বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
ব্রিটেনের মানুষের জীবন ও জীবিকা
ব্রিটেনের মানুষের জীবন ও জীবিকা



ব্রিটেন, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, পৃথিবীর অন্যতম উন্নত ও প্রভাবশালী দেশ। দীর্ঘ ইতিহাস, শক্তিশালী অর্থনীতি, উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বহুজাতিক মানুষের বসবাসের কারণে ব্রিটেনের সমাজ ও জীবনযাত্রা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। এখানকার মানুষের জীবন যেমন আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় সমৃদ্ধ, তেমনি উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট, কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো নানা চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ব্রিটেনের মানুষের জীবন ও জীবিকা তাই একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও বাস্তবতার এক জটিল চিত্র তুলে ধরে।
ব্রিটেনের মানুষের দৈনন্দিন জীবন সাধারণত সময়নিষ্ঠ ও নিয়মতান্ত্রিক। কর্মজীবী মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য গণপরিবহন, ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা সাইকেল ব্যবহার করেন। লন্ডনসহ বড় শহরগুলোতে ট্রেন, বাস ও আন্ডারগ্রাউন্ড মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ, ব্রিটেনের জীবনযাত্রায় রয়েছে নানা বৈচিত্র্য। সপ্তাহের কর্মব্যস্ততার পর ছুটির দিন পরিবার, বন্ধু, খেলাধুলা, ভ্রমণ কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সময় কাটানো অনেকের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ব্রিটেনের মানুষের জীবিকার প্রধান ভিত্তি হলো সেবা খাত। ব্যাঙ্কিং, বীমা, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, খুচরা ব্যবসা, পরিবহণ, পর্যটন ও পেশাগত সেবায় বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করেন। লন্ডন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্র হওয়ায় ব্যাঙ্ক, বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান, হিসাবরক্ষণ ও ব্যবসায়িক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানে বহু মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। একই সঙ্গে ম্যানচেস্টার, বার্মিংহাম, লিডস, গ্লাসগো, এডিনবরাসহ বিভিন্ন শহরেও প্রযুক্তি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়ে উঠেছে।
শিল্প ও উৎপাদন খাতও ব্রিটেনের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গাড়ি, ওষুধ, মহাকাশ প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, খাদ্যপণ্য ও বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে অনেক মানুষ যুক্ত। আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশের ফলে কর্মক্ষেত্রের ধরনও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কম্পিউটার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি এবং অনলাইন ব্যবসার প্রসারের কারণে নতুন ধরনের চাকরির সৃষ্টি হচ্ছে, আবার কিছু প্রচলিত কাজের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবা ব্রিটিশ সমাজের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা মানুষের জীবনে বড় ভূমিকা পালন করে এবং চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসনিক কর্মীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। একইভাবে শিক্ষা খাতেও শিক্ষক, গবেষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পেশাজীবী কাজ করেন। ব্রিটেনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করে, ফলে শিক্ষা ও সংশ্লিষ্ট সেবাগুলো অর্থনীতিতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।
তবে ব্রিটেনে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে লন্ডন ও দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের মতো এলাকায় বাড়ি ভাড়া ও সম্পত্তির দাম তুলনামূলকভাবে বেশি। বিদ্যুৎ, গ্যাস, খাদ্য, পরিবহণ ও অন্যান্য দৈনন্দিন খরচও পরিবারের বাজেটে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে ভালো আয় থাকা সত্ত্বেও অনেক মানুষকে মাসিক ব্যয়ের হিসাব করে চলতে হয়। তরুণদের জন্য বাড়ি কেনা অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে উঠেছে এবং অনেকেই দীর্ঘ সময় ভাড়া বাসায় বসবাস করেন।
ব্রিটেনের শ্রমবাজারে বিভিন্ন ধরনের মানুষের অংশগ্রহণ রয়েছে। কেউ পূর্ণকালীন চাকরি করেন, কেউ খণ্ডকালীন কাজ, আবার অনেকে স্বনিযুক্ত বা ছোট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। রেস্টুরেন্ট, দোকান, পরিবহণ, নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা, গুদাম ও পরিচর্যা খাতে বহু মানুষ কাজ করেন। অভিবাসী জনগোষ্ঠীও ব্রিটেনের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষ চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, ব্যবসা, পরিবহন, খাদ্যসেবা এবং অন্যান্য পেশায় অবদান রাখছেন।
