
ওরা প্রমাণ করে দিয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা আজ আর জ্ঞানের আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়, এটি এখন একটি সুসংগঠিত জালিয়াতির ক্ষেত্র। সিবিএসই-র মতো একটি জাতীয় পর্যায়ের বোর্ড যখন টেন্ডারের শর্ত বদলে বিশেষ কোম্পানিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার দায়ভার গ্রহণ করে, তখন বুঝতে হয়—নিয়ম বা স্বচ্ছতা কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ। জনা ১৫ টেকনিক্যাল কর্মী দিয়ে ১৭ লক্ষ ছাত্রের খাতা মূল্যায়ন—এই গাণিতিক অসম্ভবকে বাস্তব বলে চালানোর চেষ্টাই প্রমাণ করে, মানদণ্ড এখন কতটা নিচে নেমেছে। দেখিয়ে দেয় মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় স্ক্যান করা উত্তরপত্র, অস্পষ্ট লেখা, আর অদৃশ্য পৃষ্ঠার জট—এই ডিজিটাল গোলকধাঁধায় লাখো শিক্ষার্থীর মেধাকে কেবল অবমূল্যায়নই করা হয়নি, কীভাবে রীতিমতো লুণ্ঠন করা হয়েছে। 'অন স্ক্রিন মার্কার' বা ওএসএম পোর্টালের নিরাপত্তা যে কতটা নড়বড়ে, তা এখন আর গোয়েন্দা তথ্যের বিষয় নয়, বরং তা এখন প্রমাণিত সত্য। এথিক্যাল হ্যাকারদের উন্মোচিত করা প্রতিটি কোড, প্রতিটি ত্রুটি আজ এক একটি জ্যান্ত দলিল, যা দেখায় যে সিস্টেমের অন্দরে নজরদারির বদলে কারসাজিই প্রাধান্য পেয়েছে।
প্রশাসনিক দাদাগিরি এখন এই জালিয়াতির প্রধান প্রতিরক্ষা বর্ম। প্রয়াগরাজের সার্কিট হাউসে যখন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিরা বন্ধ ঘরে আলোচনা করতে থাকা ছাত্রদের ওপর চড়াও হন, তখন স্পষ্ট হয়ে যায়—প্রশ্ন করার অধিকারটুকুও এখন রুদ্ধ করা হচ্ছে। যারা সরকারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসনিক দায়িত্বে এসেছেন, সেই পরীক্ষারই প্রশ্নফাঁস বা অসংগতি নিয়ে কথা বলা তাঁদের কেন অপরাধী হিসেবে গণ্য হবার যোগ্য মনে হচ্ছে এ প্রশ্ন তো আজ উঠবেই ! এবং অবভিয়াসলি এই স্ববিরোধিতা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, ভয়ংকর এক সংকীর্ণতাও বটে।
শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতির এই করাল গ্রাসের বিরুদ্ধে স্বয়ং রাহুল গান্ধীর অবস্থান এই মুহূর্তে কেবল বিরোধী রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরের লড়াকুদের পাশে থাকা মাত্র নয়, বরং তা বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থার অকর্মণ্যতাকে নগ্ন করে দেখানোর এক কার্যকর তো বটেই, জরুরি প্রয়াসও বটে। তিনি যখনই সিবিএসই-র টেন্ডার দুর্নীতি, মোবাইল ক্যামেরায় খাতা স্ক্যান করার মতো হাস্যকর প্রক্রিয়ার অনিয়ম, কিংবা রি-ইভ্যালুয়েশনের নামে শিক্ষার্থীদের পকেট কাটার বিষয়গুলোকে সামনে এনেছেন, তখনই সিস্টেমের ভিত কেঁপে উঠেছে। তিনি সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীকে—যাদের নীরবতা এই দুর্নীতিতে মৌন সম্মতির সমতুল্য। রাহুলের এই সক্রিয়তা যখন একদিকে ছাত্রসমাজের দাবির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করছে, অন্যদিকে একই সময়ে তা গোদি মিডিয়া ও সরকারি মহলের তৈরি করা 'দেশবিরোধী' তত্ত্বের মুখোশও খুলে দিয়েছে। প্রয়াগরাজের ঘটনার পর রাহুলের এই অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বন্ধ ঘরের আলোচনায় প্রশাসনিক বাধা সৃষ্টি করে বা আন্দোলনকারীদের দমিয়ে রেখে এই দুর্নীতির দায় এড়ানো আর সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়,কোনো একটা বা দুটো দশটা কোচিং সেন্টার সিল করে বা বেছে বেছে আন্দোলনকারীদের 'দেশবিরোধী' তকমা দিয়ে এই দুর্নীতির পাহাড়কে আড়াল করা সম্ভব নয়।

শিক্ষা এখন একটি লাভজনক ‘বিজনেস মডেল’ এটা তো এখন প্রমাণিত সত্য । কেবল কর্তৃপক্ষ সেটা সাহস করে, সৎ সাহসের সঙ্গে মানেন না এই যা ! খাতা দেখার অসংগতির জন্য টাকা আদায়, উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের নামে পকেট কাটার প্রক্রিয়ায় যখন মূল প্রতিষ্ঠানগুলো লিপ্ত হয়, তখন শিক্ষার নৈতিক ভিত্তিটিই ভেঙে পড়ে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় দায়বদ্ধতার অভাব চরম পর্যায়ে। অথচ, খোদ শিক্ষামন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে বোর্ডের শীর্ষ নেতৃত্ব—সবাই এক অলৌকিক নীরবতায় মগ্ন।
রাহুল সহ প্রতিবাদীদের অবস্থান প্রমাণ করে দিয়েছে এই দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল জালিয়াতি কেবলমাত্র একটি শিক্ষাবর্ষের বিপর্যয় নয়, গোটা একটা প্রজন্মের বিশ্বাসের, আস্থার অপমৃত্যু। এইটা মেনে নিয়ে, এর অপসারণ ঘটিয়ে, জোরের সঙ্গে নিজেদের ব্যর্থতার অবসান ঘটানোর মতো দম আর বুকের পাটাই কেবল নয়, নতুন প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রমাণটুকু অন্তত রাখতে না পারলে কিসের এরা কর্তৃপক্ষ ? সার্থক, নিসর্গ বা বেদান্তদের মতো নতুন প্রজন্মের যারা তথ্যের ভিত্তিতে সিস্টেমের এই নগ্নতাকে উন্মোচিত করছে, তারা কেবল খাতা দেখার দাবিতেই সীমাবদ্ধ নেই। তারা চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে এমন এক কাঠামোর অস্তিত্বকে, যা বছরের পর বছর ধরে মেধাকে পণ্য বানিয়ে এসেছে।
সিস্টেমের এই ডিজিটাল ও প্রশাসনিক দেউলিয়া চেহারাটা আজ উন্মোচিত। যে স্বচ্ছতার দোহাই দিয়ে এই অসংগতিগুলোকে ঢাকা হচ্ছে, তা এখন নিজেই নিজেদের খাড়া করা সিস্টেমের কাঠগড়ায়। ক্ষমতার দম্ভ দিয়ে সত্যের মুখ বন্ধ করা যায় না—আজকের এই পরিস্থিতির এটাই চূড়ান্ত সারকথা।
(সিবিএসই দুর্নীতি, শিক্ষাব্যবস্থার জালিয়াতি, ডিজিটাল মূল্যায়ন কেলেঙ্কারি, রাহুল গান্ধী শিক্ষা আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন ভারত, মেধা লুঠের প্রতিবাদ)