তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
কোহলির হাতে ট্রফি, বৈভবকে হিসেবের মধ্যে রাখুন

আইপিএল ফাইনাল কেমন হয়েছে, তা তো সবাই দেখেছেন। ‌ফাইনালকে ঘিরে যে উত্তেজনার বলয় তৈরি হয়েছিল, তার ধারেকাছে পৌঁছতে পারেনি ক্রিকেটীয় উত্তাপ। বলতে গেলে, দিন পনেরো আগের থেকে যে প্রচার চলছিল, সেটা যে হুবহু এরকম মিলে যাবে, তা অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেননি। বলা হচ্ছিল (‌১)‌ ফাইনাল খেলা হবে গুজরাট টাইটান্স বনাম রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে। মিলে গেছে হিসেবে। (‌২)‌ চ্যাম্পিয়ন হবে আরসিবি। যোগ্যতার নিরিখে চ্যাম্পিয়ন হতেই পারে যে কোনও দল। কিন্তু এবার যে পূর্বাভাস হাওয়ায় ছিল, সেটা যে হুবহু মিলে যাবে, এটা কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অতিবড় সমর্থকরাও ভাবতে পারেননি। বলা হয়, পরম অনিশ্চয়তায় ভরা খেলার নাম হল ক্রিকেট। ‌গ্রুপ লিগের খেলা দেখে বোঝা যায়নি কোয়ালিফাইং রাউন্ডে পৌঁছোনোর পর হিসেবপত্র (‌মানে পারফরমেন্স)‌ এমন অদ্ভুতভাবে ওঠানামা করবে। খেলার মাঠে হারজিৎ লেগেই থাকে। যে কোনও দল যে কোনও ম্যাচে হারতেই পারে। এবার জয় এবং পরাজয়, বিশেষ করে কোয়ালিফাইং রাউন্ডে পূর্বাভাস অনুযায়ী ঘটবে, এটা তো অতিবড় ক্রিকেটপ্রেমীও ভাবতে পারেননি। ফাইনাল চলাকালীন নোটবুকে চোখ বুলিয়ে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, প্রথম ৬ ওভারে গুজরাট টাইটান্স তুলেছিল ২ উইকেটে ৪২। সেখানে বিরাট কোহলির রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু সংগ্রহ করতে পেরেছিল ২ উইকেটে ৭০। খেলার ফলাফল তখনই প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। এবং প্রথম ব্যাট করা গুজরাট টাইটান্স আর খেলায় ফিরতে পারেনি। যদি ছক্কা মারার কথাই ভাবা হয়, সেখানেও কিন্তু আরসিবি টেক্কা দিয়েছে ৭টি ছয় মেরে। সেখানে গুজরাটের মারকুটে ব্যাটসম্যানরা ছয় মেরেছে মাত্র ৩টি। বাউন্ডারির ক্ষেত্রেও গুজরাট ছিল পিছিয়ে। শুভমান গিলরা মেরেছেন ১৫টি বাউন্ডারি। সেখানে বেঙ্কটেশ আইয়ারদের ব্যাট থেকে পাওয়া গেছে ১৮টি বাউন্ডারি। বস্তুত, প্রথম ব্যাট করার সুযোগ পেয়ে ১৫৫ রানে নিজেদের ইনিংস শেষ করার পরই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, গুজরাটকে ফাইনালে হারতে হচ্ছে। ২ ওভার বাকি থাক‌‌তে ৫ উইকেটে ১৬১ রান তুলে আরসিবি ট্রফি জিতে নিল। ‌ম্যান অফ দ্য ম্যাচের পুরস্কার পেয়েছেন বিরাট কোহলি, তঁার দুর্ধর্ষ অপরাজিত ৭৫ রানের ইনিংসের জন্য। তঁারই হাতে উঠেছে আইপিএল ট্রফি। ২০২৫‌–‌এর পর আবার ২০২৬–‌এ। উপুর্যপরি ২ বার। প্রথম ১৭ বছরে আরসিবির ঘরে ট্রফি যায়নি। প্রথম ট্রফি এসেছিল গতবছর। আবেগে ভেসে গিয়েছিল বাগান‌নগরী বেঙ্গালুরু।