ব্রিটেনের মানুষের জীবন শুধু কাজ ও অর্থ উপার্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অবসর ও বিনোদনেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ফুটবল, ক্রিকেট, রাগবি, টেনিস ও বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা মানুষের জনপ্রিয় বিনোদন। পার্কে হাঁটা, গ্রামাঞ্চলে ভ্রমণ, থিয়েটার, জাদুঘর, সংগীত অনুষ্ঠান এবং স্থানীয় উৎসবও সামাজিক জীবনের অংশ। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং সপ্তাহান্তে ছোটখাটো ভ্রমণ অনেকের কাছে মানসিক প্রশান্তির গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
ব্রিটেনের সমাজে বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশও লক্ষণীয়। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের নিজস্ব ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা মানুষের বসবাস ব্রিটিশ সমাজকে আরও বৈচিত্র্যময় করেছে। বিভিন্ন ভাষা, খাবার, পোশাক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পাশাপাশি অবস্থান করছে। ফলে ব্রিটেনের শহরগুলোতে একদিকে যেমন ঐতিহ্যবাহী ব্রিটিশ সংস্কৃতি দেখা যায়, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংস্কৃতিরও শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে।
বর্তমান সময়ে ব্রিটেনের মানুষের জীবনে প্রযুক্তির প্রভাব অত্যন্ত গভীর। অনলাইন ব্যাঙ্কিং, অনলাইন কেনাকাটা, রিমোট ওয়ার্ক, ডিজিটাল শিক্ষা এবং অনলাইন সরকারি সেবা মানুষের দৈনন্দিন কাজকে অনেক সহজ করেছে। করোনা মহামারির পর অনেক প্রতিষ্ঠানে বাড়ি থেকে কাজ করার সুযোগও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে যাতায়াতের সময় কমেছে, তবে কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের সীমারেখা নিয়ে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে।
ব্রিটেনের পারিবারিক জীবন গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ঐতিহ্যগত বড় পরিবারের পাশাপাশি এখন একক পরিবার, একা বসবাস এবং বিভিন্ন ধরনের পারিবারিক কাঠামোও দেখা যায়। কর্মজীবী নারী ও পুরুষ উভয়েই পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। সন্তানদের শিক্ষা, ভবিষ্যৎ সঞ্চয় এবং আবাসনের ব্যয় অনেক পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়। বয়স্ক মানুষের দেখাশোনার ক্ষেত্রেও পরিবার, সামাজিক সেবা এবং পেশাদার পরিচর্যা ব্যবস্থার সমন্বয় দেখা যায়।
ব্রিটেনে কাজের ক্ষেত্রে অধিকার ও কর্মজীবনের ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, ছুটি, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন সুবিধা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে আইন ও নীতিমালা রয়েছে। তবে বাস্তবে পেশাভেদে কর্মপরিবেশের পার্থক্য রয়েছে। উচ্চ দক্ষতার পেশায় কর্মরত ব্যক্তিরা অনেক সময় নমনীয় কর্মঘণ্টা ও বাড়ি থেকে কাজের সুযোগ পেলেও খুচরা ব্যবসা, পরিবহণ, রেস্টুরেন্ট বা পরিচর্যার মতো খাতে কর্মীদের নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হয়।
গ্রামাঞ্চলের মানুষের জীবিকা শহরের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। কৃষি, পশুপালন, খাদ্য উৎপাদন, পর্যটন ও স্থানীয় ব্যবসা অনেক গ্রামীণ পরিবারের আয়ের উৎস। যদিও কৃষি আগের তুলনায় অর্থনীতির ছোট অংশ দখল করে আছে, তবুও খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব রয়েছে। অন্যদিকে শহরগুলোতে অফিস, প্রযুক্তি, ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সেবা খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি।
ব্রিটেনের মানুষের জীবনে কর প্রদান ও সরকারি সেবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মানুষের আয়ের একটি অংশ কর হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে যায় এবং সেই অর্থের মাধ্যমে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহন, সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য জনসেবা পরিচালিত হয়। ফলে নাগরিকদের ব্যক্তিগত আয় ও সরকারি সেবার মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে কর, সরকারি ব্যয় ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে আলোচনা ও বিতর্কও দেখা যায়।
সবশেষে বলা যায়, ব্রিটেনের মানুষের জীবন আধুনিকতা, বৈচিত্র্য ও সুযোগের পাশাপাশি নানা অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ। উন্নত অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ মানুষের জীবনকে অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করেছে। অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসনের সমস্যা, কর্মক্ষেত্রের চাপ ও সামাজিক বৈষম্য মানুষের জন্য বাস্তব সমস্যা। তবুও পরিশ্রম, দক্ষতা, শিক্ষা ও নতুন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ব্রিটেনের মানুষ নিজেদের জীবন ও জীবিকাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। এই পরিবর্তনশীল সমাজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, ঐতিহ্যকে ধরে রেখে আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা। ব্রিটেনের মানুষের জীবন তাই কেবল একটি উন্নত দেশের জীবনযাত্রার উদাহরণ নয়, বরং পরিবর্তনশীল বিশ্ব অর্থনীতি ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।
                                  লেখক লন্ডনের বাসিন্দা 



ফলো করুন ফেসবুকে | থাকুন আপডেটেড
Scroll to Top