
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। তবে বেশির ভাগ সময়েই তা খাতায় কলমে। তালিবান শাসনের আফগানিস্তান বা সামরিক শাসনের মায়ানমারের কথা হচ্ছে না। ঐসব দেশকে আলোচনার বাইরে রাখাই শ্রেয়। দুর্ভাগ্যের কথা, গণতন্ত্রের বড়াই করা দেশগুলোতেও কিন্তু সাধারণ নাগরিক বলুন কি সরকারি আধিকারিক অথবা সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা ক্রমশ খর্ব হয়ে আসছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন সমালোচক সাংবাদিককে এক কথায় ব্যান করে দিতে পারেন, বাংলাদেশ যেমন জেলে ভরতে পারে, তেমনি ভারতেও তাঁবেদার মিডিয়া ছাড়া সরকারি বিজ্ঞাপনের শিকে ছেঁড়ে না। এব্যাপারে কেন্দ্র, রাজ্য, ডবল বা সিঙ্গল ইঞ্জিন সব সমান।
এবার আসি 'পরিবর্তিত' পশ্চিমবঙ্গের কথায়। 'অনুপ্রেরণা' মুক্ত নতুন গৈরিক পশ্চিমবঙ্গ। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরই পুলিশ ও প্রশাসনে বদলের হাওয়া টের পেয়েছেন রাজ্যের মানুষ। দুর্নীতি, তোলাবাজি, স্বজনপোষণের যে বেপরোয়া দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল বিগত তৃণমূল সরকার, তার বিরুদ্ধে অভিযানকে মানুষ স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু যেভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় লাগাম পরানো হয়েছে, তা অবশ্যই নিন্দনীয়। মুখ্য সচিবের তরফে সার্কুলার জারি করে বলা হয়েছে, আগাম অনুমতি ছাড়া যেন গণমাধ্যমে বক্তব্য না রাখেন সরকারি বা সরকারপোষিত সংস্থা, নিগম,পর্ষদের কর্তারা, আই এ এস, আই পি এস ইত্যাদিরা। এর মধ্যে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক - দুধরনের সংবাদ মাধ্যমই রয়েছে। সরকার যদিও বলছে, এই নির্দেশ নতুন কিছু নয়, বরং ১৯৫৯ সালের পশ্চিমবঙ্গ গভর্নমেন্ট সার্ভেন্টস কন্ডাক্ট রুল, ১৯৬৮ সালের সর্বভারতীয় সার্ভিস কন্ডাক্ট রুল ও ১৯৮০ সালের পশ্চিমবঙ্গ সার্ভিস রুল অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, বিরোধীরা কিন্তু একে কন্ঠরোধ ছাড়া অন্য কিছু বলতে নারাজ। তাঁদের মতে, এই পদক্ষেপ গণতন্ত্র বিরোধী। ভবিষ্যতে হয়তো সরকার এভাবেই
বিরোধী প্রতিবাদ ও আন্দোলন থামানোর চেষ্টা করবে, এমন আশঙ্কাও করেছেন কেউ কেউ।
বুদ্ধিজীবী ও বিদ্বজ্জনেরা সব দেশে, সব কালে সরকারকে সতর্ক রাখার প্রেশার গ্রুপ হিসেবে কাজ করেন। আর সংবাদমাধ্যমকে বলা হয় গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। যদি বহু সংখ্যক লেখক, অধ্যাপক, শিক্ষক সত্যিই নিষেধাজ্ঞার আওতায় চলে আসেন, তাহলে গঠনমূলক সমালোচনার সুফল থেকেও বঞ্চিত হবে সরকার।
বিপদের কথা, এই নিষেধাজ্ঞার ঢের আগে থেকেই সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল, পোর্টাল, ইউ টিউবে খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রে বড়সড় পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। 'গোদি মিডিয়া' বলে একটা কথা ফিরছে লোকের মুখে মুখে। যার অর্থ সরকারের পেটোয়া মিডিয়া। বিজ্ঞাপনের আশায়, অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে, কোনো কোনো সময় মালিক বা কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত লাভের তাড়নায় মাথা বিকিয়ে দিচ্ছে মিডিয়া হাউস। সেখানে সারাক্ষণ সরকারের নির্লজ্জ স্তাবকতা। পশ্চিমবঙ্গে এই ধারা বাম আমলে যে ছিল না তা নয়, তবে তৃণমূল জমানায় চরমে উঠেছিল। মমতা ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন। তাঁদের অঙ্গুলি হেলনে নির্ধারিত হত, কোন খবর যাবে আর কোনটা চেপে দেওয়া হবে। এছাড়া সাংবাদিকদের চাকরি থাকা বা যাওয়া, পদোন্নতি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও প্রায়শই হত নবান্নর নির্দেশে। দুঃখের বিষয়, বাংলায় বিজেপি সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গে মিডিয়ার বড় অংশ 'ধামাধরা' আচরণ শুরু করেছে। রাতারাতি তারা প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগেছে, শুভেন্দু সরকারের সবটাই ভাল। শমীক ভট্টাচার্য যেভাবে কিছু পাল্টি খাওয়া রাজনৈতিক নেতা, কর্মীকে 'তৎকাল বিজেপি' বলে দাগিয়ে দিয়েছেন, সেভাবেই এইসব মিডিয়া ব্যবসায়ীদেরও চিহ্নিত করা দরকার।
নতুন কিছু ঘটলে সবসময়ই মানুষ ভাল কিছু আশা করে। পনেরো বছরের 'অপশাসন' হঠিয়ে যখন বিজেপিকে সুযোগ দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, তখন তাদের প্রাণ খুলে কথা বলার স্বাধীনতাটুকু অন্তত দিতে হবে নতুন সরকারকে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে কীসের 'ভয় আউট ভরসা ইন'?