
কলকাতার পুরনো গলিগুলোয় যখন সন্ধে নামে, তখন কেবল আলো-আঁধারই নামে না, সেখানে নেমে আসে এক মন্থর সময়ও—যে সময়কে ঘড়ির কাঁটায় কিংবা সংখ্যায় মাপা যায় না। শহরের এই বয়সের ভারে জীর্ণ ধমনীগুলো আধুনিকতার কংক্রিট যত যত্নেই চাপা দিতে চাক না কেন, অতীতের দীর্ঘশ্বাস কিন্তু আজও বাতাসকে ভারী করে রাখে।
যে বাড়িগুলোকে আমরা খামখেয়ালিভাবে ভুতুড়ে বলে দাগিয়ে দিই, তাদের জন্ম আসলে কোনো অলৌকিক ঘটনায় নয়—বরং মানুষের চরম অবহেলা আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের গর্ভে। সম্পত্তির লোভে ভাইয়ে ভাইয়ে রক্তক্ষয়ী লড়াই, আদালতের ধূলিধূসরিত বারান্দায় দশকের পর দশক পচতে থাকা দলিলপত্র, আর উত্তরাধিকারের স্বপ্নে গড়া চুন-সুরকির দেয়ালগুলোর ইঞ্চি ইঞ্চি করে নিঃশব্দে ক্ষয়ে যাওয়া—এই তো সেই বাড়িগুলোর আসল রূপ। পার্ক স্ট্রিটের ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের ম্যানশনই হোক কিংবা লর্ড সিনহা রোডের ভেঙে পড়া অভিজাত প্রাসাদ, ইট-কাঠ-লোহার সেই নীরবতা দর্শকের মনে ভয়ের চেয়েও অনেক বেশি জাগায় অদ্ভুত বিরক্তি আর গাঢ় করুণা।
কিন্তু শুধু সমাজতত্ত্ব বা নিছক মনস্তত্ত্ব দিয়ে তো আর সবকিছুর হিসাব মেলানো যায় না। যুক্তিবাদী মন যতই গলা ফাটিয়ে বলুক ভূত বলে কিছু নেই, ওই অভিশপ্ত বাড়িগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই মেরুদণ্ড দিয়ে এক শীতল স্রোত নামে আর চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। তার পেছনে কাজ করে সুনির্দিষ্ট কিছু অমীমাংসিত সত্য।
যেমন ধরা যাক উত্তর কলকাতার সোনাগাছি আর জোড়াসাঁকো এলাকার সীমানা ঘেঁষা এক বনেদি বাড়ির কথা। বিশাল বারান্দাওয়ালা এই বাড়িটি আজ পঞ্চাশ-ষাট বছর ধরে তালাবন্ধ, মরচে ধরা শিকল ঝুলছে প্রধান ফটকে। দোতলার একটা নির্দিষ্ট কোণের ঘরে এককালে নাকি বাড়ির শেষ শরিক, এক নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ মারা গিয়েছিলেন। বাড়ির কেউ খবরও রাখেনি। দিনকয়েক পর তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ালে পুলিশ এসে যখন দরজা ভাঙে, ততক্ষণে ঘরের ভেতর দেহ পচে গলে একাকার হয়ে গেছে। সেই ঘটনার পর থেকে ওই ঘরে আর কেউ পা রাখেনি।
আজও, যদি ভরদুপুরে ঐ বাড়ির পেছনের স্যাঁতসেঁতে গলি দিয়ে হাঁটেন, হঠাৎ আপনার কানের পর্দায় আঘাত হানবে এক অদ্ভুত শব্দ। ভারী লাঠির খটখট শব্দ তুলে কেউ যেন ঘরটার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ক্লান্ত পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হল, ওই ঘরে ঢোকার আর কোনো দরজাই অবশিষ্ট নেই। কত বছর আগে যে নিরাপত্তার খাতিরে বা সংস্কারের ভয়ে ওই ঘরের এন্ট্রি প্যাসেজটা ইট গেঁথে চিরকালের মতো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল কেউ বলতেও পারবে না। ভেতরে ঢোকার কোনো উপায় নেই, অথচ পদশব্দটি নিখুঁতভাবে জীবন্ত। কার ওই পায়ের শব্দ? এটা কি নিছক শূন্যতার ভার, নাকি কোনো জেদি, অতৃপ্ত আত্মা এখনও দেওয়ালে মাথা খুঁড়ে মরছে?
