
একেনবাবু সিরিজটি মূলত সুজন দাশগুপ্তের কাহিনী অবলম্বনে গড়ে উঠলেও, পর্দায় তা এখন একটি নিজস্ব ব্র্যান্ড। এবারের গন্তব্য রুক্ষ কিন্তু সুন্দর পুরুলিয়া। কাহিনী শুরু হয় একেনবাবু, বাপী এবং প্রমথকে নিয়ে একটি ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা দিয়ে। কিন্তু যেখানে একেনবাবু, সেখানে রহস্য তো থাকবেই।
পুরুলিয়ার রাজবাড়ির প্রাচীন ঐতিহ্য, হারিয়ে যাওয়া বহুমূল্য পান্নার রহস্য এবং তার সাথে জড়িয়ে থাকা স্থানীয় রাজনীতি ও আভিজাত্যের লড়াই—সব মিলিয়ে চিত্রনাট্যটি সাজানো হয়েছে। ছবির মূল ভিত্তি হলো একটি মূর্তির চুরি এবং একেনবাবুর অদ্ভুত উপায়ে তার কিনারা এবারের রহস্যের জাল বিছানো হয়েছে লাল মাটির দেশ পুরুলিয়ায়। একেন বাবু (অনির্বাণ চক্রবর্তী), বাপি (সুহোত্র মুখোপাধ্যায়) এবং প্রমথ (সোমক ঘোষ) গিয়েছেন ছুটি কাটাতে। কিন্তু একেন বাবু যেখানে থাকেন, সেখানে রহস্য তো আসবেই! গল্পটি আবর্তিত হয় পুরুলিয়ার একটি শান্ত অথচ কঠোর নিয়মে চলা নিরামিষাশী আশ্রম ঘিরে। আশ্রমের প্রধান পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া একটি মহামূল্যবান পান্না হারিয়ে ফেলেন। একদিকে পান্না চুরির রহস্য, অন্যদিকে আশ্রমের কঠোর অনুশাসন—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে নাজেহাল আমাদের ভোজনরসিক গোয়েন্দা। কারণ, মাংসপ্রেমী একেনবাবুকে এখানে দিন কাটাতে হচ্ছে কেবল 'কুমড়োর ছক্কা' আর নিরামিষ পদ খেয়ে! এর মধ্যে যুক্ত হয় একটি খুনের ঘটনা, যা সাধারণ চুরির কেসকে এক গভীর ষড়যন্ত্রে রূপ দেয়।

একেন বাবু হিসেবে অনির্বাণ এখন এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছেন যেখানে তাঁকে ছাড়া এই চরিত্র ভাবাই অসম্ভব। তাঁর সেই সিগনেচার হাসি, ভুলভাল প্রবাদ আর খাবারের জন্য আকুতি—সবই এবারও নিখুঁত। তবে এবারের বিশেষত্ব হলো তাঁর সাথে এক খুদে চরিত্রের রসায়ন। যে বাচ্চাটি বারবার তাঁকে খাবারের জন্য 'খোঁটা' দেয়, তাদের দৃশ্যগুলো সিরিজের অন্যতম প্রাণ। বাপি ও প্রমথর চরিত্রে এই দুই অভিনেতার কেমিস্ট্রি আগের মতোই সাবলীল। যদিও অনেক সময় মনে হয়েছে প্রমথর স্ক্রিন টাইম বা গুরুত্ব আরেকটু বেশি হতে পারত। আশ্রমের প্রধান চরিত্রে অভিজ্ঞ অভিনেতাদের উপস্থিতি এবং স্থানীয় কুশীলবদের অভিনয় গল্পে বিশ্বাসযোগ্যতা এনেছে।

