
না, তিনি কোনো চটকদার ‘মাস লিডার’ নন। বরং তিনি একাধারে তুখোড় একজন স্ট্র্যাটেজিস্ট এবং পোড় খাওয়া রাজনৈতিক সংগঠক। তাঁর দোষ ? একটাই। ভারতের জটিল একটা সমাজতাত্ত্বিক বুনটের রাজ্যে তিনি বামপন্থার মজবুত দুর্গ তৈরি করে দিয়েছেন এবং আগলে রেখেছেন, যা বিজেপি-আরএসএস শিবিরের কাছে দীর্ঘদিনের মাথাব্যথার কারণ। কেন মাথাব্যথা ? একটাই কারণে। তাঁর প্রশাসনিক মডেল ---
যে মডেলে জনস্বাস্থ্য, সাক্ষরতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার ওপর জোর দেওয়া হয়। অর্থাৎ ? অর্থাৎ, যা কিনা কেন্দ্রের বর্তমান কর্পোরেট-বান্ধব মডেলের সরাসরি বিপরীত।

কে তিনি এখনও বলে দিতে হবে ? আচ্ছা, বলেই দেওয়া যাক । তিনি পিনারাই বিজয়ন। এবং রাজ্যটা ? কেরল। এবং এই মুহূর্তে বিজয়ন কেরলের মুখ্যমন্ত্রীও নন, মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন কং - ইউ ডি এফ জোটের তরফে ভি ডি সাথিসন। এবং, তারপরেও কিন্তু আক্রমণের ধার কমেনি। আর, কারো সন্দেহ আছে কি কেরল থেকে বিজয়নকে সরানো মানে শুধুমাত্র একজন বামপন্থী নেতাকে সরানোর চেয়ে ঢের বেশি কিছু ? কিংবা বলা যায় না কি, মূল লক্ষ্য কেরলের ওই বিকল্প রাজনৈতিক আখ্যানটিকে চিরতরে মুছে ফেলার চেষ্টা।
লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বিজয়নের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগের পেছনেই রয়েছে একই সুর—তদন্তের নামে মিডিয়া ট্রায়াল। আসুন, অভিযোগগুলোকে একটু সাজিয়ে দেখা যাক: এক, ধরুন 'লাইফ মিশন’ প্রজেক্ট। আবাসন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ তুলে তদন্ত শুরু হল। অথচ এটি ছিল দরিদ্র মানুষের মাথার ওপর ছাদ দেওয়ার এক সামাজিক প্রকল্প। ইডি-র উদ্দেশ্য ছিল একটাই। প্রজেক্টের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে সরকারের জনকল্যাণমুখী ভাবমূর্তিকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া। তারপর স্বর্ণ চোরাচালান ইস্যু। এই কেসটিতে প্রথম থেকেই কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো রাজনৈতিক যোগসূত্র খুঁজতে ব্যস্ত ছিল। ঘটনার মূল হোতাদের খুঁজে বের করার চেয়ে মুখ্যমন্ত্রীর অফিসের দিকে আঙুল তোলাই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য, যাতে প্রশাসনকে অস্থির করে তোলা যায়। তারপর ধরুন, কেরালা কে-ফন (K-FON) ও ডিজিটাল প্রকল্প। ইন্টারনেটের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে লড়াই বিজয়ন শুরু করেছেন, সেই প্রযুক্তিগত ও পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রকল্পগুলোকেও ইডি-র নজরদারিতে ফেলা হয়েছে। উদ্দেশ্য আর কিছুই নয়, কেবল রাজ্যের বড় বড় পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ ট্যাগ দিয়ে আটকে দেওয়া।
অর্থাৎ, বিষয় একটাই। বিরোধী রাজনীতিকে স্তব্ধ করার ব্লু-প্রিন্ট নির্মাণ।
বিরোধী রাজনীতিকে নির্মূল করতে যে তিনটি স্তরে কাজ করা হচ্ছে তা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত।

