
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের ঢাকে কাঠি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব কাপ ফুটবলের দামামাও বেজে উঠেছে। জুন মাসে শুরু হচ্ছে এই বিশ্ব
কাপ ফুটবল। এবারই প্রথম সম্মিলিত ভাবে তিনটি দেশ বিশ্ব ফুটবল সংগঠন করছে -- আমেরিকা, মেক্সিকো এবং কানাডা। এর আগে দুটো দেশের বিশ্ব কাপ সংগঠন করার রেওয়াজ আছে। ২০০২ সালের বিশ্ব কাপ ফুটবলই তো হয়েছিল জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়ায়। সেবার আমি বিশ্ব কাপ নিয়ে খুব জেরবার হয়েছিলাম। আজ সিওল তো কাল টোকিও। বিশ্বকাপের আইটেনারি ঠিক করাই সমস্যা হয়ে গিয়েছিল। এবার তো আবার তিনটি পৃথক পৃথক দেশ!যোগদানকারী দেশের সংখ্যাও বেড়ে বত্রিশ থেকে আট চল্লিশ হয়েছে। এবারের বিশ্ব কাপ অবশ্যই অভিনব এবং তা নতুন দিগন্ত রেখা স্পর্শ করবে।আমি সাংবাদিক হিসেবে বিদেশের মাটিতে ক্রিকেট বিশ্ব কাপ ও ফুটবল বিশ্ব কাপ কভার করেছি। বিশ্ব কাপ ফুটবল গুনে গুনে দশ গোল দেবে ক্রিকেট বিশ্ব কাপকে। আয়োজনে,বৈভবে এতটাই বিশাল এই বিশ্বকাপ যে কেন এই বিশ্ব কাপ কে "গ্রেটেস্ট শো অন দা আর্থ "বলা হয় তার হদিশ বোধহয় দিতে পারেন তারাই যাঁরা সুযোগ পেয়েছেন অন্তত একটি বিশ্ব কাপ ফুটবল দেখার। আমি সাংবাদিকতা করার সুযোগে তিনটি বিশ্ব কাপ দেখার সুযোগ পেয়েছি। অসাধারণ সেই অভিজ্ঞতা! কোনো দিন ভুলতে পারবো না। নস্টালজিয়ার স্মৃতিতে ডুব না দিয়ে পাঠকদের এবার নিয়ে যাই এবারের বিশ্ব কাপ এর গাইডেড ট্যুরে। এবার প্রথম তিনটি দেশ যে বিশ্ব কাপ হোস্ট করছে তা প্রথমেই বলেছি। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রর এগারোটি শহরে এই প্রতিযোগিতার খেলাগুলি হবে। নিউ ইয়র্ক - নিউ জার্সির মেট লাইফ স্টেডিয়াম এ ফাইনালটি হবে। মেক্সিকোর তিনটি শহরে এবার বিশ্ব কাপ ফুটবল এর খেলাগুলি হবে। এই তিনটি শহর হল - মেক্সিকো সিটি, গুয়াডেলযারা ও মন্টেরেট। কানাডার দুটি শহর বিশ্ব কাপ দেখবে - টোরেনতো ও ভাঙ্কুভার। ১১ জুন মেক্সিকোর ঐতিহ্যশালী এস্টাডিও দা আজটেকা কিংবা আজটেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ এর কিক অফ হবে। ৩৯ দিন ধরে ১০৪ টি ম্যাচের পর নির্ধারিত হবে কে হবে বিশ্ব সেরা। এতদিন ধরে ফিফা বিশ্বকাপ ১৯কোনোদিন হয়নি। টুর্নামেন্টের ফরম্যাট বদল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্সের পাশাপাশি কেপ ভারদে, আইসল্যান্ডের মত দল ও বিশ্ব কাপের মূলপর্বে খেলছে। কেপ ভারদের জনসংখ্যা পাঁচ লাখেরও কম। তারা বিশ্বকাপ খেলছে আর আমাদের একশো কোটি চল্লিশ লক্ষ মানুষের দেশ বসে লেবেনচুষ চিবোচ্ছে ভাবা যায়! ধান ভানতে বোধহয় শিবের গীত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বড় দুঃখের এই অনুভূতিকে বাদ দিই কিভাবে? তবে, আসা যাক মূল প্রসঙ্গে।১৯ জুলাই বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে এই বিশ্ব কাপে দারুনভাবে।অফ সাইড নির্ধারণের জন্যে সেমি অপারেটেড প্রযুক্তি তো থাকছেই, থাকছে উন্নত মানের " ভার " ও। আটচল্লিশটি দলকে বারোটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে।এর মধ্যে ৩২ টি দল উঠবে রাউন্ড অফ সিক্সটিনে।প্রতিটি গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স দল শেষ ষোলোর নক আউট এ পৌঁছবে। অর্থাৎ ১২ x২ = ২৪ হয়ে গেলো। ফলাফলের নিরিখে বাকি আটটি দেশ আসবে গ্রুপে তৃতীয় স্থানাধিকারীদের মধ্যে থেকে। অর্থাৎ পরিভাষায় - স্টেজ ইজ সেট -এখন শুধু খেলা শুরুর বাঁশিটি বাজার অপেক্ষা!
