
আমার ছোটবেলা কেটেছে বরানগরে।
গঙ্গার ধারে ছিল আমাদের বাড়ি৷ দোলের দিন দুপুর থেকে গঙ্গার জল লালচে হয়ে যেত। গা ছমছম করত দেখে। দোল খেলা নিয়ে সচেতনতা এখন অনেক বেড়েছে।
আবির, ভেষজ আবিরের ব্যবহার বেড়েছে। অসুস্থ, অনিচ্ছুক মানুষকে জোর করে রং মাখানোর প্রবণতাও অনেকটাই কমেছে। তখন এগুলো অনেক বেশি মাত্রায় ছিল। তারপর জীবজন্তুর গায়ে রং দিয়ে অন্যায় মজা, আগের থেকে এখন অনেক কম, আগে কেউ এসব নিয়ে ভাবতই না৷

বসন্ত উৎসব মূলত উপভোগ করেছি শান্তিনিকেতনে। সে অনেক বছর আগেকার কথা। তখন এত ভিড় হোতো না।
সকালে সুনীলদা, শক্তিদা, গৌরকিশোর ঘোষ আড্ডা দিতেন ইন্দ্রদার দোকানে সুবর্ণরেখার সামনে। কখনও আসতেন সাগরময় ঘোষ, কখনও নবনীতা দেবসেন৷ অমর্ত্য সেনকে কখনও দোল খেলতে দেখিনি আমি৷ একটু একা থাকতেন, ছাত্রদের সঙ্গে বেশি মিশতেন৷ সুবর্ণরেখা দোকানটি অনেকদিন হোলো বন্ধ। ওই দোকানে কে না এসেছেন!
আবির ছাড়া তখনও শান্তিনিকেতনে কোনও রং, অন্য রঙের অনুপ্রবেশ অকল্পনীয় ছিল।
একদিকে বিশ্বভারতীর কঠোর কড়াকড়ি। আর একদিকে শক্তি, সুনীল, সন্দীপনের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা৷
একবার সুনীলদা বেশ অসুস্থ। দোলের আগের দিন রাতে যোগেনদা মানে শিল্পী যোগেন চৌধুরীর বাড়িতে সুনীলদা বললেন, ডাক্তার আমাকে খুব কম জল খেতে বলেছে।

কিডনির অবস্থা ভাল নয়৷ আধ লিটারের বেশি জল খাওয়া যাবে না৷ কী যে করি? সত্যি আমরা ভাবছি তেষ্টা পেলে জল না খেয়ে থাকা তো খুব কষ্টকর। উনি বললেন, এমনিতে জলটল তো আমি খুব একটা খাইনা, কিন্তু দিনে পাঁচ সাত পেগ মদ তো খেতে হবে, তাই এক একটা পেগে খুবই কম করে জল মেশাতে হচ্ছে। কড়া হয়ে যাচ্ছে একটু। যোগেনদা বললেন, আপনি জল মেপে খাচ্ছেন আর সাত পেগ করে হুইস্কি খাচ্ছেন? তাহলে আর জলের নিয়মটাই বা মানছেন কেন? সে এক ভয়ানক বাউন্ডুলে সময় তখন৷ শক্তিদা দোলে গেলেন, সবাই মিলে কত আনন্দ। দোলের পরেরদিন আমরা ফিরে এলাম। বিশ্বভারতীতে লেকচার দিতে রয়ে গেলেন শক্তিদারা। রং মাখতে উনি খুব পছন্দ করতেন। সেবার দোলে সকলকে বলছিলেন, ইচ্ছে করছে, বোলপুর ছেড়ে আর ফিরবনা।
তিনি সেবার আর ফেরেননি। দু-একদিন পর ফুলে ঢাকা একটা রেলের কামরা এসে দাঁড়িয়েছিল হাওড়া স্টেশনে।
এখনও দোলে বোলপুরে গিয়ে অর্ধেক কলকাতা হাজির হয়৷ মানুষ বদলে গিয়েছে, মুখ বদলেছে। কিন্তু আবিরে, আসরে প্রায় আগের মতোই আছে সবকিছু।