তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
এস আই আর-এর কল্যাণে এবারের ভোট একদম আলাদা

২০২১ আর ২০২৬। দুটি নির্বাচনের কাহিনি। দুটি নির্বাচনের মধ্যের দূরত্ব সহস্র যোজন। এবারের নির্বাচনে বিজেপি যতটা আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ, সেই রূপ আমি আগে কখনো দেখিনি। গত চার দশকের বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের ভোট পর্ব দেখছি। এমন নির্বাচন কখনো দেখিনি। মনে হচ্ছে যেন সত্যি সত্যি একটা যুদ্ধ বেধে গেছে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ। দুটি শিবির। একটা তৃণমূলের সামিয়ানা, অন্যটা বিজেপির। আর এবারের ভোটে এনফোর্সমেন্ট, সিবিআই এবং অন্যান্য এজেন্সি নয়, এবার সবচেয়ে বড় নির্ধারক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে এস আই আর। বিশেষ নিবিড় সংশোধন এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সবচেয়ে বড় দৃষ্টি আকর্ষণকারী ঘটনা। এর আগের ভোটেও ভোটার তালিকা সংশোধন হয়েছে।

প্রত্যেক ভোটের আগেই হয়। কিন্তু এবার ঘুসপেটিয়া, অনুপ্রবেশকারী, রোহিঙ্গা ইত্যাদি নানা অনুষঙ্গ এনে ভুতুড়ে ভোটার বাদ দেবার নামে যেভাবে লাখ লাখ লোকের নাম বাদ গেল, সেটা কিন্তু অভূতপূর্ব। শেষ পর্যন্ত প্রায় ৮০ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাবে বোধ হয়। এক কোটি ছুঁই ছুঁই হয়ে যেতে পারে। এর মধ্যেই জোরদার প্রচার শুরু হয়ে গিয়েছে সব দলের। প্রধানমন্ত্রী আসছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসছেন। অমিত শাহ তো বলেই দিয়েছেন, কর্মীদের মনোবল বাড়ানোর জন্য তিনি টানা ১৫ দিন থাকবেন এই রাজ্যে। কর্মীদের মনোবল বাড়াতে তিনি আর কী করতে পারেন ! পশ্চিমবঙ্গ এবার বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে, এটাও ঘটনা । এই বিজেপি অতীতেও অনুপ্রবেশকারীর কথা বলেছে, কিন্তু এই প্রথম ভোটের সময়ে ভোটার তালিকা থেকে এত জন ভোটারের নাম বাদ গেল। এটা মনে রাখার মত একটা ঘটনা। এ আমরা অনেকদিন পরেও মনে রাখব।

কিন্তু ইভিএম-এ কী হবে এই এস আই আর-এর প্রতিক্রিয়া? এর ফলে বিজেপি কি এই রাজ্যে বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে ? আমি জ্যোতিষী নই, পোলস্টারও নই। তাই ভবিষ্যৎবাণী করা থেকে বিরত থাকব। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতির বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এটুকু বলতে পারি, জয় শ্রী রাম বা উগ্র হিন্দুত্ব বিজেপির প্রিয় কোর ইস্যু হলেও এবারের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে এই দুইয়ের মধ্যে কোনটিই প্রধান হয়ে উঠতে পারছে না। এবারের প্রধান ইস্যু হল পরিবর্তন। তার জন্য পরিবর্তন যাত্রা হয়েছে। বলা হচ্ছে অনুপ্রবেশকারীদের বাদ দিয়ে ভোট হবে। গড়া হবে নতুন বাংলা। যেখানে ইসলামিক মৌলবাদীদের কোন জায়গা থাকবে না। সেই জন্যেই এস আই আর হয়েছে। এইভাবে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ভোটের শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ দখল করতে চাইছে। একদিকে উত্তরবঙ্গে হুমায়ুন কবীর আর দক্ষিণবঙ্গে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট মুসলিম ভোট ভাঙতে চাইছে, একটা লড়াই দিতে চাইছে, অন্যদিকে এই হিন্দু ভূতকে সামনে রেখে বিজেপি নিজেদের লড়াইকে কনসলিডেট করতে চাইছে। কিন্তু হিন্দু ভোটের শতকরা ৪৫ ভাগ নিজেদের সঙ্গে নিতে না পারলে সরকার গঠন করা যে কঠিন, তা অনেক বিশ্লেষক, অনেক পোলস্টার বলছেন।

