তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
যুদ্ধের দামামায় বিশ্বনতুন মোড় ও ভারতের নীরবতা

গত ৮ জুন থেকে ১০ জুনের মধ্যবর্তী সময়ে হরমুজ প্রণালীর প্রবেশপথে ইরান তাদের অত্যাধুনিক ‘নূর’ মিসাইল সিস্টেম ও নতুন নৌ-বহর মোতায়েন করেছে, যা ওই অঞ্চলের আকাশসীমায় মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর ড্রোন নজরদারির পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর ইরান এখন একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছে এবং যেকোনো বিদেশি রণতরীর গতিবিধির ওপর কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইরানের কেশম দ্বীপে মার্কিন বাহিনীর সাম্প্রতিক নৃশংস বিমান হামলা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে এক ধাক্কায় বারুদের স্তূপে পরিণত করেছে। এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান শান্তি আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দেওয়ায় উত্তেজনা এখন চরমে। বিশ্বের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক রুট হরমুজ প্রণালী এখন ইরানের নিয়ন্ত্রণে এবং কার্যত অবরুদ্ধ, যার ফলে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে।


একদিকে যুদ্ধবিরতির ফাঁপা প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে ইসরায়েলি বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডব ও শান্তিরক্ষী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনকে কেবল বুড়ো আঙুল দেখায়নি, বরং লেবাননের ৬০ শতাংশ ভূখণ্ড দখল ও ৯০০-র বেশি প্রাণহানির মাধ্যমে এক বীভৎস মানবিক বিপর্যয়ের ছবি স্পষ্ট করেছে। পাল্টা জবাব হিসেবে তেহরান সরাসরি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে বিধ্বংসী ড্রোন ও মিসাইল নিক্ষেপ করে রণক্ষেত্রে নতুন মোড় নিয়ে এসেছে। এই পাল্টা আঘাত কেবল মার্কিন-ইসরায়েলি অক্ষের সুরক্ষা কবচকে চূর্ণ করেনি, বরং হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে গোটা অঞ্চলে যুদ্ধের আগুনকে আরও তীব্র করে তুলেছে। তেহরানের এই আক্রমণ কার্যত প্রমাণ করে দিয়েছে যে, তেল-বাণিজ্য আর ভূ-রাজনীতির লড়াইয়ে তারা আর কেবল দর্শক নয়, পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতের মুঠোয়।
আন্তর্জাতিক মহলের মতে, এই পরিস্থিতি আর কোনো আদর্শের লড়াই নয়, বরং তেল এবং বাণিজ্য রুট দখলের আদিম নেশা। ট্রাম্পের ব্যর্থ কূটনীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর টিকে থাকার 'যুদ্ধ-নির্ভর' কৌশল পুরো অঞ্চলটিকে এক ধ্বংসাত্মক চোরাবালিতে টেনে নামিয়েছে।


এই ভূ-রাজনৈতিক ডামাডোলের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ভারতের ওপর। হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ায় জ্বালানি আমদানির প্রধান পথটি রুদ্ধ হয়ে ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। অথচ, বিশ্ব পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে লাগাতার তেলের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার অবাধ সুযোগ তৈরি করে সরকার পরিস্থিতিকে আরও বিষাক্ত করেছে। ভারতের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্র, যে কিনা এই অঞ্চলের প্রধান অংশীদারদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে, তাদের এই অদ্ভূত নীরবতা কেবল কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়—এটি সরকারের আত্মরক্ষামূলক ভীরুতারই বহিঃপ্রকাশ। এই মেরুদণ্ডহীন নীতি দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভূ-কৌশলগত ভারসাম্যকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এই নতুন উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কঠোর অবস্থানের ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও ৫ শতাংশ বেড়েছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক এ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো জোরালো অবস্থান নেয়নি, যা বিশ্বমঞ্চে ভারতের প্রভাবকে কার্যত প্রশ্নচিহ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। পরিস্থিতি এখন আর কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই; এটি দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে গড়াচ্ছে, যেখানে ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য চরম অর্থনৈতিক সংকটের ঘণ্টা বেজে যেতে বাধ্য।


Scroll to Top