
অনেক রক্তক্ষয়, অনেক বীরত্ব, অনেক বিজয় ও পরাজয়ের স্মৃতি বহন করে আছে চিতোরগড় দুর্গটা। বশিষ্ঠ দেখল, বিশেষ একটা ভঙ্গী করে দাঁড়িয়ে আছে ওটা। অবশ্য নিবেদিতার চোখে পড়ল কিনা জানে না। যে ভাবনা মনের ভেতরে ও বাইরে, তারই রূপ দেখল সামনে। সবই ভঙ্গী, যুদ্ধে বিজয় যেমন, পরাজয়ও তেমনি। প্রাণ দেওয়া ও প্রাণ নেবার পণও আর এক ধরণের ভঙ্গী। মানুষ যখন মুখ খিঁচিয়ে ঝগড়া করে তখন এক আলাদা ভঙ্গী; মিষ্টি ব্যবহার, মিষ্টি কথার ভঙ্গিমা নিশ্চয় তার সঙ্গে মেলে না। সেটাই বশিষ্ঠ ভাবছিল। আর দুর্গের নানা ভঙ্গিমার নানা দিক বেছে বেছে ছবি তুলে নিচ্ছিল।
নিবেদিতা তা লক্ষ্য করেই যেন বলল—আপনি যেন চিতোরগড়ের একটু বেশী ছবি তুলছেন—কি ব্যাপার? আপনার সব ব্যাপারটাই আমার কাছে অদ্ভুত লাগে। হিসাবের বাইরে আপনি।
—বেহিসাবি বলছ? বশিষ্ঠ হেসে জিজ্ঞাসা করে।
—তা নয়। কোন একটা বিশেষ ফ্রেমে আপনাকে বাঁধতে গিয়েই দেখছি ভুল করছি—।
হা হা করে হেসে উঠল বশিষ্ঠ। বলল—ও, বুঝেছি। দিল্লীতে বসে দিব্যি আঁকছিলাম, হঠাৎ এমন কি ঘটল যে তোমাকে নিয়ে চলে এলাম—সেটাই কি বলতে চাইছ?
—ওটা তো আছেই। দিল্লীতে বসেও চিতোরগড় আঁকা যেত। কিন্তু আপনি বললেন—না, তা হয় না। চিতোরগড় ও উদয়পুর এমন জায়গা যে দেখে দেখে ক্লান্ত না হলে তুলি ধরা যায় না। বললেন, দুর্গের পেছনে থাকে কিছু চিরস্মরণীয় লোকের অবদান; তখন আর বসে থাকা চলে না, দাঁড়িয়ে পড়তে হয়। তাই দিল্লী ছেড়ে সোজা চিতোরগড় এসে দাঁড়িয়ে পড়লাম—বশিষ্ঠ হাসল। হেসে, চোখে একটু ভঙ্গিমার ঈষৎ আলো ছড়িয়ে বলল—এবং তোমাকেও জোর করে নিয়ে এলাম, কেমন?
—ঐতিহাসিক স্থানগুলিতে এলে আমারও নবজন্ম ঘটে। কোনকালেই আমি তার আকর্ষণ কাটিয়ে উঠতে পারলাম না। তবে এবার আপনার দৃষ্টিতে দুর্গটাকে দেখব, তাই দুর্গের চেয়ে আপনার দিকে চোখ রাখছি বেশী—।
—ওটি কোর না, ঠকবে। তোমরা বিদুষী—আমি আনপড়। উল্টোপাল্টা কথা বলি বলে সবটাই যে গ্রহণযোগ্য—তা কিন্তু নয়।
বশিষ্ঠ নিবেদিতাকে অনেক ভোরে তুলে দিয়েছে। ডাকবাংলোতে তখন অন্ধকার। চারিদিকের বড় বড় গাছে তখনও রাতের ছায়া।
নিবেদিতা বলল—এখনও অন্ধকার, এখনই কি চিতোরগড়ে যাবেন?
