
রবীন্দ্রনাথ কোনদিন ছবি তুলেছেন এমন কোন প্রমাণ আমি পাইনি।তবে তিনি ফোটোগ্রাফি চর্চায় অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। তিনি ভালো করে জানতেন ফোটোগ্রাফে যে ইতিহাস ধরা থাকে তা নতুন করে লেখা যায় না।দেখা যাক ফোটোগ্রাফি চর্চায় রাবীন্দ্রিক ভাবনা।" ছিন্নপত্রতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- " কারও কারও মন ফোটোগ্রাফের wet plate এর মতো,যে ছবিটা ওঠে সেটাকে তখনই ফুটিয়ে কাগজে না ছাপিয়ে নিলে নষ্ট হয়ে যায়। " ওয়েট প্লেট ও ড্রাই প্লেটের ব্যবহার সম্পর্কে কবির উবাচ প্রমান করে ফোটোগ্রাফি সম্পর্কে তিনি পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন। পোজ যে ভালো ছবির অঙ্গ তা কবি ভালো করে জানতেন। কবির একাধিক ছবিতে দেওয়া পোজ তা প্রমাণ করে। সৈয়দ মুজতবা আলী এই বিষয়ে একটি ছোট ঘটনার উল্লেখ করেছেন যা প্রমাণ করে, কবি পোজ সম্পর্কে কতটা সচেতন ছিলেন। একবার মুজতবা আলী শান্তিনিকেতনে কবির কাছে উপস্থিত হলে কবি তাঁর জামার পকেটে ছোট্র ক্যামেরা লক্ষ্য করে বলেন-" ছবি তোলার মতলব নিয়ে এসেছিলি বুঝি। তোল,তোল। ওরে সুধাকান্ত, পরদাগুলো সরিয়ে দে তো। কি রকম বসব বল।----অন্যেরা বড় জ্বালাতন করে; এরকম করে বসুন, ওরকম করে বসুন। কত কী!"
রবীন্দ্রনাথ ছবি তোলার অনুকূল আবহাওয়া ,পোজ ইত্যাদি বিষয়ে যেমন সচেতন ছিলেন তেমনি ফোটোগ্রাফির পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত 'ভান্ডার 'পত্রিকাতে মহিমচন্দ্র ঠাকুরের নিবন্ধ 'শৌখিন ফটোগ্রাফি' প্রকাশিত হয়, 'প্রবাসী' তে প্রকাশিত হয় উপেন্দ্রকিশোরের ' ফটোগ্রাফির চর্চা' প্রবন্ধ, ঠাকুর বাড়ির বংশধর আর্যকুমার চৌধুরীর ' ক্যামেরার দ্বারা বিবিধ মনোভাবের প্রকাশ ' ও ' ফোটোগ্রাফির সাহায্যে সৌন্দর্য আবিষ্কার ' এই দুটি প্রবন্ধ আর সুকুমার রায়ের 'ফোটোগ্রাফী' প্রবন্ধ।' উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী, যাঁকে রবীন্দ্রনাথ ' শিশু সাহিত্যের ভগীরথ" বলে আখ্যায়িত করেন, তাঁর 'ফোটো মেকানিক্যাল ' পদ্ধতি সংক্রান্ত ক্যামেরার কাজ যখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়, তখন দেশের মানুষ ছিলেন উদাসীন। উচ্ছ্বসিত রবীন্দ্রনাথ ' ভারতী' পত্রিকায় উপেন্দ্রকিশোরের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি ' ভারতী 'তে ঠিক কী লিখেছেন পড়ে নেওয়া যাক- " অনেকেই হয়ত জানেন না ,হাফটোন লিপি সম্বন্ধে উপেন্দ্রবাবুর নিজের আবিষ্কৃত বিশেষ সংস্কৃত পদ্ধতি বিলাতের শিল্পী সমাজে খ্যাতিলাভ করিয়াছে,----তিনিই বাঙালির মধ্যে প্রথম নিজ চেষ্টায় হাফটোন শিক্ষা করেন এবং অল্পকালের মধ্যেই তাহার সংস্কার সাধনে কৃতকার্য্য হন। ভারতবর্ষের প্রতিকূল জলবায়ু এবং সর্বপ্রকার পরামর্শ ও সহায়তার অভাব সত্বেও এই নতুন শিল্পবিদ্যা আয়ত্ব এবং তাহাকে সংস্কৃত করিতে যে পরিমাণ অধ্যবসায় ও মানসিক ক্ষমতার প্রয়োজন তাহা অব্যবসায়ীর পক্ষে মনে আনাই কঠিন। "
ফোটোগ্রাফি চর্চা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতার এর চাইতে বড় দৃষ্টান্ত আর কিছু হতে পারে না। এক লেখা ও রেখার জাদুকর আরেক লেখা ও রেখার জাদুকরকে কুর্ণিশ জানাচ্ছেন। উপেন্দ্রকিশোরের সুযোগ্য সন্তান সুকুমার রায়, যাঁকে রবীন্দ্রনাথ 'আমার যুবক বন্ধু ' বলেছেন, ফটোগ্রাফিতে তাঁর সুকুমার বৃত্তির প্রতিফলন ঘটিয়েছেন । রবীন্দ্রনাথ সুকুমার রায়ের এই গুণকে সম্মান জানিয়েছেন। স্বদেশী আন্দোলনের সময় ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথের দৃপ্ত ভঙ্গীর ছবি সুকুমার রায়ই লেন্সে ধরে রেখেছেন। এখানেই শেষ নয়। ১৯১১ সালে পুজোর আগে 'মডার্ন রিভিউ ' ও 'প্রবাসী 'পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের পঞ্চাশ বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে সুকুমার রায়ের তোলা
