
১০৮ বছর জনপ্রিয়তার প্রথম সারিতে একই জায়গায় রয়েছেন এক ভ্যাগাবন্ড। দুনিয়ার শিল্পসংস্কৃতি বিনোদনে কত আমূল বদল হল, বিশ্বায়ন নতুন করে সাজিয়ে তুলল জনসংযোগের সংজ্ঞাকে কিন্তু প্রতি দিন পালটে যাওয়া মানসভাবনায় ভ্যাগাবও কিন্তু রয়ে গেল এক নম্বরেতেই। ভ্যাগাবণ্ড? নাকি বলব ভবঘুরে কিংবা ট্র্যাম্প। আর ট্র্যাম্প শব্দটার আভিধানিক অর্থ যাই হোক না কেন, শব্দটা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে যে ছবিটি চকিতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে তা হল, ঢিলেঢালা ট্রাউজার্স, আঁটোসাঁটো কোট, এক বড় বহরের বিটকেল ডার্বি জুতো, ডান পায়েরটা বাঁ পায়ে, বাঁ পায়েরটা ডাইনে। হাতে বাঁশের ছড়ি। নাকে এক চিলতে প্রজাপতি গোঁফ। ট্র্যাম্প, ভবঘুরে, ভ্যাগাবণ্ড, যে নামেই ডাকি না কেন, সে তো সেই অবিস্মরণীয় চ্যাপলিনই।
কিন্তু প্রশ্ন জাগল। প্রশ্নটা জাগত না। প্রশ্নটা জাগত না যদি না তৃতীয়বার আমেরিকা ভ্রমণে গিয়ে আবিষ্কার করতুম আরেক হলিউড। সেই ক্যালিফোর্নিয়াতেই। প্রথমবার ক্যালিফোর্নিয়াতে গিয়ে প্রথম যে জায়গায় গেছি তা হল হলিউড। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সিনেমা তৈরির কারখানা।এখানে স্বপ্ন তৈরি হয়-ড্রিমল্যান্ড।হলিউড পাহাড়ের কোলে এই হলিউড-যেখানে একসময় ছিল অসংখ্য স্টুডিও। এখন বিভিন্ন স্টুডিও উঠে গিয়ে বা একে অন্যের সঙ্গে মিশে নটা বড় বড় স্টুডিওতে এসে দাঁড়িয়েছে। বাইরের লোকেদের সাধারণত প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু বাইরের লোক বা ট্যুরিষ্টদের জন্যে ইউনিভার্সাল স্টুডিও হলিউড ভ্রমণের ব্যবস্থা করে। টিকিট কেটে ওদের বাসেই ঘোরা। রূপকথার জগতে। চোখের সামনে উঠে আসে কিং কং, টাইটানিক জাহাজ, হ্যারি পটারের নানা চরিত্র বা জুরাসিক পার্কের ডাইনো। আরও কত সিনেমায় দেখা চরিত্রগূলো চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। ঠিক স্টুডিও দেখা নয়, রূপকথার জগতে আটঘন্টা যাপন। বরং বলা যায় জয়-রাইড। শেষে হলিঊড পাহাড়ে সেই প্রবাদপ্রতিম হলিউড লেখা ৪৪ ফুট চওড়া ৩৫২ ফুট লম্বা সাইনের নিচে ছবি তোলা।

