
দাদা নমষ্কার৷ সুপ্রভাত৷ আমি সমুন্ত্র৷
হ্যাঁ সুপ্রভাত৷ ফোন সুমন্ত্র?
ভাবছিলাম…চিনতে পারবেন না৷ অনেকদিন যোগাযোগ নেই তো! তাই বলেই শুরু করলাম৷
আমি কি আগে আপনাকে চিনতাম?
তা কিছুটা চেনাজানা ছিল বৈকি! দেখতে-দেখতে তাও বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল৷
কোন সময়টা বলুন তো?
সেটা আপনি আমাদের এলাকার কাউন্সিলর হওয়ার আগে থাকতেই৷
তাহলে বছর তিনেক তো বটেই৷
তা তো হবেই৷ তারপর তো আপনি এখন আবার মেয়র পারিষদও বটে৷
হ্যাঁ... তা…ঠিকই৷
আচ্ছা দাদা… যদি অনুমতি দেন এবং যদি আপনার একটু সময় থাকে…একটা কথা জিজ্ঞাস করব?
হ্যাঁ…হ্যাঁ করুন৷ এলাকার মানুষদের কথার উত্তর দেওয়াটা আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে৷
আ-আমি অবশ্য ঠিক আপনার এলাকার মধ্যে পড়ি না…৷
তাহলেও কলকাতার লোক তো? কোন এলাকা?
কলকাতাই৷ তবে নর্থ-এর দিক পড়ে যাচ্ছে আমাদের…মহাজাতি সদনের উত্তরে…সুতবার…৷
ঠিক আছে৷ পারিষদ হিসাবে আমি সেন্ট্রাল কলকাতাটা কভার করি৷ তাহলেও ইটস্ ওকে৷ কথাটা কি?
কথা মানে…এটা আসলে একটা প্রশ্ন৷ করব?
হ্যাঁ করুন না৷ অসুবিধে কী!
ন্-না-মানে এই পারিষদ ব্যাপারটা কী? আপনি তো চৌরঙ্গীর কাউন্সিলর ও৷ তাই না?
ওহ্-হো-হো৷ হ্যাঁ তা তো বটেই৷ আসলে আমাদের বস্, মানে কলকাতার মেয়র, কাউন্সিলরদের মধ্যে থেকেই কয়েকজনকে নির্বাচন করেন…যাঁরা এক একটা সেকটরে কিছু কিছু বিষয়ের দিকে নজর দেন ও রাখেন৷
আচ্ছা আচ্ছা…বুঝলাম৷ আপনার সেকটর হচ্ছে মধ্য কলকাতা৷
ঠিকই বুঝেছেন৷
তো কিছু কিছু বিষয় বলতে কী বোঝায় দাদা?
যেমন শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সংস্কৃতি…স্কুল ইন্সপেকশন, ট্রান্সপোর্ট…এরকমই..৷
তো আপনি…মানে…কোনদিকটা…..!
আমি কালচারাল দিকটা দেখি মেয়র পারিষদ হিসাবে…৷
ঠিক, ঠিক৷ সেটা আমারই তো বুঝে নেওয়া উচিত ছিল৷ আপনি তো কালচারেরই লোক৷
হ্যাঁ ছিলাম তো বটেই! একসময় নাটক-ই ছিল আমার জীবন৷
একসময় বলছেন কেন? এখনও কি নেই?
আরে ভাই...কী আর বলব! থাকলেও কি আর নিজে ইনভলভড হতে পারি! এতো কাজ…দায়িত্ব৷
আমরা তো আছি৷ আপনি ইনভলভড হতে চাইলে…কেন পারবেন না!
সেন্ট্রাল ক্যালকাটার প্রতিনিধি তো, অন্য কালচারাল দায়িত্ব অনেক যে! তবু ইনভলভড হতে তো চাই-ই৷ ছিলামও৷
তা তো হবেই৷ আপনি কি সংস্কৃতির সবদিক-ই দেখাশুনা করেন?
