
আমি এই নিয়ে লিখব কথাটা শুনলেই আমার সম্ভাব্য পাঠকরা হয়তো বলে উঠবেন, ‘বুঝেছি, বুঝেছি ! এ নিয়ে আর আপনার লেখার কী আছে। আপনি বাঙালির ছেলে, আর কোনও দিকে সুবিধে করতে না পেরে বাংলা পড়েছেন, শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর চাকরি পেয়েছেন, আরও অনেক কিছু পেয়েছেন, তো বাংলা ভাষাই তো আপনাকে সব দিল—জীবন দিল, যাপন দিল, সমাজে দেখানোর মতো একটা মুখ তৈরি করে দিল-- এ নিয়ে আর লেখার কী আছে ! মুখবইয়ে আমার কোনও ‘বন্ধু’ যেমন সুখী রাজনৈতিক বিদ্বেষে, আমার সম্ভাব্য ‘অযোগ্যতার’ ইঙ্গিত করে বলেন আমি ‘গুছিয়ে নিয়েছি’, তার মূলেও আছে এই বাংলা ভাষা।
তা ঠিক। তবু নিজের মতো করে বলার কিছু থাকে, সেগুলোই এখানে লিখি। পাঠকের অনুমানের সঙ্গে তা অক্ষরে অক্ষরে নাও মিলতে পারে।
যেমন ধরুন, এটাই একটা কিম্ভূত আকস্মিকতা বা accident যে, আমি বাংলাভাষার ভূমিতে, বাঙালি হয়ে জন্ম নিলাম। কারণ একটা অবশ্য ছিল যে, আমার জন্মদাতা আর মাতা—দুজনেই বাঙালি। ঠিক ‘বাঙালি’ আপনারা বলবেন কি না জানি না। পশ্চিমবঙ্গের লোকেদের হিসেবে ‘বাঙাল’, একেবারে ঢাকার বাঙাল। কিন্তু তবু এক ধরনের বাঙালিই বটে। ফলে আমার ভাষা আমাকে প্রথম একটা আত্মপরিচয় দিল বাঙাল বাঙালি হিসেবে। তবে বাঙাল থেকে পুরোদস্তুর বাঙালি হয়ে ওঠার একটা ইতিহাসও ডিঙোতে হয়েছে আমাকে। তার পটভূমি এইরকম :
দেশভাগের দশ বছর আগে সেই দূর পুব বাংলায়, ঢাকা শহরের উত্তরদিকের একটা গ্রামে, তাঁরা যে বাংলা বলেন, এই শিশু যে বাংলা বলবে সেটা সকলের চেনা ‘বাংলা’ নয়, তার একটা উপভাষামাত্র। ‘বাংলাভাষা’ বলতে সবাই যা বোঝে, অর্থাৎ লেখাপড়ার মান্য চলিত বা প্রমিত বাংলা—তা থেকে শিশুর বাবা-মা নির্বাসিতই থেকে যাবে চিরজীবন। এই শিশুও হয়তো তার ওই গ্রামের ভাষার দেয়ালের মধ্যেই আটকে থাকত, যদি না—

যদি না, তাকে স্কুলে ভর্তি করা হত, লেখাপড়ার একটা লম্বা রাস্তায় ঠেলেঠুলে ঢুকিয়ে দেওয়া হত। তখন বইয়ে সে আর-একটা বাংলার চেহারা দেখল, যেটা মোটামুটি সব বাঙালির বাংলা। এই গেল এক নম্বর ‘যদি না—‘।
দু-নম্বর ‘যদি না—‘ হল, যদি না দেশটা ভাগ হত। এত মানুষের এক সর্বনাশ বয়ে আনা একটা ঘটনা এই ছেলেটাকেও সেই গ্রাম থেকে এপারে, এই চেনা বাংলা বলার এলাকায় এনে আছড়ে ফেলল, এবার তার নিজের জন্মভাষা, তার আসল মাতৃভাষা, একটু পেছনে সরে গেল। ক্রমে তার জীবনে তার ভূমিকা আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাবে। স্মৃতিতে থাকবে শৈশবের নানা সংলাপ, তার মৃত যমজ বোনের কিছু কথা, তার গেঁয়ো ভাষার কিছু গান, তাও বাংলা ভাষার এক আশ্চর্য সম্পদ। অন্য অনেক ভাষায় পল্লিগীতির এই আশ্চর্য নির্মাণ আছে কি না সন্দেহ। মাঝিমাল্লার গান, ‘হাড় কালা করলাম রে আমার দ্যাহ কালার লাইগ্যা, আমার অন্তর কালা করলাম রে দুরন্ত পরবাসী’ বলে কৃষ্ণের জন্য রাধার বিপুল আর্তি, খেজুর গাছের নীচে খেজুর খেতে আসা শেয়ালকে নিয়ে রঙ্গরসিকতার গান, বিয়ের গান, বেদে-বেদেনির (‘বাইদ্যা-বাইদ্যানি’র) গান—কত তার ভাষার বিস্তার, সুরের উল্লাস। কানের মধ্য দিয়ে ভাষা, গানের মধ্য দিয়ে ভাষা। উদ্বাস্তু বালকের চৈতন্যে মিশে যাচ্ছে অজস্র শব্দ, অজস্র সুর।

