তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
কেরলে ভোটের ফলে বোঝা যাবে বিজেপি আদৌ কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে

৯ এপ্রিল ভোট হল কেরলে। এখন ফল ঘোষণার আগে চলছে বিশ্লেষণ। কেরলের রাজনৈতিক ভারসাম্য কীভাবে বিজেপির উত্থানের দিকে মোড় নিয়েছে, কয়েকটা খবরই তার প্রমাণ।

প্রথমত, প্রথাগত আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রশ্নে

কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন UDF এবং সিপিআই(এম)-নেতৃত্বাধীন LDF-এর অবস্থান। বিজেপিকে রেফারেন্স হিসেবে রেখেই তারা কিন্তু তাদের লড়াইকে চালনা করেছে। প্রতিটি পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে বিজেপির সঙ্গে লড়াইয়ে দুর্বল হওয়া বা এমনকি আঁতাত করার অভিযোগ পর্যন্ত তুলেছে। বিজেপি ইতিমধ্যে দাবি করেছে যে, কেরালায় UDF এবং LDF ছদ্ম লড়াই করছে। কেননা দেখা যাচ্ছে, দেশের অন্য জায়গায় তারা একে অপরের সঙ্গী।

দ্বিতীয়ত, তিনটি জোটই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে একমত যা গত আট বছর ধরে রাজ্যের রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই মুহূর্তে বড় ইস্যু, শবরীমালা মন্দিরে ঋতুমতী নারীদের প্রবেশ। এখন তিনটি পক্ষই একমত যে নারীর প্রবেশ উচিত নয়। আজ সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ -এই ধর্মস্থানে ঐতিহ্যবাহী প্রথা মানাই উচিত। সুপ্রিম কোর্ট যখন আগের রায় পুনর্বিবেচনা করার জন্য আবেদনগুলো গ্রহণ করে, যেখানে ঋতুমতী নারীদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তখন কেরালার LDF সরকার এবং কেন্দ্রে বিজেপি সরকার একই মত পোষণ করে এই প্রথা বজায় রাখার পক্ষে সওয়াল করেছিল। হিন্দু সম্প্রদায়ের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে LDF নারীদের প্রবেশের পক্ষে তাদের কঠোর অবস্থান ত্যাগ করে। আজকের ঘটনা অবশ্য আগের রায়কে নস্যাৎ করে দিল।

কেরলে চোখে পড়ার মতো হিন্দু ভোটব্যাঙ্কের উত্থান অনস্বীকার্য, কিন্তু তা নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে কীভাবে এবং কতখানি প্রভাবিত করবে, তা এখনও একটি বড় প্রশ্ন।

গত কয়েক বছরে নির্বাচনে বিজেপির পারফরম্যান্স এর প্রমাণ। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাদের ভোটের হার ১৬% থেকে কমে ২০২১ সালে ১১.৫% এ দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তা আবার ১৬.৭%-এ ফিরে এসেছে। ২০১৬ সালে তারা নেমম থেকে ও. রাজাগোপালের জয় দিয়ে তাদের প্রথম বিধানসভা আসন জিতেছিল, কিন্তু ২০২১ সালে সেটি হারায়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তারা ত্রিশূর আসনে জয়লাভ করে এবং তিরুবনন্তপুরম ও আত্তিঙ্গালে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। এছাড়া আলাপ্পুঝার বেশ কিছু বিধানসভা কেন্দ্রেও তারা দ্বিতীয় স্থানে দৌড় শেষ করে।

রাজ্যের জনভিত্তিক গঠন হল বিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় স্পিড-ব্রেকার। ২০১১ সালের আদমসুমারি অনুযায়ী, কেরলে ৫৪.৭% হিন্দু, ২৬.৬% মুসলিম এবং ১৮.৪% খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী রয়েছেন, যারা নানা নির্বাচনী এলাকায় ছড়িয়ে আছেন। বিজেপি রাজ্যে নিজেদের পথ তৈরির জন্য খ্রিস্টান এবং মুসলিমদের মধ্যেকার চাপা উত্তেজনার ওপর নির্ভরশীল। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বেশ কিছু নেতাকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। তিরুভাল্লায় বিজেপির প্রার্থী অনুপ অ্যান্টনি জোসেফের হয়ে প্রচার করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, হিন্দু এবং খ্রিস্টানরা সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধতার শিকার হচ্ছেন। তিনি তাঁদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

