
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুনিয়ায় কার হাত থাকবে স্টিয়ারিংয়ে ? নীতি, নৈতিকতা না নিছক মুনাফা ? সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজতে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীতে বসল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এ আই সমাবেশ— ইন্ডিয়া এ আই ইম্প্যাক্ট সামিট ২০২৬। সমাবেশ বসেছিল আন্তর্জাতিক সম্মেলন পরিকাঠামোর নতুন প্রতীক ভারত মণ্ডপম-এ। আয়োজক কেন্দ্রীয় ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক ও ইন্ডিয়া এ আই মিশন। পাঁচ দিনের এই সম্মেলন কার্যত দিল্লিকে পরিণত করেছিল এ আই কূটনীতির অস্থায়ী রাজধানীতে।
এই সম্মেলনে অংশ নেন ৮০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি, নীতিনির্ধারক, প্রযুক্তি সংস্থার শীর্ষকর্তা, গবেষক ও স্টার্টআপ উদ্যোক্তারা। সেশন কক্ষ থেকে প্রদর্শনী হল—সব জায়গায় ঘুরে ফিরে উঠে এসেছে একটাই প্রশ্ন: ‘এ আই কি মানবকল্যাণের সঙ্গী, না কর্মসংস্থানের প্রতিদ্বন্দ্বী?’

স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন—এই চার খাতে এ আই-এর ব্যবহার নিয়ে ছিল জোরালো আলোচনা। আয়োজকদের মূল বার্তা, পিপল , প্ল্যানেট অ্যান্ড প্রগ্রেস—অর্থাৎ প্রযুক্তি যেন মানুষ ও প্রকৃতির বিরুদ্ধশক্তি না হয়ে উন্নয়নের সহায়ক হয়।
সম্মেলনের শেষ দিনে আলোচনায় আসে সম্ভাব্য ‘দিল্লি ডিক্লারেশন’ — এআই ব্যবহারের আন্তর্জাতিক নীতি ও নৈতিকতার এক প্রাথমিক কাঠামো। ডীপফেক, ডেটা সুরক্ষা, অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র—বিতর্কিত প্রতিটি বিষয়ে কীভাবে বিশ্ব এক ছাতার নীচে ন্যূনতম নীতি নির্ধারণ করবে, তার ইঙ্গিত দিয়েছে এই প্রস্তাব।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এ হল আসলে ভারতের তরফে এক কৌশলগত মুহূর্ত—পশ্চিম ও পূর্বের প্রযুক্তি-দ্বন্দ্বের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি ‘মধ্যপন্থা’ প্রস্তাবের চেষ্টা। আবার সমালোচকদের প্রশ্ন, ঘোষণার ভাষা যতই প্রগতিশীল হোক, এসবের কার্যকর প্রয়োগ বাস্তবে কতটা সম্ভব?
প্রধান সম্মেলনের পাশাপাশি ছিল বিশাল এ আই ইম্প্যাক্ট এক্সপো—স্টার্টআপদের উদ্ভাবন প্রদর্শনের মঞ্চ। বাংলা, তামিল, মারাঠি-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতীয় ভাষাভিত্তিক মডেল, কৃষি-ডায়াগনস্টিক টুল, স্বাস্থ্য-স্ক্রিনিং অ্যাপ—দেশীয় উদ্ভাবন নজর কাড়ে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের।
বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি স্পষ্ট ইঙ্গিত --- এ আই-এর অর্থনীতি অনতিবিলম্বে কেবল সিলিকন ভ্যালিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না ; নয়াদিল্লিও চাইছে সেই মানচিত্রে স্থায়ী স্থান।
কূটনৈতিক মহলের মতে, এই সম্মেলন ভারতের সফট পাওয়ারের নতুন পর্ব। যেমন অতীতে জলবায়ু বা স্বাস্থ্য কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল দেশ, তেমনই এখন এ আই-এর নীতি নির্ধারণেও প্রভাব বিস্তারের প্রয়াস নিতে চলেছে দেশ।
সরকারি সূত্রের দাবি, উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থ রক্ষায় ভারত ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে চায়—যাতে এ আই প্রযুক্তি কেবল ধনী দেশের হাতে সীমাবদ্ধ না থাকে।
তবে সবটাই মসৃণ ছিল না। নিরাপত্তা ও প্রবেশ ব্যবস্থাপনায় কিছু অসন্তোষ, সেশনসূচিতে দেরি—অংশগ্রহণকারীদের একাংশের অভিযোগ। আরও বড়ো প্রশ্ন— এ আই-এর দ্রুত বিস্তার কর্মসংস্থানে কী প্রভাব ফেলবে? অটোমেশন কি নতুন দক্ষতার সুযোগ তৈরি করবে, না পুরনো পেশাগুলিকে ক্রমশ বিলুপ্ত করবে ? এই দ্বন্দ্বও বারবার উঠে এসেছে বিভিন্ন আলোচনায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ আই-এর ক্ষেত্রে ভারতের তিনটি বড়ো চ্যালেঞ্জ হল ১. ডেটা পরিকাঠামো ও সুরক্ষা আইন শক্ত করা, ২. স্থানীয় ভাষাভিত্তিক মডেল উন্নয়ন, এবং ৩. দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষা ব্যবস্থার বদল। সম্মেলনের মঞ্চে উচ্চারিত আশাবাদ বাস্তব রূপ পাবে কি না, তা নির্ভর করবে এই তিন দিকের অগ্রগতির উপর।
এই ২০২৬-এ এসে এটা তো ঘটনা যে, এ আই আর কেবল প্রযুক্তির বিষয় নয় ; এটি অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজের রূপান্তরের প্রশ্ন। তামাম বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত, তখন ভারত নিজেদের অবস্থান জানান দিল—বুঝিয়ে দিল ব্যবহারকারী নয়, অংশীদার ও নীতিনির্ধারক হিসেবেই থাকতে চায়।
প্রযুক্তির এই নবযুগে প্রশ্ন একটাই—দিল্লির এই ঘোষণাগুলি কি আগামী দিনের ডিজিটাল ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ ফেলবে, না কেবল সম্মেলন-স্মারকেই সীমাবদ্ধ থাকবে? সময়ই তার জবাব দেবে।