তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
কোন চক্রান্তে আশ্চর্য সফ্টওয়্যারের ম্যাজিকে ৯১ লক্ষ নাম ভ্যানিশ ?

রাজ্যে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে 'ইলেকশন কমিশন' এবং 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (SIR)-এর নামে যা চলছে, তাকে কি আদৌ আর গণতন্ত্র বলা যায়? ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়া কোনো সাধারণ হিসেবের ভুল মাত্র হতে পারে না। এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং বিপজ্জনক রাজনৈতিক পদক্ষেপ।

নির্বাচনের ঠিক চার মাস আগে SIR শুরু করে তড়িঘড়ি করে ৯১ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৭ লক্ষ মানুষ প্রমাণসহ আপিল করলেও তাদের জানানো হয়েছে যে শুনানি হবে নির্বাচনের পরে! অর্থাৎ, তারা ভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও এই নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না। রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক অথচ ডাক্তার দেখানোর অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হয়েছে পরের সপ্তাহে—এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে?

সুপ্রিম কোর্ট যেখানে শেষ আশ্রয় হওয়ার কথা, সেখানে কোর্টও এই SIR প্রক্রিয়াকে সবুজ সংকেত দিয়ে দিয়েছে। সফটওয়্যারের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, আর আদালত বলছে 'যা চলছে চলুক' । এই পরিস্থিতি ১৯৭৬ সালের সেই কুখ্যাত 'এডিএম জবলপুর' মামলার কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন জরুরি অবস্থার সময় নাগরিকদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়াকেও বৈধতা দেওয়া হয়েছিল।

এস আই আরের পর ৭.৬৬ কোটি থেকে ভোটার তালিকা কমে দাঁড়িয়েছে ৬.৭৫ কোটিতে। অর্থাৎ, প্রায় ৯১ লক্ষ (১২%) ভোটারের নাম গায়েব! সরাসরি ২৭ লক্ষ ভোটারকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে, এদের শুনানি হবে নির্বাচনের পর।

বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে ৬৩% হিন্দু এবং ৩৪% মুসলিম। যেহেতু জনসংখ্যার ২৭% মুসলিম, তাই স্বাভাবিক অঙ্কে তাদের নাম বাদ পড়ার হার অনেক বেশি।

২০২১-এর নির্বাচনে তৃণমূল এমন ৩৬টি আসন জিতেছিল যেখানে জয়ের ব্যবধান ছিল ৫%-এর কম। এবার এসব কেন্দ্রে বাদ পড়া ভোটার ২৭ লক্ষ ,যা মোট ভোটারের প্রায় ৫%। অর্থাৎ, এই ভোটারদের সরিয়ে দিলে সরাসরি রেজাল্ট উল্টে দেওয়া সম্ভব।

ইলেকশন কমিশনের সফটওয়্যারের 'Logical Discrepancy' নোটিশের নামে যা চলছে তা মধ্যযুগীয় বিচারের মতো।

যেমন ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্রে একজন মুসলিম ভোটারের নাম তালিকায় আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা একজন হিন্দু ভোটারের তুলনায় ৩ গুণ বেশি।

শমসেরগঞ্জ, যেখানে ৮২% মুসলিম জনসংখ্যা, সেখানে 'Adjudication'-এ পাঠানো ভোটারের ৯৮.৮% মুসলিম।

মানিকচকে ৫০-৫০ জনসংখ্যার অনুপাতেও সফটওয়্যার ৯৭.৪% মুসলিম ভোটারকে 'সন্দেহভাজন' হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

তাহলে এবার দেখা যাক, ক্ষতিগ্রস্ত কারা। এ তো কেবল ধর্মের লড়াই নয়, এ হল প্রান্তিক মানুষের ওপর আক্রমণ।

উত্তর ২৪ পরগনার বাগদা বা বনগাঁ উত্তর কেন্দ্রে হাজার হাজার মতুয়া হিন্দু ভোটারের নাম বাদ পড়েছে।

আসানসোল, দুর্গাপুর বা হাওড়ার অস্থায়ী শ্রমিক, যাঁরা কাজের প্রয়োজনে প্রায়ই ঠিকানা বদলান, তাঁদের 'Address Mismatch'-এর দোহাই দিয়ে তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে।

বিচারপতি বা কারগিল যোদ্ধাদের মতো মানুষদেরকেও যখন নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে চক্কর কাটতে হয়, তখন বুঝতে হবে কোথাও বড় পদ্ধতিগত ত্রুটি রয়ে গেছে। আজ যদি ১২% ভোটারকে এভাবে 'অদৃশ্য' করে দেওয়া যায় এবং সুপ্রিম কোর্ট তাতে মৌন সম্মতি দেয়, তবে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।

বিজেপি - বিরোধীরা বলছেন, এটা আর 'মুক্ত ও অবাধ' নির্বাচন নয়, বরং ডেটা-পলিটিক্সের মাধ্যমে জনগণের রায়কে হাইজ্যাক করার এক সুপরিকল্পিত নীল নকশা।

আজ ২৭ লক্ষ মানুষ ভোটাধিকার হারালেন, কিন্তু কাল যদি লিস্টে আমার বা আপনার নামটাও 'ডেটা ইনকন্সিস্টেন্সি'র দোহাই দিয়ে উবে যায়, তখন কাকে ধরবেন ? ইসিআই-কে নাকি ওই ইরোনেট নামক সফটওয়্যারকে, যা কিনা বিশেষভাবে পশ্চিমবঙ্গের জন্য তৈরি বলে অভিযোগ? লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি নামক অজুহাত কেন শুধু পশ্চিমবঙ্গেই প্রয়োগ করতে হল?


Scroll to Top