তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
কিশোর মনের উড়ান-স্বপ্ন

অসমের পরিচালক রিমা দাসের ছবি ‘নট আ হিরো’ বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে ‘শিশু ও কিশোর দর্শক’ বিভাগে সেরা ছবি হিসাবে ক্রিস্টাল বিয়ার স্পেশাল মেনশন’ পুরষ্কারে সম্মানিত হয়েছে।

সত্যি বলতে কী, প্রেক্ষাগৃহেই ছবির আসল জন্ম হয়। বড়ো পর্দার সামনে অন্ধকারে পাশাপাশি বসে অচেনা মানুষের সঙ্গে হাসি, কান্না, নিঃশ্বাস ভাগ করে নেওয়ার যে অভিজ্ঞতা—সেখানেই তো লুকিয়ে থাকে সিনেমার প্রাণ। অথচ স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের ঝলকে সেই সম্মিলিত আনন্দ আজ প্রশ্নের মুখে। এমন এক সময়ে রিমা দাস-এর মতো নির্মাতা মনে করিয়ে দেন, সিনেমা এখনও মরে যায়নি ; তার শিকড় মাটির গভীরে, শিশুর কল্পনায়।
তাঁর নতুন ছবি ‘Not A Hero’-র শুরু শহুরে এক কিশোর মিভানকে দিয়ে। স্মার্টফোনে ডুবে থাকা, ইংরেজিতেই বেশি স্বচ্ছন্দ এই মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলেটিকে হঠাৎ দু’মাসের জন্য পাঠানো হয় দূর গ্রামের কাকিমার কাছে। গরমে হাঁসফাঁস, আরামহীন বাসস্থান—প্রথমে সে যেন নির্বাসন। কিন্তু ধীরে ধীরে গ্রামের প্রকৃতি, নতুন বন্ধু আর স্বাধীনচেতা কাকিমার সান্নিধ্যে তার ভেতরেও বদল আসে। রিমা দাস অসমের গ্রামকে কখনও রূপকথার পোস্টকার্ড বানান না, আবার নির্দয় বাস্তবের আঁচড়েও ভরিয়ে দেন না। সামাজিক ফাটল আছে, পরিবর্তনের ছাপ আছে—তবু, সবকিছু ছাপিয়ে কোথায় যেন রয়ে যায় কিশোর মনের উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন।


‘Bulbul Can Sing’ বা ‘Village Rockstars 2’ -এর ধারাবাহিকতায় এখানেও দেখা যায়, প্রেক্ষাগৃহ না থাকলেও প্রকৃতি নিজেই হয়ে ওঠে সিনেমা। শিশু অভিনেতাদের অনাড়ম্বর স্বতঃস্ফূর্তি মনে করায় হিরোশি শিমিজু-র ছবিকে—অভিনয় নয়, যেন জীবনের সরাসরি উপস্থিতি। একটি মেলার দৃশ্যে ক্যামেরা যেন আড়ালে সরে যায়; বাচ্চাদের খেলাই হয়ে ওঠে খাঁটি কবিতা। সেই মুহূর্তে মনে পড়ে জাঁ রেনোয়া-র ‘The River’, কিংবা স্মৃতির আলো-ছায়ায় ভেসে ওঠা মার্সেল প্রুস্ত-এর শৈশব-লিখন (On The Search For The Lost Time)।
ছবির এক মৃদু অথচ গভীর রেখা—একটি ঘোড়া ও এক কিশোরের বন্ধুত্ব। বড়োদের কাছে সে বিক্রয়যোগ্য সম্পদ; শিশুর কাছে প্রাণের সঙ্গী। এখানেই ধরা পড়ে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আর বাস্তবতার অনিবার্য শাসন। কাকিমার চরিত্রে অনুরণিত হয় ভার্জিনিয়া উলফ-এর ‘A Room of One's Own’-এর সেই উচ্চারণ—নিজস্ব একটি ঘর, নিজের মতো বাঁচার অধিকার।
রিমা দাসের ছবির সৌন্দর্য নির্দিষ্ট ভাষায় বাঁধা যায় না। শুধু মনে হয়, এ যেন সিনেমার সেই হারিয়ে যাওয়া স্বর্গের দীর্ঘ প্রতিধ্বনি। তাই এই লেখা — যেন প্রমাণ থাকে, এমন কোমল অথচ দীপ্ত চলচ্চিত্র আজও, আমাদের এই সময়ে বসেও, সম্ভব।


Scroll to Top