কিংবা ধরুন মধ্য কলকাতার বউবাজার এলাকার এক পুরনো ভাড়া বাড়ির কথা। নিচতলায় একটা পচাধসা, খরিদ্দারহীন মুদির দোকান। তার ওপরের দুটো তলা গত কুড়ি বছর ধরে সম্পূর্ণ ফাঁকা, যেন এক ভিনগ্রহের ধ্বংসস্তূপ। মেঝেতে পুরু হয়ে জমে আছে ঝরে পড়া পলেস্তারা, মৃত বাদুড়, পায়রার বিষ্ঠার তীব্র উৎকট গন্ধ।
ঠিক সেই ভাঙা কাঠের সিঁড়ির মাঝবরাবর এসে দাঁড়ালে এক আজব মায়া জাঁকিয়ে বসে। মাথার ওপরের ঝাড়বাতি আদলের আলো বহুদিন আগেই ভেঙে পড়েছে। চারপাশ অন্ধকার। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে পৌঁছনোর পর আপনি লক্ষ্য করবেন, আপনার নিজের ওপর কোনো আলো পড়ে ছায়া তৈরি হচ্ছে না, অথচ ঠিক আপনার পায়ের কাছে একটা অস্বাভাবিক লম্বা মানুষের ছায়া দেওয়ালে এসে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘাড়ের কাছে টের পেতে পারেন বরফ-ঠান্ডা এক নিঃশ্বাস, যেন কেউ আপনার খুব কাছে মুখ এনে নিচু গলায় আপনার নাম ধরে ডাকল। অথচ আতঙ্ক সামলে যখন ঝটকা মেরে পেছন ফিরে তাকাবেন, তখন কোত্থাও কিচ্ছু নেই—কেবল তিনটে হাঁ করা খোলা দরজাওয়ালা একটা শূন্য ঘর আর সেই ঘরের ভেতর ঘনীভূত জমাট অন্ধকার।
আচ্ছা, একটু অন্যরকম ঘটনায় যাই । এটা ঘটেছিল দক্ষিণ কলকাতার ল্যান্সডাউন এলাকার একটি ব্রিটিশ আমলের তিনতলা বাড়িতে। বাড়িটি একসময় মেসবাড়ি হিসেবে ভাড়া দেওয়া হত। সত্তর দশকের কোনো এক উত্তাল রাজনৈতিক রাতে এই মেসেরই এক ঘর থেকে এক তরুণ নকশালপন্থী ছাত্রকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায় বলে জনশ্রুতি আছে। তারপর থেকে সেই ঘরটা আর কোনোদিন ভাড়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে এক তরুণ সাংবাদিক বন্ধু কৌতূহলবশত সেই ঘরে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত আড়াইটে। শহরের কোলাহল থেমে গেছে। হঠাৎ সেই সাংবাদিক বন্ধুটি টের পান, বন্ধ জানালার ফাঁক দিয়ে বাতাস আসছে না, অথচ ঘরের ভেতরকার টেবিল ল্যাম্পের আলোটা দুলতে শুরু করেছে। ঠিক তার পরেই টেবিলের ওপর রাখা টাইপরাইটারটির চাবিগুলো আপনা থেকেই একটার পর এক শব্দ তুলে নড়ে উঠতে শুরু করে- ক্ল্যাক... ক্ল্যাক... ঘরের সমস্ত শক্তি যেন জমা হয়েছে ওই টাইপরাইটারের সামনে। কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে গিয়ে দেখেন, কাগজের রোলটার ওপর কোনো অদৃশ্য আঙুল বারবার একটা নির্দিষ্ট বাক্যই টাইপ করে চলেছে: ‘কে এখানে আমার টেবিল দখল করেছে?’ পরদিন সকালেই সেই ঘর ছেড়ে চিরকালের মতো পালিয়ে এসেছিলেন ঐ সাংবাদিক, আর সেই অভিজ্ঞতার কথা তিনি কোনোদিন কাউকে খুলে বলেননি।
চলুন ঘুরে আসি উত্তর কলকাতার হাতিবাগান অঞ্চল থেকে। এখানকার একটি বনেদি বাড়ির দোতলায় একসময় এক আলোকচিত্রীর স্টুডিও ছিল। সত্তরের দশকে স্টুডিওর মালিক এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর থেকেই জায়গাটি পরিত্যক্ত । দীর্ঘকাল অব্যবহৃত থাকার পর বছরকয়েক আগে এক তরুণ চিত্রশিল্পী নামমাত্র ভাড়ায় স্টুডিওটি নিজের কাজের জায়গা হিসেবে বেছে নেন। শিল্পী প্রথম থেকেই খেয়াল করেছিলেন, স্টুডিওর বড় কাচের জানালার সামনে দাঁড়ালে বাইরের ট্রামের আওয়াজ বা মানুষের কোলাহল যেন হঠাৎ এক লহমায় থেমে যায়।