সিনেমার জন্ম কিন্তু হলিউডে নয়। এমনকী মার্কিন সিনেমারও নয়। মার্কিন দেশে সিনেমা প্রথম দেখানো হয় নিউ ইয়র্কে। মার্কিনিরা বিশ্বাস করেন, আমেরিকাই প্রথম সিনেমা দেখিয়েছে। প্যারিসের ল্যুমিয়ের ভাইয়েরা নয়। হলিউডের সিনেমা আর্কাইভ সেইভাবেই তথ্য সাজিয়েছে। প্রথম সিনেমা দেখানোর কৃতিত্ব তারা সবটাই দিয়েছে টমাস এডিসনকে। নিউ ইয়র্কে প্রথম সিনেমা দেখানোর পরেই। অনেকেই বুঝে ফেললেন, বিনোদন দুনিয়ায় সিনেমা ব্যবসাটা বেশ লাভজনক হবে। তাই অনেকেই সিনেমা তৈরি ও প্রদর্শন শুরু করলেন। এদিকে এডিসন দেখলেন, তিনি সিনেমা আবিষ্কার করলেও, সিনেমা ব্যবসাটা ক্রমশ তাঁর হাত থেকে চলে যাচ্ছে। তাই তিনি বড় বড় সিনেমা কোম্পানিকে এক করে সিনেমাকে পেটেন্ট আইনের আওতায় আনলেন। পেটেন্ট আইনের আওতায় আসার ফলে ওই পেটেন্ট আইনের আওতায় থাকা ন’টি কোম্পানি ছাড়া আর কেউ সিনেমা বানাতে পারবে না। লুকিয়ে চুরিয়ে কেঊ সিনেমা বানালে তাদের আইনে জেল হওয়া শুরু হল। অথবা পেটেন্ট কোম্পানিগুলো গুন্ডা লাগিয়ে ফিল্ম রিল কেড়ে নিত। ফলে এইসব সিনেমা করিয়েদের পক্ষে আর সিনেমা বানানো সম্ভব হচ্ছিল না। তাই তারা এমন একটা জায়গা খুঁজহিল যেখানে সিনেমার পেটেন্ট আইন কাজ করবে না। এমন জায়গা কোথায় পাওয়া যায়? অবশেষে তারা আবিষ্কার করল একটা প্রন্তিক গ্রাম-হলিঊড। লস এঞ্জেলসের কাছাকাছি। কিন্তু সেভাবে তখনও অবধি সেখানে মানুষজনের বসবাস নেই। মিঃ হুইলে বলে একজন বন কেটে বসত তৈরির চেষ্টা করছেন। রিয়েল এস্টেট তৈরির ব্যবসা। সিনেমার নাম তখন বায়োস্কোপ। নিউ ইয়র্ক থেকে প্রায় ২৫০০ মাইল দূরে পেটেন্টহীন সিনেমা করিয়েরা চলে এলেন বায়োস্কোপ নিয়ে ব্যবসা করার জন্যে। অফুরন্ত রোদ আর সামনে পাহাড় ও সমুদ্র। বায়োস্কোপ তৈরির এর চেয়ে ভাল জায়গা আর কীই বা হতে পারে? আর এই সব দেখে ক্রমে পেটেন্ট কোম্পানিরা এমনকী এডিসন স্বয়ং চলে এলেন হলিউডে। ক্রমে এই হলিউড হয়ে উঠল সিনেমা তৈরির বৃহত্তম জায়গা। আর এই সময়ই তো জন্ম নিল পৃথিবীর সেরা ভবঘুরে। কিন্তু কোথায়?
