
ডোনাল্ড ট্রাম্পের তর্জন-গর্জন নতুন কিছু নয়, কিন্তু এবার তিনি সব সীমা অতিক্রম করেছেন। ইরানকে উদ্দেশ্য করে তাঁর 'Civilization will die tonight'—এই চরম অমানবিক এবং ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্যটি কেবল একটি রাজনৈতিক হুমকি নয়, বরং এটি একবিংশ শতাব্দীর নয়া-সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। একজন রাষ্ট্রনেতা কীভাবে একটি প্রাচীন সভ্যতাকে স্রেফ রাতারাতি ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার কথা বলেন, তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়।
ট্রাম্পের এই মরণকামড়ের আসল লক্ষ্য কিন্তু মানবাধিকার নয়, বরং বিশ্ব তেলের বাজারের নিয়ন্ত্রণ। হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি গ্যালন জ্বালানি যাতায়াত করে। ইরান সেই রাস্তা বন্ধ করার উপক্রম করতেই আমেরিকার গাত্রদাহ শুরু হয়েছে। সোজা কথায়, ট্রাম্পের কাছে মানুষের রক্তের চেয়ে তেলের দাম অনেক বেশি।
ইরানকে 'প্রস্তর যুগে' পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অর্থ হল দেশটির শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে গুঁড়িয়ে দেওয়া। ট্রাম্পের এই মানসিকতা আসলে মধ্যযুগীয় বর্বরতার আধুনিক সংস্করণ। বেসামরিক পরিকাঠামো ধ্বংস করার এই প্রকাশ্য ঘোষণা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শনেরই নামান্তর।
পাকিস্তান ও ওমানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যে যুদ্ধবিরতি তিনি দিয়েছেন, তা আসলে একটি ফাঁদ। ইরানকে মানসিকভাবে পিছু হঠতে বাধ্য করার এবং অভ্যন্তরীণ চাপ তৈরি করার এ এক কুৎসিত কৌশল। ট্রাম্প খুব ভালো করেই জানেন, বিশ্ব অর্থনীতি সাম্প্রতিক এই অস্থিরতায় ধুঁকছে, আর সেই সুযোগটাই তিনি নিচ্ছেন।
আমেরিকার তরফে ট্রাম্প যখন একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার কথা বলেন, তখন রাষ্ট্রসংঘ বা তথাকথিত মানবতাবাদী দেশগুলোর নীরবতা নিছক দুর্বলতা ছাড়া কিছুই নয়। ইরান আজ যে রাজনৈতিক কোণঠাসা অবস্থার শিকার, তার নেপথ্যে আমেরিকার কয়েক দশকের ধারাবাহিক বিদ্বেষ কাজ করছে। ট্রাম্পের এই 'আক্রমণাত্মক' দাবার চাল যদি সফল হয়, তবে পৃথিবী কেবল এক অস্থির জ্বালানি সংকটে পড়বে না, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে 'জোর যার মুলুক তার'—এই আদিম নিয়মটিই স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। ইরানকে নিয়ে এই তাঁর এই মারণখেলা যদি বন্ধ না হয়, তবে আগুনের আঁচ কিন্তু ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসেও পৌঁছাতে দেরি হবে না। এবং একই সঙ্গে সেই আঁচ তোলপাড় করে দেবে সারা বিশ্ব পরিস্থিতিকেই।