তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
ইন্ডিয়া জোটের অস্তিত্ব রক্ষার মরিয়া খেলা, ঐক্যের সুর বাজল না

দিল্লিতে ইন্ডিয়া জোটের আজকের বৈঠকটি আবারও প্রমাণ করল যে, রাজনৈতিক রণকৌশল তৈরির চেয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মরিয়া প্রচেষ্টাই এই জোটের মূল চালিকাশক্তি। ২০২৪-এর ইন্ডিয়া জোটের দুই বড় স্তম্ভ ডি এম কে আর আপ-এর অনুপস্থিতেই এই ২৩ দলের বৈঠক আসলে অস্তিত্ব সংকটের স্বীকারোক্তি। অথচ এই বৈঠকের ঠিক সমান্তরালেই তৃণমূলের সংসদীয় দল ভাঙার যে সুপরিকল্পিত ছক সামনে এসেছে, তা রাজনৈতিক মহলে এক প্রবল কম্পন সৃষ্টি করেছে। ভেতরে ভেতরে নিজেদের ঘর যখন ভেঙে টুকরো টুকরো হচ্ছে, তখন দিল্লিতে বসে জোটের মিটিংয়ে উপস্থিত থাকাটা তৃণমূলের কাছে অনেকটা প্রহসনে পরিণত হয়েছে। মমতা AIIMS-এ 'রুটিন চেকআপ' করিয়ে এলেন বৈঠকে আর ডেরেক ভেতর থেকে টুইট করলেন 'INDIA united' - ঘর ভাঙছে, মুখে ইউনাইটেড। ঘর সামলাতে ব্যর্থ একটি দল যখন জাতীয় স্তরে জোটের হাল ধরার দাবি করে, তখন তার সারবত্তা নিয়ে সংশয় জাগাটাই স্বাভাবিক।

এই অসংলগ্নতার পেছনে বড় কারণ হল ডিএমকে এবং আপের অনুপস্থিতি। কংগ্রেসের প্রতি এই দলগুলোর ক্রমবর্ধমান বিতৃষ্ণা এখন আর গোপন বিষয় নয়। তাছাড়া কংগ্রেসের অতি-আধিপত্যবাদী মানসিকতা এবং আঞ্চলিক দলগুলোর স্বার্থকে বারংবার খাটো করার প্রবণতায় ডিএমকে এবং আপের নেতৃত্ব চূড়ান্ত বিরক্ত। তারা বুঝে গেছে, এই জীর্ণ কংগ্রেসের ঝান্ডা ধরে এগোলে নিজের রাজ্যে দলের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। তার ওপর ডিএমকে এখন তামিলনাড়ুর মাটিতে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। তারা বুঝতে পেরেছে, কোনো সর্বভারতীয় মঞ্চে বা জোটে সক্রিয় থাকা মানেই তাদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলো আরও বেশি করে প্রকাশ্যে আসা। বিজয়-এর টিভিকে-র সঙ্গে লড়াইয়ে টিকে থাকতে তারা এখন এমন কোনো সিদ্ধান্তের অংশ হতে চাইছে না যা তাদের 'আঞ্চলিক শক্তির' ইমেজ নষ্ট করে। বৈঠকে না আসাটা মূলত তাদের একলা চলো নীতি এবং দলের ভেতরে ডামাডোল সামলানোর ব্যর্থতা। আপ-এর ক্ষেত্রে বিষয়টা একটু আলাদা। পাঞ্জাবে ভোট আগামী বছর। পাঞ্জাবে সরকার সামলানোর দায় এবং দিল্লির ঝামেলার মাঝে তারা এখন জাতীয় স্তরের বিরোধী জোটে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে দোদুল্যমান। তারা জানে, বিরোধী বৈঠকে উপস্থিত থাকা মানেই পরোক্ষভাবে কংগ্রেসের নেতৃত্বের কাছে মাথা নোয়ানো, যা তাদের রাজনৈতিক মেরুবিদ্বেষী ইমেজের জন্য ক্ষতিকর। পাঞ্জাবের আসন্ন নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে আপ এখন নিজেদের 'স্বতন্ত্র' প্রমাণ করতে মরিয়া। তাই এই বৈঠক এড়িয়ে যাওয়া তাদের পরিকল্পিত 'দূরত্ব তৈরির কৌশল'।

