
আমার বয়স ষাট। ক্লাস টেন পাস করার পর থেকেই একা একা পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছি। ৫৫ বছর বয়সে ভালো বেতনের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্যকে অনুসরণ করার জন্য—জীবদ্দশায় অন্তত ১০০টি দেশ ঘুরব। এখনও পর্যন্ত ৭৪টি দেশ ঘোরা হয়ে গেছে।
এই দীর্ঘ সফরে কত দেশ দেখেছি, সেখানকার প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করেছি, ইতিহাস জেনেছি, অসংখ্য নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু তার পাশাপাশি পেয়েছি এমন কিছু মানুষ, যাদের সঙ্গে হয়তো আমার পরিচয় হয়েছিল মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য, অথচ সেই পরিচয় পরে বন্ধুত্বে পরিণত হয়েছে।
আমার বয়সী solo traveller খুব কমই দেখেছি। তরুণদের উদ্যম, কৌতূহল আর জীবনের প্রতি আগ্রহ আমাকে ভীষণ টানে। ওদের কাছ থেকে পাওয়া এনার্জি আমার এই ধরনের ভ্রমণ আর অ্যাডভেঞ্চারের জন্যও খুব দরকার। ওদের সঙ্গে আমি খুব সহজেই মিশে যেতে পারি।
তাই পথে দেখা তরুণরা যখন আমাকে ‘স্যার’ বলে ডাকে, আমি হেসে বলি, 'স্যার নয়, বন্ধু হতে চাইলে শ্রী বলো।' বয়সের ব্যবধানটা দূরে সরিয়ে দিয়ে মানুষের সঙ্গে একটা সহজ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করতে আমার ভালো লাগে। কখনও সেই পরিচয় দশ মিনিটের, কখনও কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের। কিন্তু সেই মানুষটিকে আমি মনে রেখে দিই।

মিশরের দাহাব শহরে একবার গিয়েছিলাম বিখ্যাত Blue Hole-এ। পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক ডাইভিং -এর স্পট হিসেবে পরিচিত এই জায়গায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সেখানে দুই তিউনিশিয়ান তরুণের সঙ্গে দেখা হয়। তাদের একজন প্রথমে ডাইভ দিতে দ্বিধা করছিল। তার সঙ্গে কথা বললাম। হয়তো আমাকে দেখে, আমার বয়সের একজনকে ডাইভ করতে দেখে, তারও সাহস হল। কিন্তু সমুদ্র থেকে ওডার সময় বিপত্তি ঘটল। পিছন থেকে এক তরুণী ইজিপশিয়ান মেয়ে পিছলে গিয়ে আমাকে আঁকড়ে ধরল। দু’জনেই গিয়ে পড়লাম একটা বিশাল পাথরের ওপর। তার কিছু হয়নি, কিন্তু আমার হাড় ভাঙল।
সেই দুই তরুণ তখন আর শুধু পরিচিত নয়। পরম বন্ধুর মত তারা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল, আমার সঙ্গে সারাক্ষণ থাকল। সেখানে পুলিশ আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করল—পিছন থেকে কেউ আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছিল কি না, সেটাও জানতে চাইল। শেষ পর্যন্ত পায়ে প্লাস্টার নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরোলাম।
পায়ে প্লাস্টার নিয়েই ভ্রমণ চালিয়ে গেলাম। সেই দুই তরুণের সঙ্গে আজও যোগাযোগ আছে। এমনকী জীবনের নানা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ওরা আমার সঙ্গে কথা বলে।
ইন্দোনেশিয়ার Mount Ijen-এর কথাও মনে পড়ে। গভীর রাতে কঠিন পথ ধরে পাহাড়ে ওঠার সময় একদল তরুণের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ইতালির বছর সাতাশের একটি ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিল। আমি অভয় দিলাম, 'এত তাড়াতাড়ি হাল ছেড়ো না।' অন্ধকারের মধ্যে কথা বলতে বলতে আমরা উঠতে থাকলাম। শেষের অংশটা ছিল খুব কঠিন। ওকে বললাম, হাত দুটো আমার কাঁধে রাখো। ওর ওজন নিয়ে ওঠা আমার জন্যও সহজ ছিল না। কিন্তু কেউই হাল ছাড়িনি। রাত তিনটে নাগাদ গ্যাস মাস্ক পরে যখন Mount Ijen-এর জ্বলন্ত নীল আগুন দেখলাম, আমরা দু’জনেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। সেই রাতটা ওকে নিশ্চয়ই বুঝিয়ে দিয়েছিল—হাল ছেড়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়ে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যে পৌঁছনোর আনন্দটাই আলাদা।

ফিলিপিন্সের অসলব-এ গিয়েছিলাম whale shark-এর সঙ্গে সাঁতার কাটতে। এই অভিজ্ঞতার জন্যই বিশেষ করে Cebu গিয়েছিলাম। ভোর ছ’টার মধ্যে অসলব পৌঁছতে হবে, তাই রাত তিনটেয় উঠে Cebu City থেকে প্রথম বাস ধরেছিলাম। অসলব পৌঁছে তো গেলাম, কিন্তু আমার বয়স দেখে প্রথমে আমাকে মাঝসমুদ্রে একটি ছোট নৌকায় বয়স্ক ক্রূয়ের সঙ্গে পাঠাতে চেয়েছিল। আমি বললাম, আমি তরুণদের সঙ্গেই যেতে চাই। শেষ পর্যন্ত তিনজন তরুণের সঙ্গে গেলাম। আমি খুব ভালো সাঁতারু নই। কিন্তু জীবনে যে অভিজ্ঞতাগুলো পেতে চাই, বয়সের কথা ভেবে সেগুলো থেকে নিজেকে আটকাতে ইচ্ছে করে না। মাঝসমুদ্রে গিয়ে যখন ২৫-৩০ ফুট লম্বা একের পর এক whale shark আমার চারপাশে ঘুরতে শুরু করল, আমি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম। একজন তরুণ ক্যামেরা হাতে আমার সঙ্গে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমার প্রতিটি মুভমেন্ট আর whale shark-এর সঙ্গে আমার সেই অসাধারণ মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করতে লাগল।
বিদায় নেওয়ার সময় ওরা আমাকে বলেছিল, 'আমরা যখন আপনার মতো বয়সে পৌঁছব, তখন আমরা যেন নিজেদের সবচেয়ে ভালোবাসার জিনিসগুলো থেকে পিছিয়ে না যাই। আপনি আমাদের সেই কনফিডেন্স দিয়েছেন।'
আজও যখন ওদের কারও কাছ থেকে শুনি, কোথায় কাজ করছে, কী দায়িত্বে আছে, জীবনে কতটা এগিয়েছে—আমার ভিতরটা গর্ব আর আনন্দে ভরে যায়। মনে হয়, একদিন এই ছেলেটা যখন আরও বড় হবে, তখন আমি বুক ফুলিয়ে সবাইকে বলতে পারব, 'একে আমি চিনি।'
সম্ভবত এটাই আমার ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর প্রাপ্তি। পৃথিবীর প্রকৃতি, সংস্কৃতি আর ইতিহাস আমাকে যতটা দিয়েছে, পথে দেখা মানুষগুলোও আমাকে ততটাই সমৃদ্ধ করেছে। কখনও মাত্র দশ মিনিটের পরিচয়, কখনও কয়েক দিনের সঙ্গ—কিন্তু সেই সম্পর্কটুকু আমি ফেলে আসিনি। হৃদয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছি।