
গণতন্ত্রের প্রহরী যখন নিজেই শাসকের অন্দরমহলের দারোয়ান হয়ে বসে, তখন সেটাই হয়ে দাঁড়ায় প্রহসন। বাংলা হোক বা ইংরেজি, আজকের মিডিয়া আর খবর পরিবেশন করে না, তারা শাসকের লিখে দেওয়া অবিতর্কিত 'স্ক্রিপ্ট' পড়ে শোনায়। কংগ্রেস আমলের সেই উত্তপ্ত, তর্কমুখর রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে আজকের পরিস্থিতির ফারাকটা এখানেই—তখন মিডিয়া প্রশ্ন করার সাহস রাখত, নিজের সামাজিক অবস্থান বাজি রেখে ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর হিম্মত দেখাত। আর আজ? আজ প্রশ্ন করা তো দূরের কথা, শাসকের যে কোনো বেআইনি পদক্ষেপকেও 'উন্নয়ন' বা 'জনস্বার্থ' বলে বৈধতা দেওয়ার নগ্ন প্রতিযোগিতায় নেমেছে সংবাদমাধ্যম।
যেমন ধরা যাক, সাম্প্রতিক সময়ে শহর জুড়ে চলা হকার উচ্ছেদের ঘটনা। উন্নয়নের নামে এই বুলডোজার নামানো কি আসলে সাধারণ মানুষের সুখ সুবিধের জন্য কেবল ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মিডিয়াকে আর দেখা যায় না। যখন রাজ্যের ফুটপাতে মাঝরাতে বুলডোজার চলে, যখন হাজার হাজার পরিবারের রুটি-রুজি এক লহমায় ধুলোয় মিশে যায়, তখন মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার ক্যামেরা সেই আর্তনাদ ধারণ করে না। তারা ব্যস্ত থাকে উচ্ছেদকে 'শহরের সৌন্দর্যায়ন' বলে মহিমান্বিত করতে।
হকার উচ্ছেদ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি পরিকল্পিত বিন্যাস, যেখানে গরিবের পেটে লাথি মেরে এক শ্রেণির কর্পোরেট তোষণকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। মিডিয়া হাউসের স্টুডিও থেকে যখন একতরফা ভাষ্য দেওয়া হয়, তখন স্পষ্ট বোঝা যায়—এই মৌনতা কেবল ভয়ের কারণে নয়। বরং এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরোক্ষভাবে মিডিয়া হাউসকে যারা পরিচালনা করে সেই কর্পোরেট গোষ্ঠীর বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে। সাংবাদিকতা ফলত এখন আর পেশা নয়, বরং ক্ষমতার দালালি।
কেন্দ্রের চিত্রটা অনেক দিন ধরেই আরও করুণ এবং ভয়াবহ। যখন দেশের মুদ্রাস্ফীতির হার আকাশছোঁয়া, যখন বেকারত্বের পরিসংখ্যান যুবসমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিচ্ছে, তখন মিডিয়া ব্যস্ত থেকেছে মেরুকরণের নতুন কোনো ইস্যু খুঁজে বের করতে। জিডিপি’র তথ্যের হেরফের থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস—সবই ধামাচাপা পড়ে গেছে তথাকথিত 'প্রাইম টাইম' ডিবেটের গোলকধাঁধায়।
সাম্প্রতিককালে দেখা গেছে, যে কোনো বিতর্কিত আইন বা এনকাউন্টারের পর মিডিয়া হাউসগুলো একেকটি 'সরকারি প্রেস রিলিজ'-এর মতো আচরণ করছে। কেন এই পদক্ষেপ? কাদের জন্য এই কঠোর আইন? কেন এনকাউন্টারকে বিচারব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে?—এই প্রশ্নগুলো করার নৈতিক মেরুদণ্ড তাদের আর নেই। সরকারের দেওয়া ন্যারেটিভকে দিনের পর দিন সাধারণ মানুষের মস্তিষ্কে গেঁথে দেওয়াই এখন তাদের একমাত্র লক্ষ্য। তারা সংবাদ পরিবেশন করে না, তারা জনগণের চিন্তাশক্তিকে পঙ্গু করে দেয়।

কেন্দ্রে রাজ্যে সর্বত্র আজকের এই 'গোদি মিডিয়া' আসলে রাষ্ট্রব্যবস্থার সেই বিষাক্ত অংশ, যা গণতন্ত্রের শ্বাসরোধ করছে। তারা কোনো ইস্যুকে বিশ্লেষণ করে না, বরং ইস্যুটিকে ম্যানিপুলেট করে জনগণের নজর ঘোরায়। যখনই কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা সামনে আসে, এই মিডিয়াগুলো এমনভাবে বিষয়টিকে পরিবেশন করে যাতে অপরাধীর নাম আড়ালে থাকে এবং সাধারণ মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়ে।
এই যে হকার উচ্ছেদ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক চরম অনাচার—এর পেছনে যে একটা অশুভ কর্পোরেট-রাজনৈতিক আঁতাত আছে, তা আজ জলের মতো পরিষ্কার। মিডিয়া যখন শাসকের প্রশংসা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন বুঝে নিতে হয় যে সাধারণ মানুষের কথা বলার আর কোনো প্ল্যাটফর্ম অবশিষ্ট নেই। আজ গণতন্ত্রের শবদাহ হচ্ছে, আর এই শবযাত্রার সামনে সানাই বাজাচ্ছে আমাদেরই মিডিয়া।
রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনের শুরুর দিকে মিডিয়ার একটা অংশ তবু কিছুটা ধস্তাধস্তি করার ক্ষমতা রাখত। কিন্তু মমতার আমলের শেষ দিক থেকেই এই নগ্ন চেহারাটা প্রকটভাবে সামনে এসেছে। তখন থেকেই মিডিয়া হাউসের মালিকানা আর রাজনৈতিক ক্ষমতার অশুভ আঁতাত এমন পর্যায়ে পৌঁছতে থাকে যে, সাংবাদিকতা শব্দটার অর্থই বদলে যেতে থাকে। তখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে শাসকের স্তাবকতা না করলে চাকরি থাকবে না ধরনের আতঙ্কের রাজত্ব। আজকের কর্পোরেট তোষণ বা হকার উচ্ছেদের বিপরীতে যে 'সৌন্দর্যায়ন'-এর গল্প তারা ফাদছে, তার হাতেখড়ি তো ওই মমতা-জমানাতেই। আজ তারা সেই নগ্নতাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে শাসকের বিষাক্ত আয়নায় নিজেকে দেখার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার দিন শেষ, এখন প্রতিবাদ করার সময়। কারণ গোদি মিডিয়া আর যাই হোক সংবাদ নয়, তারা এখন শাসকের বিষাক্ত আয়না।