তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
হিটিং, ব্যাটিং, ম্যাসাকার

এবং চোখ বুজে যদি রবিবাসরীয় রাতে মোতেরায় অনুষ্ঠিত টি ২০ বিশ্বকাপের ফাইনাল জেতার রসায়নে শিরোনামে উল্লিখিত তিনটি শব্দকে পরপর বসিয়ে নেন, তাহলেই নিউজিল্যান্ডের হারার ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। এবারের প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আগের থেকেই বলা হচ্ছিল, ‘অব কি বার, তিনশো পার।’ যেভাবে অভিষেক শর্মা এবং ঈশান শর্মা জুটি দ্রুত লয়ে রান তুলছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল, ছক্কাবৃষ্টি ঘটবে গোটা প্রতিযোগিতা জুড়ে। কিন্তু তিনশো পার করতে পারেননি ভারতীয় ব্যাটাররা। ফাইনালেও তেমন একটা সম্ভাবনা ছিল। শেষ পর্যন্ত ২৫৫ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল ভারত। ১০০–র বেশি ছয় পাওয়া গেছে শুধুমাত্র ভারতীয় ব্যাটারদের থেকে। আর তাতেই নিউজিল্যান্ডের মতো ওজনদার দলকে হারতে হয়েছে ৯৬ রানে। কিউয়ি অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার একদিন আগে বলেছিলেন, ‘এমন ক্রিকেট খেলব যে গোটা স্টেডিয়ামকে চুপ করিয়ে দেব।’ ভয়ে ভয়ে ছিলাম। যেভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে সেমিফাইনালে হারিয়ে, ফাইনালে পৌঁছেছিল নিউজিল্যান্ড, তাতে এক লক্ষ কুড়ি হাজারের মোতেরা স্টেডিয়ামকে চুপ করিয়ে দেওয়ার বারুদ তো ছিলই। কিন্তু ঘটল ঠিক উল্টোটা। গোটা স্টেডিয়ামকে চুপ করাতে গিয়ে নিজেরাই নির্বাক হয়ে গেলেন। অনুরোধ করছি, আর একবার শিরোনামের তিনটি শব্দে চোখ বোলাতে। ভারতীয়দের প্রবল পিটুনির ফলে ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল নিউজিল্যান্ড শিবির।
এবং একপেশে জয়। ফাইনাল ঠিক জমেনি। তার চেয়ে অনেক বেশি উত্তেজনা ছিল জিম্বাবোয়ের সঙ্গে খেলার সময়। ব্রায়ান বেনেট ৯৭ রানে অপরাজিত থেকে ভারতীয় বোলিংকে যেভাবে নাস্তানাবুদ করেছিলেন, সেটা দেখে মনে হয়েছিল আগামী কয়েক বছরে জিম্বাবোয়ের এই তারকা কিন্তু সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন। যেমন এখন চোখ ধাঁধানো ব্যাটিং করে যাচ্ছেন ইংরেজ সেনাপতি হ্যারি ব্রুক। ইয়ান চ্যাপেল, গ্রেগ চ্যাপেলরা হ্যারি ব্রুককে শচীন তেন্ডুলকারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। জিওফ্রে বয়কট তাঁর খেলায় ব্রায়ান লারার ছায়া দেখতে পান। তেমনি আমাদের সঞ্জু স্যামসন এবং ঈশান কিষাণ একেবারে নিজস্ব ঘরানায় বড়ো বড়ো ইনিংস খেললেন।

