তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
অর্থনীতির মুমূর্ষু দশা আর রাজনীতির ফানুস

নির্বাচনের ময়দানে হিসেব মতো বিজেপি অবশ্যই সাফল্যের চূড়ায়,অন্তত রাজ্যে ভোটের ফলাফল তাই বলছে। কিন্তু একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতির চাকাও যে প্রায় তাল রেখেই সমান বেহাল, তা আজ আর গোপন বিষয় নয়। বিশেষ করে সম্প্রতি অর্থনীতিবিদ সুরজিৎ ভাল্লা দেশের এক নম্বর সংবাদপত্রে কথাটা একদম স্পষ্ট ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছেন। দেখিয়ে দিয়েছেন, রাজনৈতিক জয় আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি মোটেই এক জিনিস নয়। অতএব যারা আমরা উন্নয়নের ফানুস উড়িয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলবার চেষ্টায় ব্যতিব্যস্ত, তাদের জেনে রাখা ভালো—দেশের আসল দশাটা কী!

ভাল্লা সাহেবের বিশ্লেষণে উঠে আসা এই কঠোর বাস্তবগুলো একবার চোখ খুলে দেখলেই চেহারাটা স্পষ্ট হয়ে যেতে বাধ্য।

কিন্তু উল্টো দিকে এই পরিস্থিতিতেও সরকার আজ মিথ্যা আত্মবিশ্বাসে ভুগছে। তারা মনে করছে এবং দেশের জনগণকেও বিশ্বাস করাতে চেষ্টা করছে যে ভারতের বাজার এতই বিশাল যে বিনিয়োগকারীরা এমনিতেই এখানে ঝাঁপিয়ে পড়বে। অথচ বাস্তব চেহারাটা কী ? বাস্তবে, ২০২৫ সালে ভারতের জিডিপি আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের চেয়েও কম। এই পরিসংখ্যান কি এখনও যথেষ্ট নয় আমাদের চোখ খোলার জন্য?

আমরা ভাবছি শুধু দেশপ্রেম আর জোরালো ভাষণের ওপর ভরসা করে বড় বড় বিনিয়োগকারীরা তাদের কোটি কোটি টাকা ভারতের বাজারে ঢালবে। অথচ বাস্তব ছবিটা হল, বিনিয়োগকারীরা এখন দেশ থেকে মুখ ফেরাতে চাইছে। কারণ একটাই, আমাদের নীতিগুলো কেবল লড়ঝড়ে নয়, বরং বিনিয়োগকারীর চোখে দেখলে এখন এখানে বিনিয়োগ মানেই এক অনিশ্চিত ফাঁদ।

কেন একথা বলছি? বলছি কারণ, মুদ্রার বাজারে ভারতীয় টাকার যে পতন, তাকে কোনো অঙ্কেই সাফল্যের লক্ষণ বলে বোঝানো যাবে না। টানা সাত বছর ধরে ডলারের বিপরীতে ভারতের মুদ্রা কেবল নিচে নামছে। যদি সব ঠিকঠাক থাকত, তবে তো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তব হল, ভারতের টাকা এখন এশিয়ার অন্যতম দুর্বল মুদ্রায় পরিণত হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আমরা যে নিয়ম করেছি, তা মানলে যে কোনো সমস্যার মীমাংসার জন্য আগে স্থানীয় আদালতে ৫ বছর ঘুরতে হবে—সেটা কি কোনো সুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ? দেশের নাগরিকরাই যেখানে আদালতের দীর্ঘসূত্রতায় অতিষ্ঠ, সেখানে কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী কেন এসে নিজের টাকা আটকে রেখে আদালতের সামনে লাইন দেবে?

রাজনৈতিক সাফল্য শাসক দলকে গদিতে বসাতে পারে, কিন্তু দেশ গড়তে লাগে সঠিক অর্থনৈতিক নীতি। সব দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে বা শুধু ভোটের অঙ্কে মেতে থাকলে অর্থনীতি আর উদ্ধার হবে না। সময় থাকতে ব্যান্ডেজ লাগানো বন্ধ করা হোক এবং প্রকৃত ‘সার্জারি’ বা কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে নজর দেওয়া হোক। ফানুস আর কতদিন উড়বে? বিশেষ করে অর্থনীতি যেখানে ইতিমধ্যেই হারতে শুরু করেছে !