তো, সদ্য দশ-পেরোনো উদ্বাস্তু বালক এসে পড়ল চেনা মুখের বাংলার এলাকায়, আরও কত ভারতীয় ভাষার এলাকায়, হিন্দি ইংরেজি সিনেমা দেখতে লাগল অঢেল, বাড়িতে লুকিয়ে। সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে, প্রেমে ও অধ্যবসায়ে, দখল করতে লাগল বাংলার যে আর-একটা রূপ, লেখার, যার মধ্যে রয়েছে তার রাজকন্যার ঝাঁপি, তার সাহিত্য। পড়তে লাগল, কবিতা আর গদ্য লিখতে লাগল অপটু হাতে, পৌঁছোল রবীন্দ্রনাথের লেখায়, তাঁর গানে। আরও কত মানুষের অসামান্য সৃষ্টিতে। তাতেই সে আপাদমস্তক মজে গেল। এ অবশ্য কোনও একক ইতিহাস নয়, অভিনব ইতিহাস নয়। আরও অনেকের ক্ষেত্রে এমন হয়েছে। সে তার ঘরের বাংলা—সেই দূর মফস্সলের মধুর কিন্তু অন্যদের কাছে মজাদার মুখের বাংলা থেকে সরে এসেছে ইতিহাসের লাথিঝাঁটা খেয়ে, তার মুখ নতুন বাংলা, সেও মধুর, আলতো তুলে নিয়েছে—সেই ভাষাতে প্রথম প্রেমও জানিয়েছে কিশোরী সহপাঠিনীকে। সে সব পার হয়ে , সে লেখার বাংলা—সে ছন্দে হোক গদ্যে হোক, ধীরে ধীরে দুরস্ত করবার চেষ্টা করেছে। এইভাবে দু-একটা মোড় ঘুরে বাংলার মধ্যে পুরোপুরি ঢুকে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার ধাপে পা দিয়েছে। সেখানে বাংলা, মুখের হোক, লেখার হোক, তাকে বিমুখ করেনি। বিমুখ করেনি আরও এক অর্থে। বাংলায় এমএ পড়তে পড়তেই নিজের ক্লাস থেকেই দু-একটি মনোভঙ্গ পার হয়ে সে তার জীবনসঙ্গিনীকে তুলে নিয়েছে। তাতে তার জীবন অমিত ঐশ্বর্যে ভরে উঠেছে।
যাই হোক, বাংলার ভাষা ও সাহিত্য পাঠ তাকে পরীক্ষায় চমকপ্রদ সাফল্য দিয়েছে, জীবিকা দিয়েছে, জীবিকার মধ্য দিয়ে হাজার ছাত্রছাত্রীর ভালোবাসা দিয়েছে, এমনকি বাইরের পৃথিবীতেও পা রাখার সুযোগ করে দিয়েছে। সেখানেও সে বাংলাভাষাকেই সঙ্গে নিয়ে গেছে, তাকে তুলে ধরেছে।
এই বাংলাই তাকে দিয়ে একটা কঠিন শপথ করিয়ে নিয়েছে। বিদেশি ভাষা যতই ভালোবাস, তুমি আমার, তুমি আমার সঙ্গে থাকো। তাই সে বিদেশের মায়া ছেড়ে বাংলার কাছে ফিরে এসেছে, মূলত বাংলায় লেখার জন্য। অনেকেই বলবে, হদ্দ বোকার মতো সিদ্ধান্ত। কিন্তু, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, বিদেশে থাকার সুখ, গৌরব, মর্যাদা—সে সব তাকে টানেনি। তবে এটা তার পারিবারিক সিদ্ধান্ত ছিল, আর তার জন্য পরিবারও হাহুতাশ করেনি। তার বড় কন্যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মেছিল, সেও তার ‘জন্মভূমি’ বিষয়ে পরে উৎসাহ দেখায়নি, মা-বাবার প্ররোচনা ছাড়াই ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে।
বাংলা বলাটা তার একটা যাপন, সেটা তার প্রাপ্তি। শিল্পের মধ্য দিয়েও সে বাংলা বলার সুযোগ পেয়েছে, এক সময় নিয়মিত নাটক করেছে সে, দীপেন সেনগুপ্তের অনুকারে দু-বছর, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নান্দীকারে বছর পাঁচেক। শিল্পের বা নাটকের মধ্য দিয়ে বাংলা বলার একটা রোমাঞ্চ সে খুবই টের পেয়েছে। থিয়েটারে স্তব্ধ দর্শকেরা তার অভিনয় উপভোগ করছেন, ভালো একটা সংলাপে ‘ইশ্’ করে উঠছেন, হাসছেন, নিঃশব্দ থাকছেন (ঢিল ছুড়ছেন না), অভিনয় শেষে