বিজেপির এই আক্রমণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু পরিস্থিতির মোকাবিলা করছেন। বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী - এটাই ওঁর দর্শন। এই ব্যাপারটা মাথায় নিয়ে তিনি জেলায় জেলায় নিবিড় লড়াইয়ের স্ট্র্যাটেজি সাজাচ্ছেন। তিনি রাহুল গান্ধী নন, তিনি তেজস্বী যাদব নন। ঢিলের বদলে পাটকেল মারতে তিনি সিদ্ধহস্ত। এটাই তাঁর রণকৌশল। নিজের ভোট ব্যাংককে তিনি সুসংহত করছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, ২৯৪ টি আসনের প্রত্যেকটা আসনে তিনিই প্রার্থী। এটাই আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্র্যান্ড ইকুইটি। বিজেপিও সেটা জানে। ২০২১ -এ এই ব্র্যান্ড ইকুইটিকে আক্রমণ করে বিজেপি ভালো ফল পায়নি। এবারেও পাবেনা আর পাবে না জেনেই বিজেপি তার স্ট্যাটেজিতে এই ব্র্যান্ড ইকুইটিকে রাখেনি। মোদি বা অমিত শাহদের আক্রমণের লক্ষ্য এবার তাই ব্যক্তি মমতা বন্দ্যপাধ্যায় নন, লক্ষ্য তাঁর সরকার। অমিত শাহরা বলছেন, তাঁরা ব্যক্তি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরিবর্তন করার কথা বলছেন না, বলছেন সরকারের পরিবর্তন করার কথা। যে রেনেসাঁর গৌরব পশ্চিমবঙ্গ হারিয়ে ফেলেছে, তাঁরা বলছেন, তাঁদের লক্ষ্য সেই হারানো গৌরব ফিরিয়ে দেওয়া। ভালো প্রশাসনের কথা বলছেন তাঁরা, সুশাসনের কথা বলছেন। সুতরাং বিজেপি তার যুদ্ধকৌশল বদলে ফেলেছে। আর তার বিপরীতে সংখ্যালঘু ভোটকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুসংহত করছেন। সংখ্যালঘুদের মধ্যে যে নিরাপত্তার অভাব দেখা দিয়েছে, মমতা তা লক্ষ্য করেছেন। ফলে তাঁর স্ট্র্যাটেজি খুব পরিষ্কার। বিজেপি যতই প্রচার করুক যে এই কৌশল পশ্চিমবঙ্গে চলবেনা, কিন্তু মমতার এই স্ট্যান্ডের ফলে হুমায়ুনরা যে সেই সংহতিকে ভাঙতে পারবেই এমন সম্ভাবনা কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারি প্রকল্পে অনুদানের যে সুফল, তা পশ্চিমবঙ্গে জেলায় জেলায় এখন ভালোই দেখা যাচ্ছে। লক্ষ্মীর ভান্ডার থেকে যুবসাথী, কন্যাশ্রী থেকে বার্ধক্য ভাতা, পশ্চিমবঙ্গের এক বড় অংশের মানুষ এসবের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি কৃতজ্ঞ। বিজেপি যতই বলুক এসব দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সুফল আসবেনা, তা নিয়ে সম্পাদকীয় নিবন্ধ ফাঁদা যেতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তার আবেদন খুব বেশি নেই। এই পরিস্থিতিতে কোনো বিশ্লেষক, কোনো পোলস্টারই কিন্তু বলছেন না যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হেরে যাচ্ছেন। সবাই বলছেন ভোটের মার্জিন কমছে, কিন্তু তিনি হেরে যাচ্ছেন, এমন কথা কেউ বলছে না । স্নায়বিক যুদ্ধে নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে, যেমন ব্যাপক অফিসার বদল, নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিয়ত নানা বিজ্ঞপ্তি, এসব থেকে কারো কারো মনে হচ্ছে বটে যে, বিজেপির হয়তো কর্তৃত্বই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, বিজেপির ভোটের হার বাড়ছে, এমনকি ফটো ফিনিশ রেজাল্ট হতে পারে এমন কথাও কেউ কেউ বলছেন, যেদিকে সুইং হবে সেদিকে আসন সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে এমনও শোনা যাচ্ছে, কিন্তু জেলায় জেলায় বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি না বাড়লে, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্ভরযোগ্য বাঙালি মুখ উঠে না এলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই এখনো পশ্চিমবঙ্গে বাঙালির ভরসা। তবে শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। আপাতত বলা যায়, কংগ্রেস সিপিএম অনেকটা অক্সিজেন পেলেও, জেলায় জেলায় ১৫ বছরের অ্যান্টি ইনকামবেন্সি থাকলেও, লড়াইটা কিন্তু এখনো মমতা ব্যানার্জির দল এবং বিজেপির মধ্যেই। শেষ হাসি কে হাসে দেখার জন্য এখনো আমাদের কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।


Scroll to Top