
সচিন তেন্ডুলকরের যখন টেস্ট অভিষেক হয় পাকিস্তানের মাটিতে সেই ১৯৮৯ সালে, তার ঠিক বাইশ বছর পরে জন্ম বৈভব সূর্যবংশীর। ১৯৮৯ সালে সোনার ভরি ছিল ৩১৪০ টাকা, চাল মিলত কেজি প্রতি আট থেকে বারো টাকায়। সর্ষের তেলের দাম ছিল ২৫ থেকে ৩০ টাকা, দুধ ( যা অতিপ্রিয় সচিন বা বৈভবের ) ছয় থেকে আট টাকা লিটার পিছু। পেট্রলের দাম ছিল প্রতি লিটার ৮. ৫০ পয়সা থেকে ১০ টাকার মধ্যে। এক মার্কিন ডলারের বিনিময়ে মিলত ৩২ থেকে ৩৫ টাকা।সচিন যখন পাকিস্তানের মাটিতে তাদের আগুনে ফাস্ট বোলারদের মোকাবিলা করছেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ষোলো। বাইশ বছর পরে জন্মানো বৈভব ক্রিকেট ব্যাট হাতে তুলে নেয় তার চার বছর বয়সেই। বারো বছর বয়সে সে বিহারের রঞ্জি ক্যাপ পায়। তেরো বছর বয়সে আই পি এলের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়। ২০২৬ এর আই পি এলে বৈভব ১৬ টি ম্যাচে ৭৭৬ রান করেছে এবং তার স্ট্রাইক রেট ২৩৭. ৩০। এরপর বৈভব সূর্যবংশী যে আই পি এলের সেরা খেলোয়াড় হবে তাতে আর আশ্চর্যের কী!
জুনিয়র ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক সাফল্য আর আই পি এলের কীর্তি বৈভবকে ভারতীয় দলে সুযোগ করে দেয় এবং ১৫ বছর ৯৯ দিন বয়সে সে ভারতের টি-২০ দলের হয়ে অভিষেক করে। সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার সচিনের রেকর্ডটি তার হয়ে যায়। তবু, সচিনের সঙ্গে তার বিস্তর ফারাক। সচিন ডানহাতি। বৈভব ব্যাট করেন বাঁ হাতে। মৌলিক এই পার্থক্যটুকু ছাড়াও দুজনের মধ্যে আশমান জমিনের ফারাক। দুশোটি টেস্ট খেলেছেন সচিন। মোট রান ১৫, ৯২১। ৪৬৩ টি ওডিআইতে মোট রান ১৮, ৪২৬। তাঁর সময় টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের চল তেমন ভাবে হয়নি। তাই একটি টি-টোয়েন্টি খেলেছেন সচিন। সাফল্য পাননি। মাত্র ১০ রান করেন সেই টি-২০ তে। সচিনকে ক্রিকেটের ঈশ্বর এমনি এমনি বলা হয় না। সব থেকে বেশি আন্তর্জাতিক রান তিনিই করেছেন। ১০০টি আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি করার দুর্লভ কৃত্বিত তাঁরই। এছাড়াও অসংখ্য রেকর্ড আর ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টি তাঁর মাথার মুকুটে অগুনতি পালক গুঁজতে সাহায্য করেছে। বিহারের সমস্তিপুরের অখ্যাত গ্রাম তাজপুরের বাসিন্দা কিশোর সূর্যবংশী এখনও সচিনের থেকে হাজার মাইল দূরে। অধ্যাপক বাবার সন্তান সচিন যদি হন 'আ ট্যালেন্ট অন আর্থ ফ্রম আরবান ব্যাকড্রপ', বৈভব সূর্যবংশী সেখানে 'আ ট্যালেন্ট অন আর্থ ফ্রম রুরাল