তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
রঙে রেখায় রাজপুতানা

বশিষ্ঠ জানতে চাইল, কোনটা ভাল ছিল, রাজার আমল, না এখনকার সরকার। বুড়ো বলল--এখনকার শাসন ভাল কি করে বুঝব? সব ত খেয়ে শেষ করে দিল। এরা দেশের এমন হাল করেছে যে পয়সা দিয়েও আফিং পাই না। হাসির রোল উঠল। গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধান হালকা হলুদ ও ম্যাজেন্টা রঙের পাগড়ি পরেছে। বলল--এটা খুব পুরোনো গ্রাম। ন'শো বছর বয়স ত হবেই। এই গ্রামের অনেক ছুতোরমিস্ত্রি দুবাই আর ওমানে চলে গেছে। তাদের এত টান যে দু'তিন বছর অন্তর একবার গ্রামে ফিরবেই। জিনিসপত্র ভরে আনে, অনেকের জন্যই আনে। কেউ বলল--মোড়লের জন্য একটু বেশী আনে। ফোকলা দাঁতে হেসে উঠল মোড়ল। 

গোঁফওয়ালা মাস্টার মধ্যবয়সী। গ্রাম ছেড়ে কোথাও যাবার কথা ভাবে না। সে বলল--এটাকে বলা যায় বর্ধিষ্ণু গ্রাম। ছাগল-মোষ অনেকেরই আছে। এই গ্রামের লোকেদের কাঠের কাজের সুনাম ছিল। কাজ করার জন্য বহু কারিগর এ গ্রামে থেকে যেত। এছাড়া এরা নানারকম শাল, বালতি আর হাতের কাজের নানা জিনিস তৈরী করে। স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ার ব্যবস্থা। এর বেশি পড়তে জয়সলমের-এ যেতে হয়। মেয়েদের পড়ার এখনও রেওয়াজ নেই। বশিষ্ঠ জানতে চাইল-- ছেলেদের মধ্যে পড়াশোনার রেওয়াজটা এত কম কেন? মাস্টার বলল--পড়াশোনা করার অনেক বাধা। তাও চেষ্টা করি এদের পড়াতে, যতটা যার হয়। মোড়ল ফোকলা দাঁতে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিল। বললে--পড়বে কেমন করে ? 

এদের জীবনে নানা বাধা। খরার সময়ে জলের জোগাড় করতে এদের সময় যায়। অল্পবয়সীদের দায়িত্ব অনেক। স্কুলে যাওয়াটা অপচয়। একটু থেমে মোড়ল আরও বলল--সুখার দিনে ভেড়া-ছাগল নিয়ে দূর রাজ্যে পাড়ি দেয় বাচ্চারাও --মাস্টার তখন কি তাদের বাধা দেবে? বলে দূরে স্কুলটা আঙুল উঁচিয়ে দেখাল বশিষ্ঠকে। বশিষ্ঠ ভাবল--এটা কি সরকারী স্কুল ঘর? না বলে দিলে ত বোঝাই ভার। কিছু গরু আর গাধা রোদের তাপ থেকে নিজেদের বাঁচাতে স্কুল ঘরে দিব্যি জায়গা করে নিয়েছে। মোড়ল বলল--গ্রামে এই এক সুবিধে--কারুর সঙ্গে কারুর বিরোধ নেই। ছাত্ররা যখন আসবে, গরু-বাছুর গাধাগুলোকে তাড়িয়ে দিব্যি স্কুল ঘরে বসে পড়বে। এটা একটা মস্ত গুণ। কিন্তু অবস্থাটা একবার ভাবুন, গোরু মোষ ছাগল ভেড়া নিয়ে বড়রা যখন মধ্যপ্রদেশ বা গুজরাটে যায়--তখন তো বাচ্চাদেরও সঙ্গে যেতে হয়। ওখানকার লোকেরা আজকাল এদের যেতে দিতে চায় না, নানা রকমভাবে বাধা দেয়, এমন কি আক্রমণও করে। এরাই বা কেন ছাড়বে, হামলার জবাব দেয়। এজন্য বাচ্চাদেরও হাতে লাঠিসোটা থাকে। কি কপাল, ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে হয় মরতে। 

বশিষ্ঠের মনে পড়ে গেল, মধ্যপ্রদেশের সংরক্ষিত বনের একজন অফিসার ওকে বলেছিল--আরে মশায়, এরা যারা জয়সলমের অঞ্চল বা ঐ এলাকা থেকে আসে, এরা সব সাংঘাতিক লড়াকু ট্রাইব। ‘ভেড়া ভাগাও আন্দোলন' কি শুধু ভেড়া-ছাগলের দৌরাত্ম্যে হচ্ছে? হচ্ছে, তার কারণ বন্দুকের চেয়ে লোকেরা ভয় পায় গোফানের মার-কে। একরকমের গুলতি, বুঝলেন--এরা বলে গোফান। যেমন লোকগুলোর গোঁফ, তেমনি গোফানের নিশানা। গণ্ডগোল আরও এক জায়গায়। অনুমতিপত্র নেবে দশ হাজার ভেড়ার জন্য আর কায়দা করে বনে ঢুকিয়ে দেবে দুই লক্ষের মত। ভেড়াগুলোকে আপনি তাড়াতেও পারবেন না। ভীষণ প্রভুভক্ত। যেখানে প্রভু বসিয়ে দিয়ে যাবে মরে গেলেও নড়বে না; প্রাণ দেবে তবুও। 