ডিএমকে এবং আপ—উভয়েই বুঝতে পেরেছে যে এই মুহূর্তে কোনো যৌথ সভায় অংশ নেওয়া মানেই নিজেদের রাজনৈতিক ব্যর্থতাকে স্বীকৃতি দেওয়া। তাদের অনুপস্থিতি বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, 'ইন্ডিয়া' জোট এখন কেবল নামেই টিকে আছে, কাজের জায়গায় তাদের মধ্যে অবিশ্বাসের দেওয়াল অনেক উঁচুতে। কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন এই জোটে ডিএমকে ও আপ এখন নিজেদের ক্রমশ বিচ্ছিন্ন করে নিচ্ছে, যার ফলে বৈঠকের গুরুত্বই অনেকাংশে লঘু হয়ে পড়েছে।

২৩টি দলের উপস্থিতিতে বৈঠকের আবহ ছিল সম্পূর্ণ অস্থির। মল্লিকার্জুন খড়গে বিদেশনীতি, বেকারত্ব, প্রশ্নফাঁস, সংবিধানের অবমাননা এবং আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য—এই পাঁচটি মূল ইস্যুতে আক্রমণ শানাতে গিয়ে সরকারের ‘কম্প্রোমাইজড ফরেন পলিসি’র সমালোচনা করেছেন। ঠিক তেমনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে ডেরেক ও'ব্রায়ান বাংলার প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনকে কাঠগড়ায় তুলে সাফ জানিয়েছেন যে, এসআইআর (SIR) বা ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিজেপি পরিকল্পিতভাবে অন্যায্য সুবিধা পেয়েছে। ইন্ডিয়া বৈঠকে 'কমন পারপাস' শুধু মুখের কথা, নোটে নেই।

এই দুই ভিন্ন মেরুর দাবিকে এক সুতোয় গাঁথতে গিয়ে কংগ্রেস যেখানে ইভিএম-এর কারচুপির পুরোনো ভাঙা রেকর্ড বাজানোর মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে, সেখানে তৃণমূলের অগ্রাধিকার জুড়ে রয়েছে সম্পূর্ণ ‘বাংলা-সেন্ট্রিক’ অ্যাজেন্ডা। ডেরেক ও’ব্রায়ানের কণ্ঠে ‘কমন পারপাস, ইন্ডিয়া ইউনাইটেড’-এর বুলি আওড়ানো হলেও, বাস্তবের মাটিতে আসন সমঝোতা আর আদর্শগত সংঘাতের যে অন্ধগলি, তা ঢাকা পড়ার কোনো লক্ষণ নেই।

শুধু মোদী-বিরোধিতার গৎবাঁধা স্লোগান ছাড়া দেশের জ্বলন্ত ইস্যুগুলো নিয়ে কোনো সুসংহত প্রশাসনিক মডেল বা ব্লু-প্রিন্ট আজকের আলোচনায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বরং এই জোড়াতালি দেওয়া ঐক্য যে ক্ষমতার লিপ্সা আর ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার চোরাবালিতে আটকে আছে, তা আজকের বৈঠক থেকেই স্পষ্ট। এই গন্তব্যহীন যাত্রার কোনো শেষ স্টেশন যে আদতে নেই, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। ক্ষমতার অলিন্দে ফেরার খিদে, অভ্যন্তরীণ দলাদলি, আর শরিকি অবিশ্বাসই এই জোটের ভবিতব্য লিখে দিয়েছে। আজকের বৈঠক সেই আসন্ন পতনের দলিলকেই আরও একবার জোরালোভাবে সিলমোহর দিল মাত্র। এই রাজনৈতিক নাটকীয়তায় মোদী বিরোধিতার আড়ালে যে বড় ধরনের ভাঙন ঘনিয়ে আসছে, তা অস্বীকার করার জায়গা নেই।


Scroll to Top