রবীন্দ্রনাথের আলোকচিত্র প্রকাশিত হয় । নিজের এত ছবি দেখে রবীন্দ্রনাথ লজ্জিত বোধ করে 'প্রবাসী 'র সঙ্গে যুক্ত চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠিতে জানান-"দোহাই তোমাদের আমার মৃত্যুর পূর্বে আর আমার ছবি বের করো না।"
'ভারতী তে প্রকাশিত 'ক্যামেরার দ্বারা বিবিধ মনোভাবের প্রকাশ ' প্রবন্ধে আর্যকুমার চৌধুরী কবির লেখনী,চিত্রকরের তুলির সঙ্গে আলোকচিত্রকরের ক্যামেরার তুলনা করেছেন। সেই তুলনার সূত্র ধরে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের কলমই ছিল আলোকচিত্রীর ক্যামেরার সমতুল্য। সেই কলমের সাহায্যে তিনি ' জীবন স্মৃতি 'তে শ্রীকন্ঠ বাবুর সঙ্গে ইংরেজি ছবিওয়ালার দোকানে ছবি তুলতে যাওয়ার ছবি এঁকেছেন। তিনি তাঁর চিঠিপত্রে ও উপন্যাসে ছবি তোলার প্রসঙ্গ অল্পবিস্তর আলোচনা করেছেন। ১৮৯৪ /৯৫ সাল নাগাদ গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে লেখা একটি চিঠিতে ফোটোগ্রাফি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ ধরা পড়েছে-"একবার এখানে ( শিলাইদহে ) আসতে পারতে যদি ছবি নেবার ঢের জিনিস পেতে।শীতের সময় একবার আসতে পার-তাহলে আমাদের জমিদারী illustrated হয়ে যায়।" উপন্যাসেও কোন কোন জায়গায় ফোটোগ্রাফির উল্লেখ আছে। আছে আংশিক আলোচনাও। যেমন ধরুন ' যোগাযোগ ' উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- "বিপ্রদাসের ফোটোগ্রাফ তোলার শখ। কুমুও তাই শিখে নিল। ওরা কেউ বা নেয় ছবি,কেউ বা সেটাকে ফুটিয়ে তোলে।" রবীন্দ্রনাথ সব ছবিতে নতুন বৌঠানের মুখ খুঁজে পেলেও কুমুদিনীর মধ্যে পেয়েছিলেন জ্ঞানদানন্দিনীর ছায়া। সিদ্ধান্ত ঘোষ যথার্থই অনুমান করেছেন-" সম্ভবত ফোটোগ্রাফার জ্ঞানদানন্দিনীর কাজের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন বলেই কুমুদিনীকে কলকাতায় আনার পর তার হাতে তিনি ক্যামেরা তুলে দিতে পেরেছিলেন নির্দ্বিধায়। "চোখের বালি'"তে ছবি তোলাকে কেন্দ্র করেই রবীন্দ্রনাথ নবদম্পতি আশা ও মহেন্দ্রের মধ্যে তৃতীয় পক্ষের আগমন ঘটিয়েছেন-" হঠাৎ মহেন্দ্রের ফোটোগ্রাফ অভ্যাসের শখ চাপিল। পূর্বে সে একবার ফোটোগ্রাফি শিখিতে আরম্ভ করিয়া ছাড়িয়া দিয়াছিল।এখন আবার ক্যামেরা মেরামত করিয়া আরক কিনিয়া ছবি তুলিতে শুরু করিল।বাড়ির চাকর-বেহারাদের পর্যন্ত ছবি তুলিতে লাগিল।" বলা বাহুল্য, এই মহেন্দ্রের মধ্যে আমরা ফোটোগ্রাফার গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে খুঁজে পাই।গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন ফোটোগ্রাফি চর্চায় হাত পাকানো শুরু করেন, তখন সামনে যাকে পেয়েছিলেন তারই ছবি তুলেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ' ঠাকুর বাড়ির অন্দরমহল' এ পেয়েছিলেন ফটোগ্রাফার জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আর পুত্র রথীন্দ্রনাথকে। আর তাঁর ' ঠাকুর বাড়ির বাহিরমহল' এ তাঁর দোসর ছিল দুই জগৎ বিখ্যাত পিতাপুত্র- উপেন্দ্রকিশোর ও সুকুমার। রবীন্দ্রনাথের নিজের হাতে তোলা কোন ছবি পাওয়া যায় না। এটা প্রথম বিস্ময়। বলা হয়ে থাকে, রবীন্দ্রনাথ যা লিখেছেন তা এক জীবনে পড়ে শেষ করা হারকিউলিয়্যান টাস্ক। অথচ তিনি ফোটোগ্রাফি বিষয়ে কোন প্রবন্ধ লিখলেন না। এটা দ্বিতীয় বিস্ময়।