দুটো কাহিনিই কিন্তু এক। প্রতিভাবান হয়েও হারিয়ে যাচ্ছিলেন। দু’জনেই নিজেদের সঙ্গে কথা বলে আত্মস্থ হওয়ার চেষ্টা করতে করতেই পেয়ে গেলেন হারানো ছন্দ। তা–ও ঠিক বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগের মুহূর্তে। এবং তাতেই কিস্তিমাত। হঠাৎ নড়বড়ে হয়ে যাওয়া ভারতীয় ব্যাটিংকে যখন এলোমেলো মনে হচ্ছিল, তখন সঞ্জু ও ঈশানের হাত ধরে ভারতীয় দলের চাকা গড়াতে শুরু করেছিল। প্রবল গতিতে। গড়গড় করে। এবং এই গতির সঙ্গে কখনও অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব, কখনওবা শিবম দুবে, অক্ষর প্যাটেল–রা সঞ্জু–ঈশানের তৈরি করা মঞ্চে ব্যাট করতে এসে বিপক্ষ বোলারদের নাস্তানাবুদ করার দিকে মন দিতে পেরেছিলেন। টলমল করতে থাকা ভারতীয় দলের পরিত্রাতা হিসেবে একেকটি ম্যাচে, একেকজন ক্রিকেটার জ্বলে উঠে ভারতকে জয়ের মঞ্চে নিয়ে গেলেন।
দল হিসেবে কি নিউজিল্যান্ড দুর্বল ছিল ? মোটেই না। অক্ষর প্যাটেল যেভাবে ভয়ঙ্কর ফর্মে থাকা অ্যালেনকে ফিরিয়ে দিলেন, বা খুব খারাপ ছন্দে থাকা বরুণ চক্রবর্তী সাইফার্টের মতো ওপেনারকে ফিরিয়ে দিলেন, তারপর ২৫৬ রান তাড়া করে জেতার মতো ব্যাটার কিউয়ি শিবিরে ছিল না। বুমরা পেলেন ফাইনালে ৪ উইকেট। সব মিলিয়ে এবার টি ২০ প্রতিযোগিতায় এল ১৪ উইকেট। বড়ো ম্যাচের উপযুক্ত বোলার। পেস বোলিংয়ের এখনকার রাজা। গতি না বাড়িয়ে, স্লোয়ার ডেলিভারির দিকে নজর দিতেই নিউজিল্যান্ড মুখ থুবড়ে পড়ল। মাথার ওপরে নিকষ কালো অন্ধকার। আর নীচে, মাঠে তখন সূর্যকুমার যাদবের আলোয় আলোকিত। ম্যাচের সেরা পুরস্কার পেলেন বুমরা। আর সব ম্যাচ না খেলেও, শুরুর দিকে উপেক্ষিত থাকা সঞ্জু স্যামসন ৩২১ রান করে ছিনিয়ে নিলেন প্রতিযোগিতার সেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার।


ব্যাটিং–ঝড়ে প্রথমে উড়ে গিয়েছিল নিউজিল্যান্ড। শেষ পর্যন্ত কিউয়ি পাখি আর উড়তে পারল না। এমন করতে দেখেছি আগেও। পরপর দু’বার বিশ্বকাপ জেতা ভারতীয় দলের জয়ের প্রহরের সময় ভাবার চেষ্টা করছিলাম, ফাইনাল হেরে গেলে ভারত জুড়ে কতটা হতাশার ঢেউ আছড়ে পড়ত। নিউজিল্যান্ডে কিন্তু, এমন হারের পরও কেউ কোনো সমালোচনা করবে না। প্রাক্তন ক্রিকেটাররা তো নয়ই। প্রচারমাধ্যম যদি খোঁচাতে চায়, তাহলে যে উত্তর পাবেন, সেটাও কিন্তু এক চমৎকার মানসিকতার প্রতিফলন : বড়ো দলের কাছে হেরেছি, ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছোনোটাও কি একটা প্রাপ্তি নয় ? যখন চারদিকে পেশাদার ধুরন্ধর মস্তিষ্কের গুঁতোগুঁতি, সেখানে নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটারদের খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এটাই কিন্তু নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের সংস্কৃতি। যা বছরের পর বছর একই রকম থেকে গেছে। এমন অদ্ভুত মানসিকতার ক্রিকেটারদের ঢেউ আছড়ে পড়ছে ক্রিকেটের দুনিয়ায়। প্রবল লড়াকু হয়েও মিচেল স্যান্টনাররা কিন্তু আধুনিক ক্রিকেটারদের মানসিকতাকে অনুকরণ করার চেষ্টা করেননি। এ জন্যই ওঁরা থেকে যান ট্র‌্যাজিক নায়ক হিসেবে। পরাজয়কে যাঁরা এভাবে মেনে নিতে পারেন, তাঁরা যে অন্য ধাতুতে গড়া, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।


Scroll to Top