চ্যাপলিন আমারিকার পশ্চিম উপকুলে এসে প্রথম হলিউডে ওঠেন নি। তিনি ১৯১৫ সালে মার্কিন দেশে এসে উঠলেন ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রানসিস্কোর ফ্রিমন্ট শহরের কছে নাইলস-এ। দ্বিতীয়বার আমেরিকা গিয়ে এই নাইলস-এর সন্ধান পাই। ফ্রিমন্ট থেকে সামন্য দূরে ফারঘেরা ছোট শহর নাইলস। এই শহরটাকে অ্যান্টিক হিসেবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে পর্যটকদের জন্যে। সেই ঊনবিংশ শতকের শেষে মার্কিন দেশটা কেমন ছিল, যাতে এই অ্যান্টিক শহরটা থেকে হদিশ পাওয়া যায়।এইখানে যাওয়া যায় পুরোনো দিনের কয়লা- রেলগাড়ি চেপে। নির্জন এক শহরে কিছু প্রাচীন কাফে, কিছু পুরনো দিনের বাড়ি। আমেরিকায় এসে প্রথম এখানেই ওঠেন চ্যাপলিন। সেই বাড়ি অবকল সেই রকম ভাবেই সাজিয়ে রাখা হয়েছে। দু কামরার বাড়ি। প্রথম ঘরে কাজ করবার টেবিল। পাশের ঘরে ছোট খাট।এই নিয়েই চ্যাপলিনের সংসার। কী সাধারণ। নাইলস-এ যখন পা দিচ্ছেন তিনি, তখনও তিনি স্টার হয়ে ওঠেন নি। আর পাঁচজন কৌতুক শিল্পীর মতই তাঁর স্টেটাস। হলিউডের আগেই এই নাইলস-এ তৈরি হয়ে গেছে এক ছোট হলিউড। আর সেখানে তৈরি হয়েছে স্টূডিও। হলিউডের আগেই এই এসানি স্টুডিও-তে নিয়মিত তৈরি হত বায়োস্কোপ। বেশিরভাগই নির্বাক কাউ-বয় ছবি। দু’তিন রিলের ছবি। প্রত্যেকটির বাজার ছিল দারুণ। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ত এই এসানির কাউবয়রা। এসানি স্টূডিওতে যোগ দিলেন চ্যাপলিন। সেই চুক্তিপত্র সযত্নে রাখা আছে এসানির মিউজিয়ামে। হলিউডের আগের হলিউড সাজিয়ে রাখা হয়েছে পুরো সেই সময়ের মত করে। শুধু হলিউড অ্যাক্টিভ, আর এসানি নয়। কিন্তু স্মৃতিমুখর।স্টূডিওর সমস্ত অনুপুঙ্ক্ষ সাজানো রয়েছে চারিদিকে। কাউবয়দের ঘোড়ার গাড়িগুলোও। সেই বায়োস্কোপের আদিকালের এক অবিকল চেহারা খুঁজে পাওয়া যায় এসানিতে,হলিউডের আগের হলিউডে। হলিউড যা ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় বাঁচিয়ে রাখেনি। নাইলস-এর পরিবেশ ছিল বা এখনও আছে যা সিনেমা তৈরির দারুণ অনুকূল। অফুরন্ত রোদ, খালের পাশে রেড-উডের সারি, ঝরনা, খাঁড়িপথ। আর একটু দূরেই খাঁড়ি দিয়ে ঢুকে আসা সমুদ্র এবং সেই জলকে ঘিরে ফার। সেই সময়ের কাউবয় ছবিতে এই সমস্ত দৃশ্য আমরা পেয়ে যাই। নাইলস মানে এক নস্টালজিক ভ্রমণ। বিশেষ করে সিনামাপ্রমীদের কাছে এ যেন এক চলচ্চিত্রের মক্কা। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ব্রাত্য।

