
বিধানসভা ভোটের ফল বেরনোর ঠিক একমাসের মাথায় ভেঙে চুরমার তৃণমূল কংগ্রেস। ভোটে জয় পরাজয় আছে, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি ভেঙে যেতে পারে পনেরো বছর দাপটে রাজ্য শাসন করা একটা দল, সেটা ভাবা যায়নি। শুধু তাই নয়,'আসল তৃণমূল' কারা, প্রশ্ন উঠে গেল তাই নিয়েও। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি আগেই বিধানসভার অধ্যক্ষকে চিঠি দিয়ে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বুধবার দল থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার প্রস্তাব দিয়ে ৫৯ জন বিধায়কের স্বাক্ষর করা চিঠি জমা পড়ে অধ্যক্ষের কাছে। সেখানে মমতা ব্যানার্জিকে নেত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পিছনে কি টেকনিক্যাল বা আইনী কোনও কারণ আছে নাকি এটা অভিষেক বিতাড়নের জন্য মমতার উপর চাপ সৃষ্টির কৌশল, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এছাড়াও চর্চায় রয়েছে আর একটি বিষয় - ঋতব্রতর নেতৃত্বে এই যে ভাঙন, এর পিছনে বিজেপির মদত রয়েছে? নয়তো এত কম সময়ে এতজন বিধায়ককে এককাট্টা করা কি সম্ভব? বিধানসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর 'ঘোড়া কেনাবেচার' প্রয়োজন হয়নি বিজেপির। এখন কি তারা কার্যত বিরোধীশূন্য ফাঁকা মাঠে গোল দিতে চায়? তাতে আখেরে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে, সেটা পোড় খাওয়া রাজনীতিকদের বোঝার কথা।

অন্যদিকে বুধবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ডাকা প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিতে গেছেন তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের বেশির ভাগই। এমনকী ফিরহাদ হাকিম, কুণাল ঘোষ, নয়না বন্দোপাধ্যায়, অশোক দেবের মত যেসব নেতানেত্রীদের পরাজয় পরবর্তী সময়ে একেবারে মমতার পাশে দেখা গেছে, তাঁরাও নবান্নে যাওয়ায় জল্পনা তুঙ্গে উঠেছে। যদিও তৃণমূল বিধায়কদের কেউ কেউ বলেছেন, এলাকার উন্নয়নের কথা বলতেই তাঁরা এসেছেন বৈঠকে।
বিকেলে মমতা ব্যানার্জির কালীঘাটের বাড়িতে বৈঠকে ঢুকতে দেখা যায় অভিষেক ব্যানার্জি ও দোলা সেনকে। সংবাদমাধ্যমকে দোলা বলেন, 'আমি মমতা ব্যানার্জির তৃণমূলের সঙ্গে আছি।' তাহলে কি কোথাও তাঁরাও বুঝে নিয়েছেন, দল দুভাগ হয়ে গেছে? নবান্ন থেকে সোজা কালীঘাটে আসেন কুণাল ঘোষ এবং সাংবাদিকদের সামনে বিদ্রোহীদের তীব্র সমালোচনা করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হল ২০২৬-এ। ১৯৯৮ সালের ১জানুয়ারি সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন ফায়ারব্র্যান্ড রাজনীতিক মমতা ব্যানার্জি। এর পিছনে কাজ করেছিল দুটি কারণ। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের প্রতি মোহভঙ্গ এবং পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের দীর্ঘদিনের শাসনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য একটি স্বাধীন,আক্রমণাত্মক ও আপোসহীন রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরি। তিনি সরাসরি কংগ্রেসকে সিপিআইএম -এর বি টিম বলে আক্রমণ করেন। প্রথম থেকেই পথে নেমে প্রতিবাদের রাস্তা নেন মমতা এবং তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। নিজের তৈরি দলের জোড়াফুল প্রতীক নেত্রী নিজেই নক্সা করেন। তাঁর ঘোষিত লক্ষ্য ছিল মানুষের মাঝে থেকে মানুষের জন্য কাজ করা। পরবর্তী কালে তাঁর 'মা মাটি মানুষ' স্লোগান অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়। কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্কের বড় অংশ তৃণমূলের দিকে আসে। ১৯৯৮ সালের লোকসভা নির্বাচনে, একটি নতুন দল হওয়া সত্ত্বেও, বিজেপির সঙ্গে জোট বেঁধে ৭টি আসন লাভ করে তৃণমূল। দিনে দিনে রাজ্যে কংগ্রেস পুরোপুরি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এরাজ্যে আর কোনদিন ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি তারা।
১৯৯৮ থেকে ২০২৬। ২৮ বছর একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে কোনো বয়সই নয়, বিশেষ করে যার নেতৃত্বে মমতা ব্যানার্জির মত 'অগ্নিকন্যা'। এর মধ্যে এই মহাপতন মনে করিয়ে দেয় গিরিশ ঘোষের সেই বিখ্যাত সংলাপ- ' আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল'।