সবদিক বলতে…থিয়েটার সিনেমা..গানবাজনা..যাত্রা..৷ দল-গুলোর মেনটেন্যান্স্, দেখাশুনা, তাদের বুকিং সিস্টেম… অফিস-বিল্ডিং-সিকিউরিট, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা…টিকিট বিক্রি, স্টাফের মাইনে…সবই কর্পোরেশন দেখে৷
ঠিকই তো…সেন্ট্রাল ক্যালকাটাতে তো অনেকগুলোই রয়েছে…৷ হল্ গুলোর দায়িত্ব…৷
নিশ্চয়ই৷ রবীন্দ্রসদন, একাডেমি অব ফাইন আর্টস, শিশিরমঞ্চ থেকে শুরু ক’রে…বাংলা একাডেমি, নন্দন, জীবনানন্দ সভা-ঘর…শুধু ওই এরিয়ার মধ্যে তো কতগুলো…৷ তাছাড়া আর্টগ্যালরি, লোকাল দোকানপাট…৷
আর ওদিকেই তো ডিমান্ড সব থেকে বেশি…৷ আমাদের অধিকাংশ নাটক-ও তো…৷
অবস্থা তাইতো… তখন থেকে কথা বলে যাচ্ছি…আপনার পরিচয় তো ঠিকমতো পেলাম না এখনও৷
ওই যে বললাম, আমি সুমন্ত্র৷ সুমন্ত্র মিত্র৷
সুমন্ত্র মিত্র! উত্তর দক্ষিণ নাট্যগোষ্টি?
যাক্…এতোক্ষণে তাহলে মনে পড়েছে! হা-হা-হা৷ ইচ্ছে করেই আপনি-আনন্দ করছিলাম ভাই৷
আর কী আশ্চর্য…সুমন্ত্র মিত্র…সুমন্ত্রদা…আপনাকে চিনব না?
আসলে তুমি এখন অনেক উঁচু লেভেলের মানুষ…৷ পারিষদ মানে প্রায় মন্ত্রীই আমাদের কাছে...৷ সত্যব্রত ঘোষকে হঠাৎ এতোদিন পরে…আমি কি নাম ধরে সম্বোধন করতে পারি!
কী আশ্চর্য, তাই বলে, দাদা আর আপনি?
ভাবলাম…টু স্টার্ট উইথ্, একটু ডিস্ট্যান্স্ রেখেই যোগাযোগটা করি৷
যাক ভাল লাগল সুমন্ত্রদা যোগাযোগ করলেন বলে৷ আপনার মতো লোককেই আমার দরকার৷
আমারও ভাল লাগছে সত্য, তুমি আমাকে রেকপনাইন করেছো বলে৷
কী যে বলেন! কলকাতার নাট্যমহলে সুমন্ত্র মিত্রকে কে না চেনে! কয়দিন আছেন এ লাইনে?
তাহলেও…অন্য পাঁচজনের সঙ্গে তোমার চেনার অনেক তফাৎ আছে ভাই৷
সেটা দাদা..কিছুটা আমার রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য৷ মানে… এখানকার রাজনৈতিক পরিচিতি৷
শুধু তাই বা কেন…সেন্ট্রাল ক্যালকাটার মেয়র পারিষদ তুমি৷ আমাদের সকলেরই তো তোমাকে চাই৷
সুমন্ত্রদা, সব নাট্যগোষ্টি, নাট্যকর্মী, অভিনেতারা চায় কিনা জানি না৷ কিন্তু আপনি চাইলে আমি আছি৷
এই কথাটা শুনে বড় আনন্দ আর ভরসা পেলাম সত্য৷ তুমি এখন অন্য রাজনৈতিক দলে চলে গেলেও…৷
আহা তাইতো কী হয়েছে দাদা! একসময় তো আমরা সকলেই বামপন্থী ছিলাম তো!