চ্যাপলিন প্রথম চলচ্চিত্র পরিচালক হলেন নাইলস-এর এসানি স্টুডিওতে এসেই। এখানেই তিনি করলেন ‘দ্য ট্রাম্প’ ছবি। এসানি স্টুডিওর তরফ থেকে তাঁকে ছবি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হল।এই প্রথম নিজের মত করে ছবি করার সুযোগ পেলেন। এতদিন তো তিনি ছিলেন নেহাতই অভিনেতা,এবার নিজেই অভিনেতা, নিজেই পরিচালক। আর অভিনেতা পরিচালক হিসেবে বেছে লিলেন সেই ভবঘুরেকে- ঢিলেঢালা ট্রাউজার্স, আঁটোসাঁটো কোট, এক বড় বহরের বিটকেল ডার্বি জুতো, ডান পায়েরটা বাঁ পায়ে, বাঁ পায়েরটা ডাইনে। হাতে বাঁশের ছড়ি। ছবির নাম হল দ্য ট্রাম্প।আর এই ছবির নায়িকা হিসেবে তিনি নিয়ে এলেন এক নবাগতাকে, নাম-এডনা পুরভিয়ান্স। এডনার তিনি দেখা পান সান ফ্রান্সিসকোর এক ক্যাফেতে। দেখা মাত্র চ্যাপলিনের মনে হয়েছিল, এই হতে পারে ‘দ্য ট্রাম্প’ ছবির নায়িকা। স্যিচুয়েশন কমেডি। নানা কষ্টকর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে হাসির উপকরণ তৈরি করেন চ্যাপলিন। এক একটা এইধরনের সিচ্যুয়েশকে বলা হত এক একটা গ্যাগ। এই গ্যাগ নির্মাণে মৌলিক ক্ষমতার পরিচয় দিলেন চ্যাপলিন।যা সারা পৃথিবীতে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠল। আর চ্যাপলিনের সৌজন্যে রাতারাতি স্টার হয়ে গেলেন এডনা। তিনি পরপর চ্যাপলিনের সঙ্গে তিরিশখানা ছবি করলেন। চ্যাপলিন-এর ‘দ্য ট্রাম্প’ সারা পৃথিবীতে সুপারহিট। এর পর থেকে চ্যাপলিনকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সোজা হলিউড থেকে ডাক। তারপর তো ইতিহাস। ঠিক ২৫ বছর বয়সে সিনেমাজগতে ঢুকেই ভবঘুরে মুখোশটি পরে নেন চ্যাপলিন। ফেলে আসা ২৫ বছর জীবনের সঙ্গে কম লড়াই চালাননি তিনি। বাবা চার্লস আর মা দু'জনেই ছিলেন নাট্যকর্মী। মাত্র ৯ বছর বয়সেই, অভাবের কারণেই স্কুলছাড়া হয়ে এক নাচের দলে যোগ দিতে হল চ্যাপলিনকে। নাচের দল থেকে নাটকের দল। ব্রিটেনে কিছুদিন সিনেমার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আর সেখান থেকেই তো সরাসরি হলিউডের 'কিস্টোন ফিল্ম কোম্পানি'-তে।এবং রাতারাতি সারা পৃথিবীর এক নম্বর জনপ্রিয় স্টার। এই ফিল্ম কোম্পানিতে এসেই চ্যাপলিন পরে নিলেন সেই ভবঘুরে বা ভ্যাগাবণ্ড মুখোশ। তৈরি হল ভুবন কাঁপানো ট্রাম্প-ইমেজ বা আইকন। ঠিকই, আইকনই বা নয় কেন? চ্যাপলিন তো বেঁচে আছেন ট্রাম্প আইকনেই। সমগ্র চলচ্চিত্রজীবনে চ্যাপলিন তাঁর ট্রাম্প মুখোশ থেকে বেরিয়েছেন মাত্র কয়েক বছর— বোধ হয় আড়াই থেকে তিন বার এবং দর্শক কিন্তু ট্রাম্পহীন চ্যাপলিনকে তেমন ভাবে নেননি – যেমন ‘কিং ইন নিউ ইয়র্ক'-এ।