আমাদের সরকারি বয়ানে ভারত নাকি বিশ্বের ‘সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল’ এক বিশাল অর্থনীতি। কিন্তু তকমাটা যে কতটা বিভ্রান্তিকর, তা পরিসংখ্যান দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। দেশকে কি কেবল বড় অর্থনীতির সঙ্গে তুলনা করেই আত্মতুষ্টিতে ভুগব আমরা ? তার বাস্তব ফল কি খুব ভালো হয় আখেরে ? ২০১৪ সালের পর থেকে বিশ্ব অর্থনীতির বৃদ্ধির তথ্যের দিকে তাকালে আসল চিত্রটি ধরা পড়ে।

জিডিপি বৃদ্ধির যে ঢাক পেটানো হচ্ছে, তা বৈশ্বিক পরিসরে কতটা নগণ্য একবার দেখে নেওয়া যাক। ২০১৪ সালের পর থেকে জিডিপি বৃদ্ধির নিরিখে ভারত নবম, আর মাথাপিছু জিডিপি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অষ্টম স্থানে ।

যদি প্রকৃত সক্ষমতা দেখাতে হয়, তবে মার্কিন ডলারের মানদণ্ডে বিচার করা দরকার। সেখানে ভারতের অবস্থান কোথায় ? সেখানে ভারত ১৬তম স্থানে পড়ে আছে। যেখানে ৮.৩% বৃদ্ধি নিয়ে বাংলাদেশ শীর্ষে এবং ৭.২% নিয়ে ইথিওপিয়া দ্বিতীয় স্থানে, সেখানে ৪.৭% বৃদ্ধি নিয়ে ভারত ১৬তম স্থানে দাঁড়িয়ে ধুঁকছে।

সরকার দাবি করে, ভারত এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি। অথচ, পরিসংখ্যান বলছে, এই ‘সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল’ হওয়ার মিথ্যে তকমাটির পেছনে কোনো সারবত্তা নেই। অর্থনীতিবিদেরা পরিষ্কার সতর্কবার্তা দিচ্ছেন, সময় হয়ে গেছে এই ভুয়ো তকমাটি ভারতের কপাল থেকে উপড়ে ফেলার। হ্যাঁ, বাড়ছে ঠিকই। কিন্তু সেই হারে নয়, যে হারে রাজনৈতিক নেতারা ফানুস ওড়াতে ব্যস্ত।

রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাঁদের একাংশ যে ‘ডিপ স্টেট’ বা অদৃশ্য শক্তির কথা বলছেন, যারা বাকি সব ক্ষেত্রকে, যেমন ধরা যাক সরকার, কর্পোরেট, বিরোধী ইত্যাদি, সবাইকে নিজেদের স্বার্থে নাচায়, তার প্রেক্ষিতে সরকার কিন্তু নিজের অর্থনীতির ব্যর্থতার দায়

সর্বদা অন্যদের ওপর চাপাতে ব্যস্ত। কর্পোরেটদের বিনিয়োগ না করার জন্য দোষ দেওয়া হচ্ছে, অথচ নীতিগুলো যে তাদের নিরুৎসাহ করছে, সেই দায়ও কি সরকার এড়াতে পারে?

মাথায় রাখতে হবে, ভারতের বর্তমান একপাক্ষিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির পেছনে বিরোধীদের, বিশেষ করে কংগ্রেসের অবস্থান, পরোক্ষভাবে সরকারকে অর্থনৈতিক বিষয়ে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন করে তুলেছে।

অবস্থা মারাত্মক। কেবল ভোটের রাজনীতিতে দ্যুলোক জয় করে ফেললেও অর্থনীতি কিন্তু ছেড়ে কথা বলবে না। আজ ফের পেট্রোল ডিজেল দাম বেড়েছে। আমাদের মতো রাজ্যে, ভোটের ফল বেরোবার পরে মাত্র এগারদিনে চার বার পেট্রোল ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়া কিন্তু এই কঠোর এবং রূঢ় বাস্তবের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।


Scroll to Top