
মেয়েগুলো যেমন বজ্জাত, তেমন দজ্জাল। চারটি মেয়েই বলতে গেলে, চারখানি অবতার। শ্রীমা, রানি ,রিঙ্কু, মিনতি –- এরা খেটে খায় –-- কেউ রান্না করে, কেউ অটো চালায়,বেশ্যাবৃত্তি করে, কেউ ট্যানারিতে কাজ করে –- প্রত্যেকেরই যেমন চোপা, তেমনই গতর। তাদের সংলাপের ধার ছুরির থেকে কিছু কম নয়। বাংলা ছবির নারী চরিত্রের মুখে এমনতরো খুল্লামখুল্লা ( পড়ুন গালিগালাজ) কথা, আগে শোনা গেছে বলে মনে হয় না। সিরিজের গোড়ায় আকস্মিকভাবে মিনতির হাতে তার স্বামী খুন হয়ে যায় , আর সেই খুনকে লুকোতে তৎপর হয়ে ওঠে বাকি তিন জন। এখান থেকেই শুরু হয় তোলপাড় –-- ডেডবডি সরানো যে কী কঠিন কাজ, হাড়ে হাড়ে টের পায়, ওরা। সেই সঙ্গে যত রকম বদমাইশি করা যায় সব করতে থাকে। এর মধ্যে, সিনে উপস্থিত হয় গুণ্ডা রানা ( অনির্বাণ চক্রবর্তী) । মেয়েগুলোর জীবনের জট আরো পাকে। এর মধ্যেই মিনতি যখন তার শিশুকন্যাকে পড়াতে চায়, স্বপ্ন দেখে, একদিন তার মেয়ে বড়ো চাকরি করবে, সীমা চায় তার পুত্র নিজের ইচ্ছে পূরণ করুক – আপাত ক্রূরতার আড়ালে থাকা, তাদের অবরুদ্ধ, কোমল-স্বপ্নালু মনগুলো দেখতে পাই আমরা। এই ছবিতে, দীর্ঘদিন ধরে, পর্দায় দেখা কোমলমতি, লক্ষ্মী নারী-চরিত্রদের স্টিরিওটাইপ ভেঙেছে বটে তবে তাদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন সবটাই খানিক আরোপিত, অগভীর । জোর করে কেবল ছক ভাঙছে দেখানোর জন্যই ছক ভেঙেছে তারা। নারীর ক্ষমতায়ন, ঈর্ষাপরায়ণতা, আধিপত্য কায়েমের আকাঙ্ক্ষা – দুর্দান্ত উপায়ে ফুটিয়ে তুলেছেন অভিনেত্রীরা । যেটা আসল ভালো লাগার জায়গা, তা হল, এই ছবিতে চিরাচরিত পথ অনুসারে, মেয়েদের শেষ অব্দি দেবীত্বে উত্তীর্ণ হতে হয়নি – তারা ভালো-মন্দ মিশিয়ে তেমনই, যেমন মানুষ হয় আর কী ! তাদের ক্ষুণ্ণিবৃত্তির যোগাড় করতে হয় যেভাবে, সেখানে পরিশীলিত নারীদের ত্যাগের মহিমার গুণকীর্তন করা সম্ভব যে নয়, তা পরিচালক বুঝেছেন এবং দর্শকদেরও বুঝিয়ে ছেড়েছেন । এরা সব গালিগালাজের ফোয়ারা ছোটানো ঠোঁটকাটা মেয়ে – স্বার্থের জন্যে পরস্পরের তারা বিরোধিতাও করেছে। শেষটায় পরিচালক, মেয়েদের নিজস্ব সিস্টারহুডকে জিতিয়ে দিয়েছেন। এবং জোটবাঁধার ব্যাপারটাকেই তুলে ধরতে চেয়েছেন। দুর্দান্ত কাজ করেছেন শ্রীমার চরিত্রে স্বস্তিকা। তাঁর মেকআপ বিহীন চামড়া, অবিশ্রাম খিস্তির মুখভঙ্গি আবার প্রমাণ করে, তিনি কত বড়ো অভিনেত্রী। দুর্দান্ত কাজ করেছেন শ্রেয়া, শ্রুতি, হিমিকা। এঁরা সবাই লম্বা রেসের ঘোড়া।

সম্প্রতি, নেটফ্লিক্সে, ‘অ্যাকিউজড’ রিলিজ করেছে। অনুভূতি ক্যাশপ পরিচালিত এই ছবির মূল চরিত্র,গীতিকা সেনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন কঙ্কনা সেন। সমকামী দাম্পত্য, পাওয়ার গেম ছাপিয়ে যে বক্তব্য পেশ করা হয়েছে, তা হল, ক্ষমতা পেলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ,কেউই আর কোনোকিছুর পরোয়া করে না। তখন সে জানে, সে যা খুশি করার অধিকারী। তবে, চিত্রনাট্য যতখানি গুরুত্ব দিয়ে গীতিকা সেনের চরিত্র নির্মাণ করেছে, ততখানি গুরুত্ব দিয়ে প্লটটিকে তৈরি করেনি। ফলে, ছবির ক্রাইসিসটাই দর্শক দেখতে পাননি। ডঃ সেনের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ, বিশেষ করে, সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের মতো গুরুতর অভিযোগের মুখোমুখি হয়েও যেভাবে প্রতিক্রিয়া দিলেন, তাও অবাক লাগে। আসলে, চিত্রনাট্যের আরও খানিক গভীরতা দরকার ছিল। আরো খানিকটা স্পেসেরও প্রয়োজন ছিল, ছবির সঙ্গে দর্শকদের একাত্ম করতে। গীতিকাকে অনেকটা একমাত্রিক ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিষয়গত দিক দিয়ে, একেবারে বিপরীত হলেও, নারী দুটি ছবিরই কেন্দ্রেবিন্দু। এবং দুটি ক্ষেত্রেই তাদের একেবারে বাস্তব সম্মত উপায়ে দেখানো হয়েছে। মেয়েদের দশভুজা, সর্বংসহা মিথ ভেঙে তাদেরও দোষে-গুণে পুরোপুরি মানবিক অবতারে পর্দায় আনার জন্য, পরিচালকদের ধন্যবাদ।