ব্যাকড্রপ'। বৈভব সূর্যবংশীর বাবা সঞ্জীব সূর্যবংশী একজন সম্পন্ন কৃষক। স্থানীয় একটি দৈনিকের তিনি আংশিক সময়ের সংবাদদাতা। নিজের ইচ্ছা ছিল ক্রিকেটার হওয়ার। তা হয়নি। এখন ছেলের মধ্যে তিনি তাঁর সুপ্ত বাসনা চরিতার্থ করার পথে। সচিন নিজের সময়ে বিস্ময় বালক ছিলেন। এখন ট্যাগটি বৈভব সূর্যবংশীর গায়ে জড়ানো। বাবা তাজপুর গ্রাম থেকে একদিন অন্তর বৈভবকে নিয়ে একশো কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে পাটনার ক্রিকেট একাডেমিতে আসতেন। চার বছর বয়সে বাড়ির হাতার মধ্যে ব্যাটিং প্রাকটিস করত বৈভব। এখন তার সামনে সম্ভাবনার দিগন্ত। মাত্র পনেরো বছর বয়সে তার নেটওয়ার্থ এখন সাত কোটি টাকা থেকে দশ কোটি টাকা। তার এনডোর্সমেন্ট আছে কমপ্লান, গুগল পে, রেডবুল এবং এস এস ব্যাটস এর সঙ্গে। বৈভব কিন্তু এখনও সেই গ্রামের ছেলেটিই আছে। আজও হোলির দিন রং খেলায় মেতে ওঠে তাজপুরের বন্ধুদের সঙ্গে। পাটনায় মামার বাড়ি যাওয়ার কথা উঠলেই সে আজকাল আর হাততালি দিয়ে বলে ওঠে কিনা 'মামার বাড়ি ভারি মজা কিল চড় নাই' - তা অবশ্য জানা যায়না! কিন্তু,পাটনায় মামার বাড়ি যেতে সে খুব পছন্দ করে। শৈশবকে সে উপভোগ করে সেলফিতে, গাববু খেলায়। কিন্তু, পনেরো বছরের কিশোরটি জায়গা জমির ব্যাপারে খুবই সচেতন। বাবা সঞ্জীব সূর্যবংশীর সঙ্গে সে টাকার রোলিং করছে রিয়াল এষ্টেটের ব্যবসায়। সে জীবনকে গোছাচ্ছে এই পনেরো বছর বয়েসেই। এইভাবেই নিজের ক্রিকেট জীবনটাকেও গুছিয়ে নিতে পারবে তো বৈভব সূর্যবংশী? সময়, শুধু সময় এই প্রশ্নের জবাব জানে!
সময় এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারলেও জবাব দিতে পারবে না এই প্রশ্নের - বৈভব সূর্যবংশী এতো বেশি আক্রমণাত্মক কেন? মানছি টি -টোয়েন্টি ম্যাচে সময় বড় কম, প্রথম থেকেই আক্রমণাত্মক হতে হয় এই ফরম্যাটে। তবু, ব্যাটার নিজেকে একটু সময় দেবেনা সেটল হওয়ার জন্য? সচিন কিন্তু তাঁর ডিফেন্স সঠিকভাবে রেখেই অফেন্সে যেতেন। বৈভবকে নিজের রক্ষণকে আরও বেশি মজবুত করতে হবে। সচিনের সময় সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। অতি দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার তাগিদও ছিল না।