এদের কথা শুনতে শুনতে কখন সন্ধ্যা নেমে এল, টের পায়নি বশিষ্ঠ। ঘোরের মধ্যে ছিল যেন। রতনু বলল--সার্, এবার চলুন, আপনার জন্যে গান-বাজনার ব্যবস্থা করেছি। বশিষ্ঠকে নিয়ে যাওয়া হল অন্য এক বাড়িতে। ঘরে একপাশে বস্তা বস্তা ধান রাখা। সারা বছরের সংস্থান। বাজার থেকে নিয়ে এল বেশ ঝাল আলুভাজি। সঙ্গে এলাচ দেওয়া চা। সন্ধ্যা হতেই ভাঙ্গা একটা হারিকেন জ্বালান হল। কয়েকজন গাইতে আসছে। শতরঞ্চি পেতে দেওয়া হয়েছে দালান বাড়ির উঠোনে। হারিকেনের আলোতে সবার মুখ দেখা যাচ্ছে না। ছায়া ছায়া মূর্তি আসছে যাচ্ছে, খাটিয়ায় বসছে আবার উঠে যাচ্ছে। 

শিল্পীরা এল হারমনিয়াম নিয়ে। ছোট্ট একটা বাচ্চা বাজাচ্ছে খরতাল। গান কখন শুরু হবে ঠিক নেই, বাচ্চা ছেলেটার তর সইছে না, খরতাল বাজিয়েই সে মাৎ করে দেবে, এমন একটা ভাব। কালো মত একটি ছেলের হাতে ঢপলি। মধ্যবয়সী দাড়িগোঁফওয়ালা বাজাচ্ছিল সারেঙ্গী। 

বশিষ্ঠের মনে পড়ে গেল সাম যাবার পথে একবার এক লাঙ্গা যুবকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কাঁধে ঝোলান সিন্ধি সারেঙ্গী। বশিষ্ঠ হঠাৎ পাগড়িটার দিকে নজর পড়ায় লাঙ্গা চোখের কোণে কয়েকটা রেখা ফুটিয়ে বলল--কি দেখছ সার্? বশিষ্ঠ যেন নিজের মনেই বলল--না, ঠিক যেন মেলাতে পারছি না। কথায় বলে, রাগ রসোই পাগড়ি, কভী কভী বন্ যায়। বশিষ্ঠ বলল--তোমার ঐ সারেঙ্গীটা একটু বাজাবে? লাঙ্গা শুধাল--কি রাগ শুনবেন? বশিষ্ঠ বলল--সময়ের সঙ্গে সুর মিলিয়ে এমন কিছু বাজাও, শুনি। লাঙ্গা আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে মনে মনে সময়টা ঠিক করে নিয়ে সারেঙ্গীর ছড়ে টান দিল। রাগটা একটু যেন অন্যরকম। বাজাতে বাজাতে একটু থেমে লাঙ্গা বলল--সিন্ধু-ভৈরবী, সাব্। বশিষ্ঠ ভাবল, তাই তো এরা তো সিন্ধ প্রদেশ থেকে এসেছে। বশিষ্ঠ জানে, গানের রাগরাগিণী এদের হাতের মুঠোয়। সময়, রঙ, কাল সব ফিরিয়ে দিতে পারে সারেঙ্গীক এক ছড়ে। 

ততক্ষণে গায়ক আধ-বসা অবস্থায় তান ধরেছে, তার বাঁ-হাতটা কানের ওপরে। ডান হাতটা নিবেদনের ভঙ্গীতে একটু উপরের দিকে ছড়ান। বোঝা যায় না কোন্টা সারেঙ্গীর সুর, কোটা তার গলা। মিলে মিশে একাকার। গানের কলি মনে নেই বশিষ্ঠের কিন্তু রতনু গানগুলির ভাবার্থ বুঝিয়ে দিচ্ছিল। এক একটা গানের কি ভাব! বিচ্ছু কামড়েছে বউকে। ভাসুর বিষ ছাড়াবে শুনে বউ লজ্জাবতী লতার মত ঝুঁকে পড়ে। দেবর বিষ ছাড়াতে এলে বউয়ের হাসি পায়। স্বামী দেবতা একবার বিষ ছাড়াতে আসুক না--দেখব মজা। গানের কথায় এদের এই গ্রাম্য জীবনযাত্রা যেন স্পর্শ করা যায়। যেমন ছন্দ, তেমনি তান ও লয়। 

অন্য এক গানের কলি--স্বামী চলে যাবে দূরদেশে। প্রিয়তমা বউ বলছে, পশুরা সারাদিনের কাজ শেষ করে ঘরে ফিরে আসে, কিন্তু স্বামীকে দেখলে মনে হয় পশুদের চেয়েও অধম। অন্য গানটা পরিচিত--কেসরীয়া বালম্ আয়োনি, পধরো মারো দেশ....। গানের সেই সুর বাজছিল কানে; সমস্ত জয়সলমের-এর পরিবেশটা বশিষ্ঠে আজ মাতিয়ে তুলল। দিল্লীর আজ এই মেঘলা দিনে এদের কথা ভাবছিল, মনে হ যেন আঁকার মধ্যে সেইসব পুরনো স্মৃতিকে আবার স্পর্শ করতে পারবে। চা খেতে বড় ইচ্ছে করছে। একটা সিগারেট ধরিয়ে হরিপদকে ডাকল -- হরিপদ এক কাপ চা করে নিয়ে আয়। জল রঙের প্রথম প্রলেপ পড়ল কাগজে। 


Scroll to Top