তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
ফুলপিসি ও এডওয়ার্ড: রহস্য, স্মৃতি, নারী

বাংলা চলচ্চিত্রে রহস্যকাহিনির একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। একদিকে যেমন গোয়েন্দা-নির্ভর কাহিনি—ফেলুদা, ব্যোমকেশ, কিরীটী কিংবা শবর—দর্শকের কাছে জনপ্রিয়, অন্যদিকে পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক সংকট এবং মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্রও সমানভাবে সমাদৃত। নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘ফুলপিসি ও এডওয়ার্ড’ এই দুই ধারার সংমিশ্রণে নির্মিত একটি উল্লেখযোগ্য ছবি। এটি শুধুমাত্র একটি রহস্যভেদী চলচ্চিত্র নয়; বরং স্মৃতি, পারিবারিক ক্ষমতার রাজনীতি, নারীর অবস্থান, উত্তরাধিকার এবং বাঙালি মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত পরিবারের অন্দরমহলের গোপন অন্ধকারকে অনুসন্ধান করার এক শিল্পিত প্রয়াস। ছবিটির বিশেষত্ব এখানেই যে, এটি দর্শককে শুধুমাত্র 'খুনি কে?' এই প্রশ্নের মধ্যে আটকে রাখে না। বরং আরও গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে—একটি পরিবার কীভাবে নিজের ইতিহাসকে লুকিয়ে রাখে? স্মৃতি কীভাবে বিকৃত হয়? একজন নারী কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত থেকেও সত্যের বাহক হয়ে উঠতে পারেন? এবং ক্ষমতার কাঠামো কীভাবে ভালোবাসা, সম্পর্ক ও নৈতিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করে?
বাংলা সিনেমায় রহস্যচিত্রের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন একজন গোয়েন্দা। কিন্তু এই ছবিতে সেই প্রচলিত রীতি ভাঙা হয়েছে। এখানে ফুলপিসি কোনও পেশাদার গোয়েন্দা নন। তিনি পরিবারের একজন সদস্য, যিনি পরিবারের বহু গোপন ইতিহাসের সাক্ষী। এই অবস্থানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গোয়েন্দা সাধারণত পরিবারের বাইরের মানুষ হন। কিন্তু ফুলপিসি ভিতরের মানুষ। ফলে তাঁর অনুসন্ধান কেবল অপরাধের অনুসন্ধান নয়, নিজের অতীত এবং নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে এক ধরনের আত্ম-অনুসন্ধান।