বৈভবের সময় সোশ্যাল মিডিয়ার সর্বগ্রাসী খিদে মেটানোটাই একটা চ্যালেঞ্জ। এই যে লাল বলের ক্রিকেটে বৈভব পূর্বাঞ্চলকে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ব্যর্থ হলেন- সোশ্যাল মিডিয়া খুলে দেখুন, বৈভব সূর্যবংশী 'শেষ' বলে সেখানে কান্নাকাটির জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। অথচ এঁরা কেউ রাহুল দ্রাবিড়ের কথার মূল্য দেয় না। ভারতের প্রাক্তন এই হেড কোচ বলেছেন যে তিন ফরম্যাটেই খেলবে বৈভব। তাকে একটু সময় দিতে হবে। লাল বল আর সাদা বল ক্রিকেটে ভারসাম্য আনতে হবে। ক্রিকেটে চটজলদি কিছু হয় না। সময় দিতে হয়। ডিজিটাল দুনিয়ায় এই সময়ের বড় অভাব। আর তাতেই কাল হচ্ছে বৈভব সূর্যবংশীর। প্রথম থেকেই আক্রমণাত্মক হওয়ার তাগিদে, লাগে তাক নয়তো তুক মানসিকতার তাগিদে বৈভব আন্তর্জাতিক টি- টোয়েন্টিতে ছটি ইনিংসে মাত্র ১৯৩ রান করে।
এর মধ্যে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে ৮১ রানের একটি ইনিংসও আছে। এই ৮১ রান না হলে বৈভবের ছটি ম্যাচে অর্জিত রানসংখ্যা লজ্জাজনক হত। তাই বলি, বৈভব সূর্যবংশীকে তার আক্রমণাত্মক মানসিকতার সঙ্গে রক্ষণকেও একটু গুরুত্ব দিতে হবে। সাদা বল ক্রিকেটে যদি বা চলে এই আক্রমণাত্মক মেজাজ, লাল বলের ক্রিকেটে তা একদমই গ্রহণীয় নয়। লাল বলের ক্রিকেটে সাফল্য পাওয়ার জন্য নিজের ডিফেন্সকে একটু শক্ত পোক্ত জমির ওপর দাঁড় করাতে হবে বৈভবকে। দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক এ বি ডিভিলিয়ার্স অবশ্য বৈভবে এতটাই মুগ্ধ যে তিনি বলেছেন, বৈভবকে তার স্বাভাবিক খেলা খেলতে দেওয়া উচিত। ক্রিকেট ব্যাকরণের নাগপাশে তাকে বেঁধে ফেলাটা উচিত হবে না। মুগ্ধ আন্তর্জাতিক তারকা অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারও। অ্যান্ডিও ডিভিলিয়ার্স এর মতোই বলেছেন -এমন ক্রিকেটার কালেভদ্রে আসে। পনেরো বছর বয়সে এই ব্যাটিং ভাবা যায়! এদের দেখতেই দর্শক মাঠে আসে। এই বিস্ময় বালকদের সহজাত ক্রিকেট খেলতে দেওয়াই উচিত। কী বলছেন ক্রিকেটের ঈশ্বর স্বয়ং। সচিন তেন্ডুলকরও মুগ্ধ বৈভব সূর্যবংশীর ব্যাটিং এ। তিনি বলছেন - কী সুন্দর তার অ্যাগ্রেসন, পাওয়ার হিটিং। লেগ স্ট্যাম্প বল মিট করার জন্য পা সরিয়ে নেওয়ার মধ্যে অদ্ভুত একটা মুন্সিয়ানা আছে। ও ন্যাচারাল ক্রিকেটার। দোহাই আপনাদের, আমার সঙ্গে বৈভবের তুলনা টানবেন না। আমরা দুজনে দু সময়ের ক্রিকেটার। এখন ক্রিকেট টেকনিকালি অনেক উন্নত। অনেক বেশি পরিশীলিত। ক্রিকেটারদের থেকে দাবির ধরণটাও পাল্টে গেছে। আমাদের দুজনের মধ্যে তুলনা তাই নিরর্থক।
সচিন যতই বলুন, তুলনা হবেই। একজন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জীবনের প্রথম টেস্ট খেলেছেন ১৬ বছর ২০৫ দিন বয়সে, অন্যজন রঞ্জিতে বিহারের হয়ে অভিষেক করেন ২০২৪ সালে মাত্র ১২ বছর ২৮৪ দিন বয়সে। দুজনেই বিস্ময় বালক। তুলনা হবে না?