তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
বিশ্ব জুড়ে সংবাদমাধ্যমের পায়ে শিকল, সত্যের বুকে শেষ পেরেক

বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা আজ এক ভয়াবহ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সের পরিসংখ্যান যেন কেবল সংখ্যা নয়, গণতন্ত্রের ক্ষয়ে যাওয়া শ্বাসের শব্দ। গত ২৫ বছরে পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি দেশে সাংবাদিকতা আজ হয় আতঙ্কের, নয়তো আনুগত্যের পেশা। সত্য উচ্চারণ এখন আর পেশাগত দায়িত্ব নয়—বরং প্রায় রাষ্ট্রদ্রোহের সমার্থক।

ভারতের অবস্থাও তার ব্যতিক্রম নয়। বরং বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দাবিদার দেশটিতে সংবাদমাধ্যমের একাংশের ক্রমবর্ধমান শাসকনির্ভরতা আজ প্রকাশ্য বাস্তব। আগের বছর ভারত ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫১তম স্থানে থাকলেও, বর্তমানে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ১৫৭তম স্থানে। ক্যাটাগরি : অত্যন্ত সিরিয়াস বা অতি গুরুতর। তার ফলে কী অবস্থা দাঁড়াচ্ছে ? না, ভোটের ফল ঘোষণার দিনেও বহু সংবাদমাধ্যমকে নিরপেক্ষতার মুখোশ খুলে সরাসরি রাজনৈতিক প্রচারযন্ত্রে পরিণত হতে দেখা গেছে। প্রশ্নহীন আনুগত্য যেন আজ সাংবাদিকতার নতুন সংজ্ঞা।

সম্প্রতি নরওয়েতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে এক বিদেশি সাংবাদিক প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি ক্ষমতায় আসীন হবার পর থেকে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেন না কেন। উত্তর আসেনি। বরং প্রশ্নকর্তাকেই ‘ষড়যন্ত্রকারী’, ‘দেশবিরোধী’, ‘ভাবমূর্তি নষ্টকারী’ তকমায় দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। এ যেন নতুন ভারতের নতুন কৌশল—প্রশ্নকে নয়, প্রশ্নকর্তাকেই কাঠগড়ায় তোলা।

কিন্তু রাষ্ট্রের এই নিয়ন্ত্রণস্পৃহা আর শুধু সংবাদমাধ্যমে থেমে নেই। এখন লক্ষ্য সামাজিক মাধ্যম—শেষ মুক্ত প্রান্তর। কারণ শাসক খুব ভালো করেই জানে, টেলিভিশনের স্টুডিও নিয়ন্ত্রণ করা সহজ, কিন্তু একটি মোবাইল ফোন হাতে থাকা নাগরিককে থামানো কঠিন। তাই আইনের ভাষার আড়ালে তৈরি হচ্ছে ভয়। ‘সংবাদ’, ‘চলতি ঘটনা’, ‘ভুয়ো তথ্য’—এই শব্দগুলোর সংজ্ঞা ইচ্ছাকৃতভাবে এতটাই অস্পষ্ট রাখা হয়েছে, যাতে যে কাউকে যে কোনো সময় অভিযুক্ত করা যায়।

ফেসবুক পেজ চালানো একজন সাধারণ যুবক, ইউটিউবে মতামত দেওয়া কোনো শিক্ষক, কিংবা এক্স-এ সরকারবিরোধী পোস্ট করা কোনো ছাত্র—তাঁরা সবাই এখন সম্ভাব্য অভিযুক্ত। কারণ সমালোচনাই যদি ‘ভুয়ো খবর’ হয়ে যায়, তাহলে সত্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করবে কে ? রাষ্ট্র ?

'ফ্যাক্ট চেক ইউনিট’-এর কথা শুনলে নিরপেক্ষ লাগতে পারে, কিন্তু যখন রাষ্ট্র নিজেই ঠিক করে কোন তথ্য সত্য আর কোনটি মিথ্যা, তখন সেটি আর তথ্য যাচাই থাকে না—তা হয়ে ওঠে মত নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র। এই ব্যবস্থায় ভিন্নমত মানেই ‘মিথ্যা’, সমালোচনা মানেই ‘অপরাধ’।

আরও যেটা ভয়ঙ্কর তা হল, সংসদীয় বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে এই ধরনের নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। গণতন্ত্রে আইন তৈরি হওয়ার কথা সার্বিক আলোচনার ভিতর দিয়ে। কিন্তু এখন আইন আসছে প্রশাসনিক আদেশ হয়ে—নিঃশব্দে, নিঃশর্তে, নিরঙ্কুশভাবে।

এর পরিণতি কী?

একটি অদৃশ্য ‘ডিজিটাল কার্ফু’।

যেখানে বড় কর্পোরেট মিডিয়া হয়তো টিকে যাবে, কিন্তু স্বাধীন কণ্ঠগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে অ্যালগরিদম, নোটিস আর আইনি আতঙ্কের অন্ধকারে। রাষ্ট্র বলবে—এটি নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু ইতিহাস বলছে, স্বাধীনতার কণ্ঠরোধ সবসময়ই ‘নিরাপত্তা’র নামেই শুরু হয়।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই :

যদি সত্য বলার আগে নাগরিককে অনুমতি নিতে হয়, তাহলে গণতন্ত্র আর কতটা বাকি থাকে?


Scroll to Top