—হ্যাঁ, তৈরী হয়ে নাও। ভোরের প্রথম আলোয় চিতোরগড় কেমন দেখায়, একবার দেখতে চাই।
ওরা যখন বাইরে এল, তখনও ভোরের আলো ফোটেনি। এই সময়ে কেউ গড়ে যেতে চায় স্কুটারওয়ালা বোঝেনি, তাই পঁয়ত্রিশ টাকা হাঁকাল। বলল—এখন ফেরার লোক পাব না, বাবু।
—পঁচিশ টাকা দেব, চল্।
স্কুটারওয়ালা তাতেই রাজি।
আকাশের দিকে নজর করে বশিষ্ঠ বলল—যা গোল পাকাচ্ছে আকাশ, হয়তো সূর্য্যের মুখ দেখতে পাব না।
নিবেদিতা হাসছিল। বলল—কি আছে বরাতে, চলুন দেখেই আসা যাক।
—বেলায় আবার যাব। সুতরাং এখন যদি কিছু দেখতে নাও পাই, দুঃখ থাকবে না।
দু-একটি লোক দুর্গ থেকে নামছে, কেউ-বা উপরে উঠছে। সারা চিতোরগড় তখনও ঘুমিয়ে।
খুব তাড়াতাড়ি দুর্গে পৌঁছে গেল ওরা। হালকা রূপোলী আলো দুর্গের প্রাকারে ছড়িয়ে আছে। স্কুটারটা থামল কালিকা মন্দিরের সামনে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। মন্দিরের দুয়ার বন্ধ। একটি লোক মন্দিরের দোরে শুয়ে ছিল; আওয়াজ পেয়ে উঠে পড়ল। বশিষ্ঠ দূরে তাকিয়ে রইল। সামনে একটা পুকুর। দু-একজন মহিলা ও পুরুষ স্নান করছে। সূর্য ওঠার লক্ষণ নেই। মেঘের ফাঁকে সূর্য্যের কৃপণ সিঁদুরে আভা। নিবেদিতা ঠাট্টা করল—পঁচিশ টাকা জলে গেল তো?
বশিষ্ঠ বলল—কেন, যেটুকু আলো পাচ্ছ—তাতে তো তোমার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। একেবারে বৃথা গেল, বলি কি করে?
নিবেদিতা কালচে ব্রাউন রঙের একটা ঘাঘরা পরেছে, তাতে মাঝে মাঝে নীল রঙের ছোপ। আকাশী ওড়না। হাতে রাজস্থানী চুড়ি, বালা। পায়ে নাগরা জুতো।
বশিষ্ঠ প্রস্তাব করল—পুকুরে স্নান করবে কিনা দেখ, টলটলে জল।
—রক্ষে করুন। দেখা শেষ হলে, চলব।
ওরা পদ্মিনী প্রাসাদে এল। সূর্য মেঘের ফাঁকে একটুখানি ঝাঁপ তুলেছে। সেদিকে তাকিয়ে বশিষ্ঠ বলল—দেখ, এটুকু রঙ, তাতেই পদ্মিনীর যেন রূপ খুলে গেল।
—ঐতিহাসিকদের অনেকের বক্তব্য, নিবেদিতা না বলে থাকতে পারল না, যে পদ্মিনী বলে কেউ ছিল না, সবটাই কিংবদন্তী, বানান ব্যাপার।
বশিষ্ঠ কথাটা ঠিক মেনে নিতে পারল না। বলল—ইতিহাসবেত্তাদের কারুর কারুর একটু বাড়াবাড়ি আছে। পদ্মিনীর রূপে মুগ্ধ হয়ে আলাউদ্দিন খিলজি চিতোর আক্রমণ করেছিল—এটা ভাবতে যেন অনেকেরই কষ্ট হয়। তাই ব্যাপারটাকে কিংবদন্তী বলে চালাতে চায়। আলাউদ্দিন খিলজির অনেক বদনাম আছে। কিছু সত্য, কিছু সত্য নয়। কিন্তু পদ্মিনীর প্রেমে পড়ার মনুষ্যোচিত দুর্বলতা, আমার মনে হয়, সেটাই বোধহয় আলাউদ্দিনের বড় পরিচয়।
এরপর আগামী সংখ্যায়