১৯১৪-তে আত্মপ্রকাশ করেছিল চ্যাপলিন-ট্রাম্প। 'ট্রাম্প'-এর জন্মের এক মজার ইতিহাস আছে। কিস্টোন কোম্পানির মালিক তখন ম্যাক সেনেট। সিনেমা-পাগল ম্যাক সেনেট একদা ডব্লু জি গ্রিফিথের সহকারী ছিলেন। আর সেই কোম্পানিতেই সিনেমা জীবন শুরু হল চ্যাপলিনের। থিয়েটার থেকে সিনেমায় প্রথম ছবি 'মেকিং এ লিভিং'। এই ছবিতে চ্যাপলিন কিন্তু ট্রাম্প নন, এক প্রেস রিপোর্টারের ভূমিকায়। তার পর তিনি করলেন, 'কিড অটো রেসেস ইন ভেনিস'। কিছু দিন আগে, তিনি ‘মেবলস স্ট্রেঞ্জ প্রেডিকামেন্ট' নামের ছোট ছবিতে অভিনয় করেন, প্রথম বারের জন্য ট্রাম্পরূপে। কিন্তু যেহেতু 'কিড অটো রেসেস ইন ভেনিস' আগে মুক্তি পায়, তাই দর্শক ট্রাম্প চরিত্রকে সেখানেই প্রথম দেখে।

অনেক ভেবেচিন্তে চ্যাপলিন ধার করেছিলেন এক মোটা মানুষের ট্রাউজার্স, সঙ্গে অন্য এক রোগা সহকর্মীর কোট। ট্রাউজার্সটা চ্যাপলিনের হল অত্যধিক ঢিলেঢালা, আর কোটটা হল ভীষণ টাইট। সঙ্গে পরলেন এক বেঢপ জুতো, সঙ্গে ছড়ি আর টুপি। শেষমেশ মেকআপের সময় নাকের ওপর জুড়ে দিলেন এক প্রজাপতি-গোঁফ। এই গোঁফ অবশ্য আমরা আর এক জনের নাকেও দেখেছি, তিনি হলেন হিটলার। চ্যাপলিন তো ঠাট্টা করে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেইছিলেন, হিটলার নামের লোকটা আমার গোঁফ চুরি করেছে।
দৈবাৎ হলেও, হিটলার আর চ্যাপলিনের জন্ম একই সালে— ১৮৮৯। সেই একই বছর অবশ্য জন্মেছিলেন জঁ ককতো এবং জওহরলাল নেহরু। আর এই বছরই তো টমাস এডিসন আবিষ্কার করেন চলচ্চিত্রের আদি ক্যামেরা। জন্মের মিল ও গোঁফের মিল থাকলেও চ্যাপলিন ও হিটলার ইতিহাসে রয়ে গেলেন দুই বিপ্রতীপে। চ্যাপলিন হয়ে উঠলেন পৃথিবীর অন্যতম ভালবাসার মানুষ, আর হিটলার? অতএব, জন্মের সাল ও গোঁফের মিল অমিলে কীই বা আসে যায়।
‘কিড অটো রেসেস ইন ভেনিস', ১৯১৪ সালের মাঝামাঝি সময় মুক্তি পেলেও ভবঘুরে বা ভ্যাগাবন্ড চরিত্রটি প্রতিষ্ঠা পেল নাইলস-এ এসানি স্টুডিওতে চ্যাপলিনের নিজের পরিচালনায় ‘দ্য ট্রাম্প’ ছবি মুক্তি পাবার সঙ্গে সঙ্গে। ভবঘুরে, বাউণ্ডুলে ভ্যাগাবণ্ড সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়ল। এই ট্রাম্প’কে ভালবেসে ফেলল সারা পৃথিবীর মানুষ। তবে সেটা কি শুধুই পোশাকের জন্যে! নিশ্চয়ই নয়, শারীরিক অভিনয়, কিছু কিছু অমোঘ ম্যানারিজমের মধ্যেও তিনি নিয়ে এলেন নতুন দিগন্ত। কমেডি যে শুধু কমেডি নয়, হাসির মধ্যেও তো থেকে যায় কান্না, এই দর্শনকে সিনেমায় নিয়ে এলেন তো তিনিই। যার সেরা প্রয়োগ 'দ্য কিড' ছবিতে— যার দ্বিতীয় শিরোনাম হল 'আ পিকচার উইথ আ স্টাইল— পারহ্যাপস উইথ আ টিয়ার'। এই ভবঘুরে হয়ে উঠল আংশিক ক্লাউন, আংশিক আউটসাইডার, সম্পূর্ণভাবে এক দার্শনিক। ১৯১৪ থেকে ১৯২২, এই আট বছরে ছোট বড় মিলিয়ে অনেক ছবি করেছেন। যার প্রায় প্রত্যেকটিরই কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছে ভ্যাগাবন্ড, ভবঘুরে বা ট্রাম্প। আর ১৯১৫ সালে একটা ছবিই তো করেছেন তিনি, যার শিরোনামই হল 'দ্য ট্রাম্প'।