হাততালি দিচ্ছেন, এর সাময়িক নেশা সে পুরোপুরি উপভোগ করেছে, এজন্য তার নাটকের গুরু আর সহকর্মীদের সে গভীর শ্রদ্ধা আর প্রীতির সঙ্গে স্মরণ করে। তবু নাটকের বাংলা অন্যের লিখে দেওয়া বাংলা, সে সেই বাংলার শরীর আর মনের মধ্যে ঢোকবার চেষ্টা করে এক ধরনের উত্তেজনা আর আনন্দ পেয়েছে। তাও তো ভাষার কাছে তার প্রাপ্তি। অবশ্য বিদেশে ইংরেজি নাটকেও সে অভিনয় করেছে দু-একবার, সেখানেও শিল্পের সংলাপ তাকে স্নায়বিক উপভোগ দিয়েছে।

ক্লাসঘরে আর সভাসমিতিতে বলা অন্যরকম। এখানে অন্যের লেখা নয়, নিজেকেই পড়েশুনে ভেবে গুছিয়ে বলতে হয়। তাতে যখন ছাত্রছাত্রীরা বলেছে, ‘স্যার, আজ খুব ভালো পড়িয়েছেন’ বা শ্রোতারা বলেছে, ‘বড়ো অল্প কথায় সেরে দিলেন, আরও শোনার ইচ্ছে ছিল’, তখন তার পা দুটো কিছুটা মাটির ওপরে উঠে গেছে। মুখে কথা বলে মানুষকে কিছু একটা বোঝানোর বা ভাবানোর বা উৎসাহিত করার চেষ্টা করা, আর-এক কথায় মাস্টারি—যেন তার রক্তে মিশে ছিল। কিন্তু সে লক্ষ রেখেছে মাত্রায়। কোন্ শ্রোতার কাছে সে বলছে, তাদের কাছে কীভাবে কোন্ ধরনের বাংলায় কতটুকু বলতে হবে, বা ‘আজ আমি বেশিক্ষণ বলবার জন্য প্রস্তুত হয়ে আসিনি’ বলে টানা আড়াই ঘণ্টা কেন বলা উচিত নয়--তা সে খেয়াল রেখেছে।
লিখেছে সে অঢেল। সে জানত বাংলা তাকে কী দিতে পারবে, কী দিতে পারবে না। নানা ধরনের লেখা। ছোটদের ছড়া, গল্প, ভ্রমণকাহিনি, ব্যাকরণ, কঠোর প্রবন্ধ, মুক্ত গদ্য। নিজের লেখা বই তো একশো দশ ছাড়িয়ে গেল, সম্পাদিত বইও প্রায় সত্তরের মতো। পাঠকের ভিড়ের চাপ সইতে না হলেও তার বেশ কিছু পাঠক জুটেছে। ছোটরা তার কিছু ছড়া আবৃত্তি করে সে জানে, বড়রা তার নানা ধরনের লেখাই পড়ে। বড়রা মাঝে মাঝে ফোন করে তাঁদের তৃপ্তির কথা জানান, তাতে সে ধন্য হয়ে যায়। নতুন প্রবীণ বেশ কিছু প্রকাশক এখনও তার বই ছাপতে চান, এটাই কি কম কথা ! লেখার জন্য ছোটখাটো পুরস্কারও সে পেয়েছে, পেয়েছে নানা সম্মান ও সংবর্ধনা,--পাঠক ও গুণগ্রাহী বন্ধুদের কাছে তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। না, তার ঘরে কোটি কোটি টাকার নোটের বান্ডিল ছড়িয়ে রাখার কোনও সুযোগ ঘটেনি, তা নিয়ে তার বিন্দুমাত্র দুঃখ নেই।
কিন্তু সবই কি সুখের প্রাপ্তি বাংলাভাষার কাছে, দুখের প্রাপ্তি কিছু নেই ? আছে, তবে তা নিয়ে সে আজকাল ভাবেই না, সেই বিপন্ন অতীত এখন সে প্রায় বিস্মৃত হয়েছে।
ভাষার জন্যেই তো এত কিছু।
কত কিছু ? ভাষার কাজ তাকে তার মৃত্যুর পর কতদিন বাঁচিয়ে রাখবে ?
তা নিয়ে তার বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা নেই। সে নাস্তিক, মৃত্যুর পর তার কোনও সচেতন অস্তিত্বই থাকবে না জেনে তার দেহ চিকিৎসার জন্য দেওয়া আছে। বাংলাভাষার প্রতি, তার সংখ্যাহীন শ্রোতা আর পাঠকদের (যাঁদের মধ্যে তার ছাত্রছাত্রীরাও আছে) প্রতি গভীর ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা নিয়ে, এ ভাষা বলা আর লেখার সঙ্গে জুড়ে থেকেই সে জীবন সমাপ্ত করতে চলেছে। একটাই জীবন সে জানে।
মানুষের জীবন পেয়েছিলাম, এই না কত ! বাংলাভাষার মানুষের জীবন, শিক্ষায় জড়িত মানুষের জীবন।