হ্যাঁ সে আর বলতে! মনে প্রাণে আমরা সবাই বামপন্থী ছিলাম৷
ছিলাম বলছেন কেন সুমন্ত্রদা! আপনি এখনও আছেন৷
আমি…যাকে…ওই আর কি! চৌত্রিশ বছর ক্ষমতায় থাকার সময়…সংস্কৃতি দপ্তরে বিশ্বস্ত অফিসার হিসেবেই ছিলাম কি না! কিন্তু এখন মন উঠে গেছে৷
আসলে কী জানেন দাদা, আমি কিন্তু বাম জমানার শেষের দিক থেকেই বুঝেছিলাম, এদের ঘট ওল্টানোর আর দেরি নেই৷ বোঝা মাত্র দল পালটানর চেষ্টা…চালিয়েছিলাম৷
তুমি ঠিকই বুঝেছিলে সত্য৷ তোমার মাথাটি সরেশ৷
সেইজন্য আমি আর দেরি করি নি৷ দল যদি ক্ষমতাতেই না-থাকে, তাকে আঁকড়ে ধরে আর কী লাভ? নাকি বলুন!
ঠিক, ঠিক, ঠিক৷ রাজনীতি কপচে তো আর জীবন কাটবে না৷ যেদিকে ক্ষমতা, মালও সেইদিকে…৷
আর দিদির তৃণপার্টিও তখন বেশ পপুলার হয়ে উঠেছিল৷ সুতরাং ওদের তোল্লাই দিয়ে ছ-একটা নাটক নামালাম…৷
আপনি তো সবই জানেন৷
হ্যাঁ হ্যাঁ জানি বইকি ভাই৷ পাবলিক খেয়েছিল তোমার নাটক৷
আপনাদের আসলে সেই সময়ই বেরিয়ে আসা উচিত ছিল৷
আরে ইচ্ছে তো ছিলই৷ কিন্তু তখনও যে চাকরি করছিলাম! পার্টির সঙ্গে লাইন করে না-থাকলে তখন কি আর টিকতে পারতাম! কলকাতার বাইরে কোথায় পোস্টিং করে দিত…৷ সারা জীবন তো লাইন করেই…মানে…বুঝলে না!
বুঝি সুমন্ত্রদা, সবই বুঝি…৷ ওকে একটু ঝুঁকি নেওয়ার দরকার ছিল তখন৷
দু-একবার মাথায় এসেছিল৷ ভেবেছিলাম দিদিপার্টিতে ভিড়ে যাই…৷ একটু চক্ষু লজ্জার জন্যই…৷
তখন ভিড়ে গেলে…আজ আপনি বিভূষণ-টিভূষণ খেতাব খেয়ে যেতেন৷ অবশ্য পরেও যেতে পারেন৷
সে তো বুঝতেই পারছি৷ লেবেলে যেসব নাটকের লোক আজ ছড়ি ঘোরাচ্ছে…৷
আপনি সাহস করলে, আপনিও ফেরাতেন, কিন্তু ওই, “পেটে খিদে, মুখে লাজ” করতে গিয়েই, আজ আপনাদের এর-ওর দুয়ারে ঘুরতে হতো৷ তবে আপনি তো বুদ্ধিমান এবং পাকা পুরনো লোক৷ নাট্যজগতে পরিচিত৷ তো সে খাকতো৷ তুমি তো আছোই ভাই৷ আজ রং বদল করলেও, এককালে একসঙ্গেই ছিলাম তো৷ আবার মিশে যাব৷
আমি আপনার জন্য আছি সুমন্ত্রদা৷…দেখুন আমি সেই গোড়ার দিক থেকে দুকান কাটার মতো পাটিফার্টি ছেড়ে এদের সঙ্গে ভিড়ে গিয়েছিলাম৷
বটেই তো৷ বামপন্থা ধুয়ে কি সারাজীবন জল খাবে!