ঘরের ভেতর একটা ভারী, জমাট বাঁধা আর্দ্রতা সব সময় থাকত। একদিন গভীর রাতে যখন তিনি ক্যানভাসে ব্রাশ চালাচ্ছিলেন, তখন স্টুডিওর কোণে থাকা পুরনো আমলের বড় ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় হঠাৎ এক দৃশ্য ভেসে ওঠে। আয়নার প্রতিবিম্ব বলছে—তিনি একা নন, তাঁর ঠিক পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে রয়েছেন কোট-প্যান্ট পরা এক মধ্যবয়সী মানুষ, যাঁর মুখের অবয়ব ঝাপসা কিন্তু চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। শিল্পী ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, নড়ার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলেন। পরমুহূর্তে আয়নার সেই অবয়বটি ফিসফিস করে বলে ওঠে, ‘রংগুলো ভুল জায়গায় পড়ছে, আলোটা ওখান থেকে আসবে না...’। পরের দিনই স্টুডিওর চাবি বাড়িওয়ালাকে ফেরত দিয়ে চিরতরে সেই বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন সেই শিল্পী।
খিদিরপুর ডকের পেছনের এক ভুলে যাওয়া গলি। ব্রিটিশ আমলের চুন-সুরকি দিয়ে গড়া এক গুদামঘর, যার দেওয়ালে দেওয়ালে উই ধরেছে বহু যুগ আগেই। উনিশ শতকের শেষ দিকে কুলিচালান বা জাহাজে মাল তোলার সময় এক বাঙালি মুন্সি নাকি হিসাবের গরমিলের জেরে ঐ গোডাউনের ভেতর রহস্যজনকভাবে মারা যান। তার পর থেকেই জায়গাটি অভিশপ্ত বলে চিহ্নিত। আজও সেখানে মাঝরাতে গেলে শোনা যায় নিখুঁত খাতার পাতা ওল্টানোর শব্দ। সাঁইসাঁই করে পাতা উল্টে যাওয়ার সেই আওয়াজ রাতের নৈঃশব্দকে চিরে দেয়। অথচ বিশাল ঐ হলের ভেতর কিচ্ছু নেই, কেবল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মরচে ধরা কন্টেনারের টুকরো আর ছারখার হয়ে যাওয়া কাঠের বাক্স। কড়িকাঠ থেকে ঘুলিয়ে নামা আলো-আঁধারি ছায়ায় মনে হবে, অদৃশ্য কোনো হাত বুঝি একটা অদৃশ্য ফাউন্টেন পেন দিয়ে খাতার পর খাতা লিখে চলেছে, আর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে মোমবাতি ও পুরনো পাতার তীব্র গন্ধ।
এগুলোকে স্রেফ সস্তা ভূতের গল্প বা মনের ভুল বলে উড়িয়ে দেবেন ? চেষ্টা করুন। পারবেন না। দেওয়া যায় না। এ আসলে ইট, কাঠ, পলেস্তারা আর শতাব্দীর জমে থাকা ইতিহাসের কণা দিয়ে তৈরি এক ধরনের গভীর মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক। আধুনিকতার মোড়কে মোড়া যে মানুষটা আজ মহাবিশ্বকে মুঠোয় পুরেছে বলে আস্ফালন করছে অবিরাম, কলকাতার এই প্রাচীন কাঠামো আর নিঃশব্দ অলিগলির আলো-আঁধারে এসে দাঁড়ালে মুহূর্তেই সে মর্মে মর্মে বুঝতে পারে—তার প্রযুক্তির অহঙ্কার কতখানি ভঙ্গুর। মানুষের গড়া এই দালানকোঠা একদিন কালের নিয়মে মাটিতে মিশে যাবে, আর তাদের ধ্বংসস্তূপের ওপর কেবল পড়ে থাকবে থমকে থাকা পরিত্যক্ত সময় আর বুকচাপা মলিন দীর্ঘশ্বাস।