প্রথমত, আর্থিক শ্বাসরোধ। রাজ্যের উন্নয়নের টাকা আটকে দিয়ে বা সরকারি কর্মকর্তাদের ইডি-র ভয় দেখিয়ে প্রকল্পের কাজ স্থবির করে দেওয়া। যাতে সাধারণ মানুষ মনে করতে শুরু করে যে সরকার অযোগ্য। দ্বিতীয়ত, আইনি গোলকধাঁধা তৈরি করা। বিরোধী নেতাদের নিয়মিত সমন পাঠিয়ে দিল্লির অফিসের বারান্দায় বসিয়ে রাখা। এতে আন্দোলনের নেতৃত্ব মাঠের লড়াই ছেড়ে আইনজীবীর চেম্বারে বন্দি হয়ে পড়ে। এবং তৃতীয়ত ও এক অর্থে প্রধানত, মরাল ডি-লেজিটিমাইজেশন।
প্রতিটি এজেন্সির অভিযানকে মিডিয়ার মাধ্যমে এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে, যেন বিজয়ন এবং তার সরকার কেবল দুর্নীতির আখড়া। লক্ষ্য একটাই—বিরোধী শিবিরের নেতাদের ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে জনমানস থেকে বিচ্ছিন্ন করা। এই জায়গা থেকে পিনারাই বিজয়নকে হেনস্থা করার অর্থই হল ভারতের ফেডারেল কাঠামোর এক বাতিঘরকে নিভিয়ে দেওয়া। যদি আজকে কেরালার এই দুর্গ কেন্দ্রীয় আগ্রাসনের কাছে নতিস্বীকার করে, তবে আগামী ভারত হবে এমন এক দেশ, যেখানে বিরোধী স্বর মানেই ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’। এর বিপরীতে বিজয়ন টিকে থাকছেন কি না, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন—ভারতীয় গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড কতখানি শক্তিশালী? ক্ষমতার এই অন্ধ দম্ভের সামনে মাথা নত না করাটাই এখন বিরোধী রাজনীতির একমাত্র পথ।
আগেই বলেছি বিজয়ন কোনো মাস লিডার নন, বরং সেই হিসাবে দেখলে একজন অত্যন্ত হিসাবনিকাশ করা, যাকে বলে ট্যাকটিক্যাল অর্গানাইজার। ফলে, বিজেপির তরফে বিজয়নকে কাবু করতে পারা মানে বামপন্থার শেষ দুর্গটিকেও গুড়িয়ে দেওয়া। তাই অন্য ভাবে না পেরে ইডি-কে ব্যবহার করে তারা বোঝাতে চাইছে যে, রাজ্য স্তরে বিজেপির বিকল্প হিসেবে দাঁড়ানোর সাহস দেখালে তার পরিণতি হবে এই।

এইখানেই প্রশ্ন উঠে আসে যে, সেক্ষেত্রে বিরোধী রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী ! কী অপেক্ষা করছে তার জন্য !
বলতে বাধা নেই , এই পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব খুবই ভয়াবহ! অন্তত ভারতের মতো দেশে পক্ষে।
কেননা এই যদি পরিস্থিতি খাড়া করা যায় তাহলে ‘ভীতু’ নেতৃত্বের উত্থান অবশ্যম্ভাবী। ক্রমাগত তদন্তের চাপে পড়ে অনেক বিরোধী নেতাই দেখা যাবে ভবিষ্যতে আপস করতে বাধ্য হচ্ছেন। আদর্শের লড়াইয়ের চেয়ে ‘নিজেদের বাঁচানো’ তখন প্রধান হয়ে দাঁড়াবে। ফলে রাজনীতির ময়দান থেকে তেজস্বী ও আপসহীন নেতৃত্ব বিলুপ্ত হতে বাধ্য। অন্য দিকে নির্বাচনী লড়াইয়ের বদলে তুলে আনা যাবে আইনি লড়াইকে। বিরোধী দলগুলো তাদের শক্তির বড়ো অংশ ব্যয় করবে আদালতের বারান্দায় এবং আইনি মোকাবিলায়। রাজনৈতিক প্রচার বা জনসভার চেয়ে আইনজীবীর চেম্বারে বসে দিন কাটানোই যখন রাজনীতির মূল কাজ হয়ে দাঁড়াবে, তখন গণআন্দোলনগুলো ধুঁকে মরবে। আর কেন্দ্র যদি ইডি-র মাধ্যমে রাজ্য সরকারগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে, তবে রাজ্যগুলোর স্বায়ত্তশাসন কেবল নামমাত্র হয়ে পড়বে। বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলো কেন্দ্রমুখী হতে বাধ্য হবে, যা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি ‘ফেডারেলিজম’-কে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দেবে। পাশাপাশি, ইডি-র প্রচারের ফলে সাধারণ মানুষের একাংশের মনে বিরোধী নেতাদের প্রতি অনাস্থা তৈরি করাও সম্ভব হবে। হবে কেন, বলা ভালো এটাই হচ্ছে। এবং এটাই বলতে গেলে সবচেয়ে বিপজ্জনক। জনগণ যখন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সব নেতাই দুর্নীতিগ্রস্ত, তখন স্বৈরাচারী শক্তির উত্থান আটকানোর জন্যে আর কোনো নৈতিক ভিত্তিই যে আর অবশিষ্ট থাকে না কেবল ভারত কেন, এটাই যে কোনো দেশের পক্ষে সবথেকে বিপজ্জনক।