কিছুদিন গালমন্দ খেয়েছি ঠিকই৷ তারপর আর কী! হাতে ক্ষমতা থাকলে, সুমন্ত্রদা, সবাই সেলাম ঠোকে৷
তাইতো…আবার কী! এখন আর কোথায় সেই সিপিএম পার্টি! একদিন রমরমা ছিল, আজ ভিখারি৷
তবে একদিক থেকে ভাল যে, আপনারা তখন যা যা করার, ভালই গুছিয়ে নিয়েছিলাম৷ মালও কামিয়েছেন৷ কাজও করেছি ভাই… অনেককে টেনে তুলেছি সেইসময়৷
তা তো করতেই হবে দাদা৷ কেননা ওরিজিনালি আপনারা তো ছিলেন কংগ্রেস বাড়ির লোক! সেদিক থেকেও প্রথমদিকে ভালো গুছিয়ে নিয়েছিলেন৷ তারপর সময়সঙ্গেই বামফ্রন্টে ঢুকেছিলেন৷ ম্যানেজ করেছেন ভালই সবদিক থেকে৷
আসলে কী জানো ভাই সম্য…আমি তো প্রথম জীবন থেকেই বাচিক শিল্পী আর অভিনেতা হিসাবে উঠেছি…৷
নিশ্চয়ই দাদা, নিশ্চয়ই৷ আপনি ভাল নাটক, বাচিক শিল্প না বুঝলে কি আর স্কুল চালাতে পারতেন? এখনও তো শুনি ভালই চলছে আপনার স্কুল৷ ছাত্রছাত্রীও অনেক৷ এটা ভাল লাইন ধরেছেন৷
তা আছে মোটামুটি খারাপ না৷ কিছু সরকারি অনুদান পেলে, স্কুলটা আরও বড় করে…যাবে…৷
সেটা করাই যেত৷ কিন্তু বোঝেন তো, আমাদের এই তৃণপার্টি নিজেদের লোক ছাড়া কাউকেই মাল দিতে চায় না৷ ওদিকে আপনার গায়ে তো পুরনো দিনের বামপন্থী ছাপ লেকে রয়েছে…৷
আরে সে সব তো কবেকার কথা! এখন আর বামপন্থী সিপি এম বলে কিছু আছে? সবাই তৃণ৷
তাহলেও সুমন্ত্রদা, আপিনিই আমাদেরই লোক, এরকম একটা হাওয়া যদি প্রচার করা যায়…৷
হ্যাঁ হ্যাঁ, তাইতে আর আপত্তির কী? মনে মনে তো হয়েই আছি৷
ঠিক আছে, আমি দেখছি৷ বছর দশেকের মধ্যে আমারও তো একটা ভূমিকা তৈরি হয়েছে…৷ কতজন যে তেল দেয়!
তোমার ভূমিকা এই সরকারের কাছে যথেষ্টই গুরুত্বপূর্ণ সত্য৷ তুমি চাইলে অনেক কিছু করতে পারো৷
আপনাকেও লাইনে ঢুঁকিয়ে নেওয়া একটা পথ বার করছি আমি৷ হল, মঞ্চ… এগুলো তো হাতে আছে৷
করো ভাই, করো৷ সরকারি অনুদান, কিংবা কোনো একটা পদ…ইত্যাদি পাওয়ার জন্য যদি কোথাও, কারুর কাছে যেতে হয় বোলো, আমি না-হয় গিয়ে দেখা করব৷ কিছু দেওয়া-থোওয়ার দরকার হলেও…মানে…৷
আমার যতটা করার, করছি সুমন্ত্রদা৷ আর আপনিও নাটক-ফাটকে আমাকে মাঝেমধ্যে এ্যাপিয়ার করানর জন্য…বোঝেনই তো.. উদ্বোধন, সমবর্ধনা, মাল্যদান…এসবে আছি৷
আরে ওসবের জন্য তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না৷ তোমাকে পেলে আমরাই গর্বিত বোধ করব৷ বাইরের শো কিংবা এদিক ওদিক যাওয়ার ব্যাপার থাকলে…একটু দেখো…৷ ঘোরা, বেড়ানো তোমার সঙ্গে…৷ শো করাও যাবে৷
আপনি নিশ্চিত থাকুন…৷ একদিন জমিয়ে বসতে হবে সুমন্ত্রদা৷
আরে একদিন কেন! এখন থেকে মাঝেমধ্যেই বসা হবে৷ কবে আসবে বলো, তোমার বউদিকে বলব৷
আগে আমার বাড়িতেই একদিন বউদিকে নিয়ে আসুন… ভাল স্টক রয়েছে…৷ অনেক গিফ্ট আসে তো…৷ কচ্৷
হা-হা-হা…তা তো আসবেই ভাই…তুমি মেয়র পারিষদ বলে কথা…!