রেফারির শুরুর বাঁশি বাজার অপেক্ষা কিন্তু করেনি ইতালি - জার্মানির মত দেশগুলি। বাছাই পর্বেই যোগ্যতা অর্জন করতে না পারায় তাদের বিদায় নিতে হয়েছে শুরুর আগেই। একসময়ের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পাওলো রসি - রোবারতো বাজ্জিওদের দল ইতালির এই পদস্খলন মেনে নেওয়া যায়না। রোমে সেই রাতটার কথা মনে পড়ছে। ইতালিয়া ৯০ তে ইতালি এক গোলে হেরে গেছে আর্জেন্টিনার কাছে। গোটা ইতালি জুড়ে শোকের আবহ। রোমা টারমিনি স্টেশনের পাশে ক্যাপিটাল হোটেলের নিচে বসে এক ইতালিয়ান বুড়ি মুরগি ভাজা বিক্রি করত। দাম আমেরিকান মুদ্রায় প্রায় চার ডলার এর কাছাকাছি। সেই রাতে সেই বুড়ি দু ডলার এই ছেড়ে দিচ্ছিল মুরগি ভাজা। জিজ্ঞাসা করতেই বুড়ি সেদিন উত্তর দিয়েছিল -- আজ ইতালি হেরে গেছে। আজ জাতীয় শোক এর দিন। আমার পোলি ( মুরগি ) আজ কেউ কিনবে না। তাই কম দাম করে দিয়েছি। সেই বৃদ্ধাই আমাকে শুনিয়েছিলেন ইতালি ফুটবলকে কিভাবে তাদের ধর্ম মানে। সেই ইতালি এবার বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারল না। ভাবা যায়? যেমন ভাবা যায়না প্রাক্তন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, ইউরোপের পাওয়ারহাউস জার্মানির এবারের বিশ্বকাপে না থাকাটা। জার্মানিতে একটা স্কলারশিপ নিয়ে থাকার সময় সেখানে ইউরোপিয়ান কাপ হয়েছিল। তখন দেখেছিলাম ফুটবলকে কেন্দ্র করে জার্মান - অস্মিতা। সেই জার্মানির এবারের বিশ্বকাপে না থাকাটা কম দুঃখজনক নয়। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলি এবং আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়া এবারের বিশ্ব কাপে থাকছে না। সালাসের দেশ চিলির অভাব যেমন অনুভূত হবে তেমনই বোঝা যাবে কানুর দেশ নাইজেরিয়ার না থাকাটা। আমরা ভারতীয়রা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর বাসনায় চিমা - এমেকার দেশের জন্য গলা ফাটাতাম - এবার সে গুড়ে বালি। এবার নতুন শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে মরোক্কো। আফ্রিকার কাউন্টার অ্যাটাক সম্বলিত দলটিকে নিয়ে চিন্তায় লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের সমীহ জাগানো দেশ গুলিও। নতুন শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে কানাডা - মালির মত দেশগুলিও। আছে উজবেকিস্তানও। এবার দেখার যে জীর্ণ পুরাতনকে বাদ দিয়ে এবার বিশ্বকাপে নব কেতন ওড়ে কিনা!