ট্রফি জেতার পর নায়কদের সামনাসামনি দেখতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে মারা গিয়েছিলেন দর্শকরা। তঁাদের উদ্দেশ্যে কি এবারের ট্রফি উৎসর্গ করা হবে?‌ করা যায়। করা উচিত। যে নায়কদের জন্য শ্রদ্ধা, ভালবাসা, আবেগ দেখাতে গিয়ে প্রাণ দিতে হয়েছিল ক্রিকেটপ্রেমীদের, তাঁদের কথা মনে রাখা হবে না?‌ হয়তো হবে। কিন্তু এক বছর আগে যে তাজা প্রাণগুলো হারাতে হয়েছে, সেগুলোর থেকে দূরে সরে থাকা কঠিন, তাই না?‌ বিরাট কোহলি বলেছেন, দল জিতছে আমার ব্যাট থেকে ছিটকে যাওয়া বল বাউন্ডারিতে পৌঁছোনোর পর, এরকম একটা স্বপ্ন তিনি দেখছিলেন। তেমনই ঘটেছে। লং অন দিয়ে তাঁর শট সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে বেঙ্গালুরুর বন্ধুরা লিখে পাঠাল, ‘‌ই সালা, নু কাপ নামদু।’‌ অর্থাৎ, দ্বিতীয়বারও ট্রফি এল তাদের ঘরে। গতবার বিরাট ট্রফি জেতার পর বলেছিলেন, লক্ষ্যে পৌঁছোতে পেরেছি। হয়তো ১৮ বছর লেগেছে। এবার শিশুর মতো ঘুমোব। তবে এবার জয়ের পর বিরাটের মধ্যে সেই উদ্দাম এবং শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি। বরং তিনি ছিলেন অনেক বেশি শান্ত, পরিশীলিত। এজন্যই হয়তো বলে, প্রথম পাওয়ার আনন্দই আলাদা, প্রথম প্রেম, প্রথম রোজগার, চাইলেও ভোলা যায় না। তেমনি ভোলা যাবে না বিরাটের এই ইনিংস। ৪২ বলে অপরাজিত ৭৫ রান। তাঁর ইনিংসে রয়েছে ৯টি চার ও ৩টি ছক্কা। এমন সেরা মুহূর্তের স্বপ্ন তো দেখেন সবাই, কতজনের আর স্বপ্নপূরণ হয়। যেমন স্বপ্নপূরণ হয়নি ১৫ বছরের বৈভব সূর্যবংশীর। সবচেয়ে মূল্যবান ক্রিকেটারের স্বীকৃতি পেয়েছেন এবারের আইপিএলে। কিন্তু ট্রফি পাননি। কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, ফাইনালে উঠতে না পারায়। সর্বাধিক রান (‌৭৭৬)‌ করে পেয়েছেন কমলা টুপি। সুপার স্ট্রাইকারের (‌স্ট্রাইক রেট ২৩৭)‌ স্বীকৃতিও তাঁর। তিনিই সেরা উদীয়মান ক্রিকেটার। তাঁর ব্যাট থেকেই ছিটকে গেছে ৭২টি ছক্কা। এবারের আইপিএলে সর্বাধিক। তবু ট্রফির কাছাকাছি পৌঁছতে পারেননি।

ভেবেছিলেন অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপ জেতানোর নায়ক আইপিএল জেতাবেন রাজস্থান রয়্যালসকে। হয়নি। মাঠের বাইরের প্রচারকে নিজস্ব ভঙ্গিমায় ছয় মেরে মাঠের বাইরে ফেলতে পারেননি। অথচ সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীরা ধরে নিয়েছিলেন, ফাইনালে পৌঁছে যাবে রাজস্থান রয়্যালস ১৫ বছর বয়সী ক্রিকেটারের ব্যাটে চড়ে। হয়নি বলেই এবারের ফাইনালটা তেমন কিন্তু জমেনি। বিরাটকে অভিনন্দন, কিন্তু ফাইনালের শেষে পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে ৫ বার বৈভবের ডাক আসায় এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে প্রচার এবং অপপ্রচারের ফানুসকে ফুটো করে দিয়ে অদূর ভবিষ্যতে বৈভবের হাতেই ট্রফি উঠবে। আইপিএলের বিধ্বংসী ফর্ম দেখার পর ব্যক্তিগতভাবে আমি নিশ্চিত যে, খুব বেশি অপেক্ষা করতে হবে না জেদ, পরিশ্রম আর যোগ্যতার মিশেলে বৈভবের হাতে শুধু আইপিএল নয়, অনেক, অনেক ট্রফি আসবে।

(বিরাট কোহলি আইপিএল ট্রফি, আরসিবি চ্যাম্পিয়ন ২০২৬, বৈভব সূর্যবংশী আইপিএল, আইপিএল ফাইনাল বিশ্লেষণ, কোহলির দুর্ধর্ষ ইনিংস, ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ)


Scroll to Top