তার থেকে বড় কথা দাদা, আমরা সবাই বাংলা সংস্কৃতি জগতের লোক, তাই না?
নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই৷ বিশেষ করে থিয়েটার, বাচিক শিল্প, স্টেজ পারফরমেন্স্…৷ তুমিও তো এই জগতেরই লোক ছিলে৷
আজ রাজনৈতিক নেতা এবং ব্যক্তিত্ব হলেও, এক কালে নাটক তো কম করো নি৷
এখনও তাই করতে চাই৷ কিন্তু বুঝতে তো পারছেন, দেশের কাজ করার উন্মাদনার জন্যই…পারি না৷ আপনি আমায় দলে রাখুন৷ আমি আপনার দলকে দেখব, কথা দিলাম…৷ শিগগীর দেখা হবে একদিন৷
হ্যাঁ ভাই সত্য৷ সামনাসামনি বসে কথা হবে৷ মনটা খুব ঝরঝরে লাগছে আজ…৷
চিয়ার্স…সুমন্ত্রদা…চিয়ারস্…৷
হ্যাঁ সত্য…চিয়ারস…৷ আরে তুমি তো আজ ফাটিয়ে দিয়েছো!ওই রোলটায় তোমাকে মানিয়েছিল খুব ভাল৷
সবই আপনার কৃতিত্ব দাদা৷ আপনি এনকারেজ করলেন বলেই তো রাজনৈতিক দায়িত্ব সামলেও আবার মঞ্চে ফেরাতো নয়তো এবার মন্ত্রী হয়ে আরও ফেঁসে গেছি না!
না না, ফেঁসে গ্যাছো কোথায়? তুমি মন্ত্রী হয়েছো বলেই, আমাদের উত্তর-দক্ষিণ-এরও আজ কত নাম! সেই যে তোমায় ফোন করেছিলাম…তাও তো প্রায় দু বছর হয়ে গেল৷
হ্যাঁ তাই হবে৷ কেননা আমি তখন মেয়র পারিষদ ছিলাম৷
ঠিক, ঠিক৷ তখনও অবশ্য তোমার যথেষ্ট দাপট ছিল৷
তা খানিকটা ছিল…৷ তবে কালচারাল এ্যাফেয়ারস্-এর মন্ত্রী হওয়া মানে…বুঝতেই তো পারছেন৷
থাক, থাক সে আর তুমি কি বলবে ভায়া! আমরা একটা সামান্য নাটকের গ্রুপ হয়েই…তোমার প্রসাদ পেয়ে আজ বুঝি…কোথায় ছিলাম আর কোথায় পৌঁছেছি৷
আমি আর কতটুকু করতে পেরেছি সুমন্ত্রদা! আপনাদের গুন আর নিষ্ঠার জন্যই এতোটা উঠেছেন৷
তা বললে তো হবে না সত্য৷ এই যে রিহার্সালের জন্য নিজেদের একটা সুন্দর জায়গা, প্রয়োজন হলেই ট্রান্সপোর্টের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা, রুমে ফার্নিচার-ইলেকট্রিসিটি, এসির ব্যবস্থা…তিনটি স্টাফ মেনটেন করা…, সব তুমি ছাড়া হতো!
আমি মন্ত্রী হলেও, থিয়েটারের লোক৷ তাই বুঝি, এসব ফেসিলিটিজ না-থাকলে কি গ্রুপ থিয়েটার বাঁচে!
যা বলেছেন…৷ আমার পার্টি আর রাজনীতি ধরে বসে থাকলে কি আর এসব হতো?
কি করে হবে বলুন! হাতে টুসকি মেরে মালটা আসবে কোত্থেকে৷ হা-হা-হা৷ সাধে কি আর তৃণপার্টি করছি!
শুধু কি বাইরের খরচ! এই চিয়ারস্ করার মালটাই বা আসতো কোত্থেকে তুমি মন্ত্রী না-হলে?
কালচার করতে গেলে এটা লাগে সুমন্ত্রদা৷ পেটে মাল না পড়লে…কিসের শিল্পী! কে শিল্পী!
