। এর পাশাপাশি দাবানল এবং চরম তাপপ্রবাহের কারণের বায়ুর গুণগত মান কমে, বাড়ে হাঁপানি এবং শ্বাসকষ্টজনিত অসুখ।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত ২০২৬ সালে সুপার এল নিনোর কারণে সবচেয়ে খারাপ জলবায়ু পরিবর্তনের সাক্ষী হতে পারে, বিশেষ করে বর্ষাকালে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বা WMO জানিয়েছে, ২০২৬ সালের মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে এল নিনো শুরু হওয়ার ৮২% সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেটা ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। WMO’র বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে এটা একটা শক্তিশালী বা ‘সুপার এল নিনো’ হিসেবে দেখা দিতে পারে। এই কারণে বিশ্বব্যাপী গড় তাপমাত্রা রেকর্ড মাত্রায় বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
WMO’র বৈশ্বিক জলবায়ু আপডেট অনুযায়ী ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা প্রাক শিল্পযুগের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। সেইসময় আক্ষরিক অর্থেই এল নিনোর দাপট আরও বেশি দৃশ্যমান হবে। ১৮৭৭ সালে প্রথম এল নিনো’র প্রভাবে বিশ্বে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। অসহ্য গরম ও ফসলের অভাবে মারা গিয়েছিলেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। গবেষকদের আশঙ্কা, গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন না কমলে ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে সেই অন্ধকার দিন আবার ফিরে আসতে পারে। তাই এখন থেকেই বিশ্ববাসীকে সতর্ক হতে পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এবারের সুপার এল নিনোর প্রভাব বেশি হতে পারে, সে কারণে ভারতের মত জনবহুল দেশে খরা এবং খাদ্যসংকট মোকাবিলায় আগাম পরিকল্পনা না থাকলে তা এক নতুন মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ‘সে বড় সুখের সময় নয়।’