পরিচালক জয়দীপ মুখোপাধ্যায় এবং চিত্রনাট্যকার পদ্মনাভ দাশগুপ্ত এবার পুরুলিয়ার লোকসংস্কৃতি, বিশেষ করে ছৌ নাচ-কে রহস্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। লাল পাহাড় আর পলাশ বনের সিনেমাটোগ্রাফি চোখের আরাম দেয়। তবে গল্পের কিছু কিছু জায়গায় মনে হয়েছে রহস্যের জট ছাড়ানোর চেয়ে একেনবাবুর কমেডিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে লজিক বা গোয়েন্দাগিরির গভীরতা কিছুটা কম মনে হতে পারে, কিন্তু বিনোদনের খাতিরে তা ক্ষমার যোগ্য।
পুরুলিয়ার আবহে রহস্যের নতুন স্বাদ। নিরামিষ আশ্রমের বিপরীতে একেনবাবুর খাবারের হাহাকার দারুণ মজার। ছৌ মুখোশের রহস্য গল্পের রোমাঞ্চ বাড়িয়েছে। গল্পের ক্লাইম্যাক্স কিছুটা আন্দাজ করে নেওয়া যায়। কিছু দৃশ্য একটু বেশি দীর্ঘায়িত মনে হতে পারে।
পুরুলিয়াকে এই ছবিতে কেবল একটি শুটিং স্পট হিসেবে নয়, বরং একটি চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
অযোধ্যা পাহাড়ের পাহাড়ের রুক্ষ সৌন্দর্য এবং পলাশ ফুলের আবহ (যদি ঋতু মিলে থাকে) ড্রোন শটে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। রাজবাড়ির অন্দরমহল এবং তার গাম্ভীর্য রহস্যের ঘনীভূত পরিবেশ তৈরি করতে সফল। রহস্যভেদে ভৌগোলিক অবস্থানের ব্যবহার চিত্রনাট্যকে গতিশীল করেছে।যেকোনো গোয়েন্দা গল্পের মূল মেরুদণ্ড হলো তার রহস্যের জট। 'রুদ্ধশ্বাস পুরুলিয়া'র ক্ষেত্রে গল্পের মোড়গুলো বেশ আকস্মিক। খুব সহজে অপরাধীকে চেনা যায় না, যা দর্শককে শেষ পর্যন্ত বসিয়ে রাখতে সক্ষম। কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিত্রনাট্য কিছুটা ধীরগতির মনে হতে পারে। বিশেষ করে মাঝের কিছু অংশে অতিরিক্ত সংলাপ রহস্যের গতি কমিয়ে দেয়। এছাড়া, কিছু পার্শ্বচরিত্রের অভিনয় আরও একটু জোরালো হতে পারত।ব্যোমকেশ বা ফেলুদার মতো গুরুগম্ভীর গোয়েন্দাদের ভিড়ে একেনবাবু একটি 'ব্রেথ অফ ফ্রেশ এয়ার'। তার মধ্যে কোনো অতিমানবিক ব্যাপার নেই। সে ভুল করে, সে হাসাহাসি করে এবং সে আমাদের পাশের বাড়ির লোকের মতো। পুরুলিয়া অভিযানেও এই সারল্যই তাকে জয়ী করেছে।জয় সরকারের সঙ্গীত পরিচালনা ছবির রহস্যময় আবহকে দানা বাঁধতে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে সাসপেন্সের সময় আবহ সঙ্গীতের সঠিক ব্যবহার উত্তজনা বাড়িয়ে দেয়। একটি নিখাদ বিনোদনমূলক ছবি। যারা খুব জটিল রাজনৈতিক থ্রিলার খুঁজছেন না, বরং সপরিবারে একটি রহস্যের সমাধান দেখতে চান, তাদের জন্য এটি আদর্শ।
আপনি যদি একেন বাবুর ভক্ত হন, তবে 'পুরুলিয়ায় পাকড়াও' আপনার জন্য একটি মাস্ট-ওয়াচ। ছুটির দুপুরে বা অবসরে হালকা মেজাজের রহস্য আর প্রচুর হাসির জন্য এই সিরিজটি দারুণ। গোয়েন্দা গল্পে যারা গভীর গাম্ভীর্য খোঁজেন, তারা হয়তো একটু হতাশ হতে পারেন, কিন্তু 'একেনোচিত' বিনোদনে কোনো খামতি নেই।