একশবার! আগেও খেতাম না তা নয়…৷ তবে তোমার জন্য এখন স্কচেই অভ্যস্থ হয়ে উঠেছি ভাই৷ স্টান্ডার্ড বেড়েছে৷
অফকোর্স! আজকে তো আর স্কচের অভাব নেই৷ একদিন পার্টি বদল করে এদিকে চলে এসেছিলাম৷ তারপর নেহাত কম পরিশ্রম করি নি৷ তার সঙ্গে ধান্দা-লাইনও করতে হয়েছে বৈকি! এসব তো নিয়মের মধ্যেই পড়ে৷
আচ্ছা…বাই দ্য ওয়ে, সত্য, তোমার কি মনে হয় আমিও পুরোপুরি দিদি পার্টিতে ঢুকে পড়ব?
কেন ভাবছেন সে কথা?
না-না…বামপন্থী পরিচয়ে থেকে গেছি...অথচ গ্রুপ থিয়েটারের মধ্যে আমাদের এই রমরমা…৷
তাইতে কী অসুবিধে সুমন্ত্রদা! আপনার দলের রমরমা তো হবেই৷ নাটক চলছে, মাল কামাচ্ছেন৷
কিন্তু…এই আর কী…অন্য সব গ্রুপ থিয়েটারের যে খুব চোখ টাটাচ্ছে! তারা তো ধুঁকছে৷
টাটাতে দিন না৷ আমি তো আছি৷ পশ্চিমবঙ্গ থেকে আমাদের হটানো এখন কারুর পক্ষে সম্ভব নয়৷
সেটা অবশ্য আমরাও জানি৷ দশ বছর হয়ে গেছে…আরও দশ বছর তো হেসে খেলেই রাজত্ব থাকবে৷ ব্যাস, তাহলে আর সমস্যা কী বলুন! বরং আপনার বামপন্থী ছাপটাই এক্ষেত্রে ঠিক আছে৷ ওটা রেখে দিন৷…
তা বলছো কেন?
বুঝলেন না! অন্য পার্টির মন্ত্রী হয়েও আমি বামপন্থীদেরও সাপোর্ট দিই এটা প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে৷
হা-হা-হা…তা যা বলেছো! একদিন তুমিও তো লাল-ই ছিলে৷ কিন্তু রঙে কি যায় আসে! মিক্সচারটাই ভাল৷
আসলে তলে-তলে আমাদের কি আন্ডারস্ট্যান্ডিং, তা ওনার কে দেখতে যাচ্ছে! আপনার জন্য আমি আছি, আপনিও আমার জন্য আছেন৷ পার্টি, রং গুলি মারুন৷ যেখান থেকে মাল আসবে, সেখানেই…কী বলেন!
সে তো একশ নয়, হাজারবার৷ তুমি না-থাকলে, এতে বিজ্ঞাপন, সরকারি অনুদান, যে কোনো সময়ে যে কোনো হল পাওয়া…এতো টিকিট বিক্রি…কোনোটই তো হতো না৷ তোমাকে আর কত পার্সেন্ট-ই বা দিই? ওসব ছাড়ুন সুমন্ত্রদা মন্ত্রী হয়েও আপনার গ্রুপে আছি, নাটকও করছি, স্টেজে এ্যাপিয়ার করছি…এসব তো আমারও প্রাপ্তি৷
তবে…এবার কিন্তু কল-শো গুলোর বিষয় মনে রেখো সত্য৷ বাইরে থেকে হবে তো! মজা তো বাইরে গেলেই৷
সব আমার মাথায় আছে দাদা৷ শুধু কলশো করলে তো হবে না! শো করতে যাওয়া উপলক্ষে, ভাল জায়গায় ঘুরে আসা, টপ ক্লাস জায়গায় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা…ফূর্তিফার্তা…নাকি!