এই মুহূর্তে UDF-এর জয়ের সম্ভাবনা নির্ভর করছে আদৌ কি তারা খ্রিস্টান এবং মুসলিম সমর্থকদের মধ্যে বিভাজন এড়াতে পেরেছে। পাশাপাশি তাদের হিন্দু ভোটব্যাঙ্কের ক্ষয় রোধ দরকার ছিল। খ্রিস্টানরা UDF-এর মধ্যে ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগের (IUML) প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট রকম সন্দিহান। এই সন্দেহের পেছনে জনভিত্তিক এবং অর্থনৈতিক কারণও রয়েছে। হিন্দু ও খ্রিস্টানদের মধ্যে জন্মহার মুসলিমদের তুলনায় কম। এছাড়া প্রচুর খ্রিস্টান ও হিন্দু ছেলেমেয়ে স্থায়ীভাবে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে, যেখানে মুসলিমদের পরিযায়ন সাময়িক। খ্রিস্টান নেতারা সম্পত্তি হারানো এবং স্থানীয় ব্যবসায় মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে রীতিমত আতঙ্কিত। এই পরিস্থিতিতে খ্রিস্টান-মুসলিম বিভাজনের আশঙ্কা অনুভব করে IUML বলেছে যে, তারা উপ-মুখ্যমন্ত্রীর পদ বা নির্দিষ্ট কোনো মন্ত্রিত্ব নিয়ে কোনো দাবি তুলবে না।

UDF -এর সমস্যা হল, তাদের অনেক নেতা, কিন্তু মাঠে নেমে কাজ করার কর্মী কম। তাদের ব্যাখ্যা, এই পরিস্থিতির জন্য অনেকটাই দায়ী রাজ্যের জনসংখ্যা বিন্যাসে পরিবর্তন। প্রবীণদের সংখ্যা বাড়ছে আর নবীনরা রোজগারের জন্য রাজ্য ছাড়তে আগ্রহী। রাজনৈতিক কর্মীর এই ঘাটতি কংগ্রেসকে খুবই প্রভাবিত করছে, তবে বামপন্থীরাও এর থেকে মুক্ত নয়।

২০২১ সালে পিনারাই বিজয়ন বিপুল জয় পেয়েছিলেন। সিপিআই(এম) দক্ষিণ জেলাগুলোর খ্রিস্টান ও মুসলিমদের একটি বড় অংশকে নিজেদের দলে টেনে বিজেপির দিকে চলে যাওয়া হিন্দু ভোটারদের ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছিল। ফলে, নজিরবিহীন দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে তারা।UDF পরাজিত হয়।

এবার সমীকরণ ভিন্ন। বিজয়ন এবং LDF হিন্দু ভোট পুনরুদ্ধারে মনোনিবেশ করেছে। সরকার কেবল শবরীমালা নিয়ে তাদের অবস্থানই পরিবর্তন করেনি, সেই সঙ্গে ভক্তদের একটি সম্মেলনেরও আয়োজন করেছিল যেখানে বিজয়ন নিজে উপস্থিত ছিলেন। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের একটি চিঠি সেই অনুষ্ঠানে পড়ে শোনানো হয়েছিল। এসএনডিপি যোগম (SNDP Yogam) নেতা ভেল্লাপল্লী নাতেসান, যিনি বারবার মুসলিম বিরোধী মন্তব্য করে থাকেন, তিনিও এই নির্বাচনে বিজয়নকে সমর্থন করেছেন।

অনুমান করা যায়, LDF এবং UDF দুই জোটই বিজেপির কাছে কিছু কিছু ভোটার হারিয়েছে, আবার UDF থেকে LDF-ও কিছু ভোট পেয়েছে। গত কয়েকবছরে বিজেপির ভোটের গ্রাফ ক্রমাগত বেড়েছে বটে, তবে তাদের ঊর্ধ্বমুখী যাত্রা হঠাৎ করেই বাধা পেয়েছে ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যাক্ট বা FCRA সংশোধন বিল আসার ফলে। কেরলে চার্চ পরিচালিত হাসপাতাল, স্কুল এবং সামাজিক কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো চিরকাল বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। নির্বাচনের ঠিক আগে কেন্দ্র বিলটি স্থগিত রাখলেও ক্ষতি যা হওয়ার তার আগেই হয়ে গেছিল।

কেরলে এবারের বিধানসভা নির্বাচন আগের চেয়ে বেশি মেরুকরণভিত্তিক বলে ইঙ্গিত মিলেছে। LDF -এর প্রধান লক্ষ্য বিজয়নকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয়বার সুযোগ দেওয়া। UDF ভোটারদের কাছে প্রশ্ন তুলেছে, বিজয়নকে ফের সুযোগ দেওয়া উচিত কি? যদি ভোট এই লাইনে হয়ে থাকে, তবে সেটা একটি দ্বিমুখী লড়াই যেখানে বিজেপি নেহাতই তৃতীয় শক্তি। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই, যত দিন যাচ্ছে, কেরলে বিজেপি অজানা শক্তি হিসেবে মাথা চাড়া দিচ্ছে।


Scroll to Top