বাংলা চলচ্চিত্রে ‘পিসি’ চরিত্র সাধারণত হাস্যরসের উৎস অথবা পারিবারিক সহানুভূতির প্রতীক। কিন্তু ফুলপিসি এই ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দেন। তিনি বয়স্ক, কিন্তু অসহায় নন। তিনি আবেগপ্রবণ, কিন্তু যুক্তিবাদী। তিনি পরিবারের সদস্য, কিন্তু পরিবারের ক্ষমতার কাঠামোর অংশ নন। ফলে তাঁর অবস্থান এক ধরনের ‘মার্জিনাল অথরিটি’। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ফুলপিসি হলেন সেই নারী, যিনি কেন্দ্রের বাইরে অবস্থান করেও সত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছতে পারেন। এখানেই চরিত্রটির মৌলিকতা। ছবির নামেই রয়েছে “এডওয়ার্ড”। ফুলপিসির বিড়াল। যে বিড়াল হারিয়ে ফেলেন তিনি বিয়েবাড়িতে এসে। আবার এই বিয়েবাড়িতে জমিদার খুন হন।সেই রহস্য সমাধানে জড়িয়ে পড়েন ফুলপিসি। কিন্তু এডওয়ার্ড যেন কেবল এক বিড়াল নয় ; সে এক ধরনের প্রতীক। এডওয়ার্ড যেন ইতিহাসের সেই অদৃশ্য ছায়া, যা কখনও পুরোপুরি চলে যায় না। ঔপনিবেশিক স্মৃতি, জমিদারি ঐতিহ্য, ক্ষমতার উত্তরাধিকার এবং গোপন অপরাধ—সবকিছুর সঙ্গে এডওয়ার্ড নামটি জড়িয়ে আছে।এই নামের মধ্যেই এক ধরনের অতীতের প্রতিধ্বনি রয়েছে। ফলে এডওয়ার্ড চরিত্রটি যতটা বাস্তব, ততটাই রূপক। ছবির অন্যতম বড় শক্তি তার লোকেশন। পুরনো জমিদারবাড়িটি কেবল একটি পটভূমি নয়। এটি নিজেই একটি চরিত্র। দীর্ঘ করিডর, বন্ধ দরজা, ধুলো জমা ঘর, পুরনো প্রতিকৃতি—সবকিছু যেন অতীতের নীরব সাক্ষ্য বহন করে। ছবিটির অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় স্মৃতি।প্রত্যেক চরিত্রের নিজস্ব স্মৃতি রয়েছে। কিন্তু সব স্মৃতি কি সত্য? না। অনেক স্মৃতি বিকৃত। অনেক স্মৃতি ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি। অনেক স্মৃতি আবার দমন করা। ফলে ছবিতে সত্যের অনুসন্ধান আসলে স্মৃতির অনুসন্ধান। এখানে দর্শক বুঝতে পারেন যে, সত্য কোনও একক সত্ত্বা নয়। সত্য তৈরি হয় বহু স্মৃতি, বহু দৃষ্টিভঙ্গি এবং বহু নীরবতার সমষ্টি থেকে। ফুলপিসির ভূমিকায় অভিনেত্রী সোহিনি সেনগুপ্তের অভিনয় ছবির প্রাণ। তাঁর সংলাপ বলার ভঙ্গি, চোখের অভিব্যক্তি, নীরবতা—সবকিছু চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তোলে। বিশেষ করে যেসব দৃশ্যে তিনি কোনও কথা বলেন না, শুধু পর্যবেক্ষণ করেন, সেসব মুহূর্তে অভিনয়ের সূক্ষ্মতা সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে। অন্যান্য অভিনেতারাও দক্ষতার সঙ্গে পারিবারিক উত্তেজনা ও গোপন সংকটকে ফুটিয়ে তুলেছেন। বর্তমান বাংলা চলচ্চিত্রে দুই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। একদিকে হালকা বিনোদনমূলক ছবি। অন্যদিকে সরাসরি থ্রিলার। ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’ এই দুই ধারার বাইরে দাঁড়িয়ে একটি মধ্যবর্তী পথ তৈরি করেছে। এটি বুদ্ধিবৃত্তিক, কিন্তু দুর্বোধ্য নয়। এটি রহস্যময়, কিন্তু কেবল রহস্যের উপর নির্ভরশীল নয়। ছবিটি মূলত একটি পরিবারের গল্প। কিন্তু সেই পরিবারের মধ্যেই বৃহত্তর সমাজের প্রতিফলন দেখা যায়।নীরবতা, গোপন অপরাধ, সামাজিক মর্যাদা রক্ষা, নারীর কণ্ঠস্বরকে দমন করা—এসব আমাদের সমাজের পরিচিত বাস্তবতা। ফলে ছবিটি কেবল ব্যক্তিগত গল্প নয়। এটি সামাজিক দলিলও।
বাংলা চলচ্চিত্রের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ‘ফুলপিসি ও এডওয়ার্ড’ এমন একটি কাজ, যা রহস্যের বিনোদনকে অতিক্রম করে স্মৃতি, ইতিহাস ও মানুষের অন্তর্জগতের গভীরে প্রবেশ করতে চেয়েছে। সেই কারণেই ছবিটি শুধুমাত্র একটি চলচ্চিত্র নয়; এটি বাঙালি পারিবারিক ইতিহাসের অন্দরমহল।


Scroll to Top