হ্যা-হ্যা-হ্যা…সে আর বলতে! মন্ত্রী যাবে নাটক করতে, ব্যবস্থা তো করতেই হবে৷ ম-কারান্ত যা কিছু-হ্যা হ্যা৷
কী বলুন তো! খবর পেলেই তো লোকাল নেতা থেকে শুরু করে বিজনেস ম্যান, প্রোমোটার, লাইনবাজ-ধান্দাবাজ, শিল্পী-গায়কগায়িকা-অভিনেতা অভিনেত্রী…সবাই আসবে৷ কিন্তু শুধু কথায় তো চিঁড়ে ভিজবে না! কী বলেন! সবই হচ্ছে, গিফ এ্যান্ড টেক পলিসি৷ তোমরা আমাদের দ্যাখো, আমিও তোমাদের দেখব৷
নিশ্চয়ই! সম্পর্কের গোড়ার কথাই তো তাই…হ্যা হ্যা হ্যা…ঢালো দেখি আর একটা…৷
একটা কেন দাদা! আজ বউদি সঙ্গে নেই বলে তাড়া?
ওপরে নাহ্…তিনি কি আর আমার ভরসায় বসে থাকার মহিলা! তাঁর জন্য এনগেজমেন্ট থাকে৷
তা তো বটেই তবে আপনার দলের জন্য তিনিও…একদিন তো যথেষ্ট করেছেন৷ আজ না-হয় দাঁড়িয়ে উঠেছেন আপনি৷
করতে তো হবেই৷ তবে পেছন থেকে তোমার এই মদত না পেলে, আজও আমরা সেই তিমিরেই থাকতাম৷ আজও অন্যান্য সব থিয়েটারের দল কোথায় পড়ে আছে!
কী বলব দাদা…তারা নাকি সব আর্ট করছে…থিয়েটারের মধ্যে দিয়ে মানুষকে সচেতন করছে৷ যত সব৷
ওসব ঢপ আর দর্শক যায় না এখন, বুঝলে! বাঙালি দর্শক এন্টারটেনমেন্ট্ চায়…৷ কিন্তু আর্টের মোড়কে৷
এই হল না কথা! এন্টারটেইনমেন্ট…বিনোদন…৷ নিন বটম আপ করুন৷
আসলে কী জানো সত্য, আমাদের এখানে এন্টারটেনমেন্ট্ ব্যাপারটাও একটু কালচারের মধ্যে দিয়ে করতে হয়…মাঝে ট্যাকটফুলি৷ অর্থাৎ বিনোদন আর আট দুটোকে সঠিক পাঞ্চ্ করলেই…কেল্লাফতে…যা আমরা করছি৷
একেবারে হক্ কথা বলেছেন দাদা৷ আপনি চালিয়ে যান…আমি যদ্দিন পজিশনে আছি…৷
আরে ভাই যদ্দিন আছি, বলছো কেন! তোমাদের দল ছাড়া এখন আর বিকল্প কোথায়?
মানে…ঠিকই আছে দাদা…৷ তবে ওই আর কি…এতোরকম লোক সব ঢুকে পড়েছে…সবায়েরই ধান্দা মেরে খাওয়ার৷
সে তো হবেই ভায়া৷ আমাদের বামফ্রন্টেও কি তেমন লোকের অভাব ছিল? শেষের দিকে সবই তো প্রায় জালিমাল৷
যা বলেছেন! আর সেই লোকগুলোই তো এখন আবার আমাদের সরকারে ভিড়েছে…৷ সরাসরি না-হলেও, ব্যাকডোর দিয়ে লাইনবাজী করছে৷ না-না আপনাকে তা বলে মিন করছি ভাববেন না৷
আরে না-না তা ভাবব কেন? দেখি ঢালো আর একটা৷ আসলে তুমিও তো একদিন ঝোপ বুঝেই কোপ মেরেছিলে৷ তাই কি না বলে! তারপর আজ কোথা থেকে কোথায় উঠে এসেছ!
হ্যা-হ্যা-হ্যা…আপনি তো সবই জানেন দাদা…৷ তবে ওই আর কি… মাঝে মাঝে টেনশন হয়…৷
ছাড়ো তো টেনশন! আমরা কালচারের লোক…বুইলে! জল যেদিকে গড়াবে, সেদিকেই…হ্যা হ্যা হ্যা…৷ নাও চিয়ার্স!
চিয়ারস্ দাদা চিয়ারস্…উল্লাস-উল্লাস…৷ এই মালটি বেশ জব্বর…৷ চিয়ারস্…৷