১৯২৩-এ খুলে ফেললেন নিজের ফিল্ম কোম্পানি— ইউনাইটেড আর্টিস্টস কর্পোরেশন। সঙ্গে কিংবদন্তি ডি ডব্লু গ্রিফিথ, মেরি পিকফোর্ড, ডগলাস ফেয়ারব্যাঙ্কস। আর এই ব্যানারে একের পর এক পৃথিবী কাঁপানো ছবি— ‘আ উওম্যান ইন প্যারিস’, ‘দ্য গোল্ড রাশ', 'দ্য সার্কাস', ‘সিটি লাইটস', 'মডার্ন টাইমস’, ‘দ্য গ্রেট ডিকটেটর', 'মঁসিয়ে ভের্দু'।

এর পর তো তাঁর ব্রিটিশ পর্ব— 'আ কিং ইন নিউ ইয়র্ক’ এবং 'আ কাউন্টেস ফ্রম হংকং'। এই দু'টি ছবিতে আর ভবঘুরে চ্যাপলিন নেই। তাঁর একনিষ্ঠ দর্শকের অনেকেই এই দুটো ছবিকে সেভাবে পছন্দের তালিকায় রাখেননি। চ্যাপলিন-বিশেষজ্ঞরা হয়তো বলবেন ‘মডার্ন টাইমস’-এই তো শেষ চ্যাপলিন ট্রাম্প-আইকন। কিন্তু তাই কি? ‘মঁসিয়ে ভের্দু’ কি নয় ? শারীরিক অবয়বের কথা বাদ দিলে, ১৯১৪-র ভবঘুরে, ভ্যাগাবণ্ড, ট্রাম্প-এর প্রতিবাদী সময়োচিত সংস্করণ? শরীরি জেশ্চারে নয়, সিনেমার ভাষার সূত্রে।
ব্যর্থ-প্রাণ, সহজ, সজ্জনহীন এক মানুষ। কোথা থেকে একে আবিষ্কার করবেন চ্যাপলিন? তাঁর এই ট্রাম্প ইমেজের সঙ্গে তো সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে আছে তাঁর সেই ছোটবেলাকার কেনিংটন বক্তি। খুপরির মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়া সব মানুষ, বিচিত্র তাদের চরিত্র— অদ্ভুত তাদের পোশাকপরিচ্ছদ। সেই সব ছোটবেলায় দেখা ব্যর্থপ্রাণ মানুষদের সাবালক হয়ে নতুন করে আবিষ্কার করলেন তাঁর চৈতন্যের মধ্যে দিয়ে, বিকল্পে অনেকে বললেন ইন্টেলেকচুয়াল পারসেপশন।
চ্যাপলিনের ট্রাম্প তাই শতবর্ষ পেরিয়ে, পোস্টমডার্নিজমের ঝটকা পেরিয়েও অমর, কেননা চ্যাপলিনের ট্রাম্প হল গড় সাধারণ মানুষের কান্না হাসির- সুখ দুঃখ।
নাইলস-এ এডিসন-এর নামে খোলা হয়েছে এক সিনেমা মিউজিয়াম। অভিনব মিউজিয়াম। সেখানে রয়েছে নাইলস চত্বরে যে তিরিশটা ছবি করেছিলেন চ্যাপলিন। তার ক্যামেরা, কস্টিউম, চিত্রনাট্য আরও সব কিছু। রয়েছে এক প্রোজেকশন রুম। অবিকল সেই সময়ের মত সিনেমা হল। সেখানে হাতে ঘোরানো প্রোজেক্টরে নাইলস-এ চ্যাপলিনের তোলা ছবিগুলো দেখানো হয় । সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। তুমুল ব্যবাসায়িক সাফল্য লাভ করে ‘দ্য ট্রাম্প’ ছবিটি। সেই সুবাদে চ্যাপলিনকে এক গাড়ি উপহার দেওয়া হয় এসানি স্টুডিও-র পক্ষ থেকে।সেই গাড়িটি এখনও রাখা আছে নাইলস-এ চ্যাপলিনের বাড়ির সামনে।