তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
উত্তর-আধুনিক সত্যজিৎ

বিংশ শতাব্দীর বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সত্যজিৎ রায় এক অনন্য ধ্রুবতারা। সাধারণত তাঁকে 'ক্লাসিক্যাল মডার্নিস্ট' বা ধ্রুপদী আধুনিকতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাঁর ছবিতে রেনেসাঁস-সুলভ যুক্তিবাদ, পরিমিতিবোধ এবং একটি সুসংগত জীবনদর্শন কাজ করে। তবে একবিংশ শতাব্দীর উত্তর-আধুনিক বা পোস্ট মডার্ন সময়ে দাঁড়িয়ে যখন আমরা সত্যজিৎকে নতুন করে পাঠ করি, তখন তাঁর সৃষ্টির গভীরে এমন কিছু স্তর উন্মোচিত হয়, যা আধুনিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে উত্তর-আধুনিক সংশয়বাদ, বিনির্মাণ এবং বহুস্বরিকতাকে স্পর্শ করে।

আধুনিকতাবাদ বিশ্বাস করে একটি নির্দিষ্ট 'সত্য' বা 'গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ'-এ। সত্যজিতের প্রথম দিকের কাজ, যেমন 'অপু ট্রিলজি', মূলত এক ধ্রুপদী আধুনিকতাবাদী আখ্যান। সেখানে জীবনের এক যাত্রা আছে, বিবর্তন আছে এবং শেষে এক ধরণের উত্তরণ আছে। কিন্তু উত্তর-আধুনিকতাবাদ এই সুনির্দিষ্ট গন্তব্য বা ধ্রুব সত্যকে অস্বীকার করে। উত্তর-আধুনিক সময়ে সত্যজিৎকে বিচার করতে গেলে আমাদের দেখতে হবে তিনি কীভাবে ধীরে ধীরে সেই সুসংগত জগৎ থেকে সরে এসে ভাঙন, অনিশ্চয়তা এবং নৈতিক দ্ব্যর্থতাকে গ্রহণ করেছিলেন। 'প্রতিদ্বন্দ্বী' বা 'জন অরণ্য'-র মতো কলকাতা ট্রিলজিতে তিনি যে নৈরাজ্য দেখিয়েছেন, তা আধুনিকতার আদর্শবাদের চেয়ে উত্তর-আধুনিক খণ্ডিত বাস্তবতার বেশি কাছাকাছি।

উত্তর-আধুনিক শিল্পের অন্যতম লক্ষণ হল 'মেটা-ফিকশন' বা শিল্প যখন নিজের মাধ্যম সম্পর্কে সচেতন থাকে। সত্যজিৎ রায়ের 'নায়ক' (১৯৬৬) ছবিটিকে এই দিক থেকে একটি মাইলফলক বলা যায়। এই ছবিতে একজন চলচ্চিত্র তারকা যখন তাঁর জীবনের অতীত স্মৃতি রোমন্থন করেন, তখন সেখানে বাস্তবতা এবং ফ্যান্টাসি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ট্রেনের কামরায় অরিন্দম মুখার্জির স্বপ্নদৃশ্যগুলো—যেখানে টাকার পাহাড়ে তিনি ডুবে যাচ্ছেন—তা উত্তর-আধুনিক মনস্তত্ত্বের এক গভীর প্রতিফলন। এখানে রৈখিক আখ্যান ভেঙে টুকরো টুকরো স্মৃতি ও ভয়ের কোলাজ তৈরি হয়।

উত্তর-আধুনিক চিন্তায় ইতিহাস কোনো স্থির দলিল নয়, বরং এটি একটি বিনির্মাণের বিষয়। 'শতরঞ্জ কে খিলাড়ি' ছবিতে সত্যজিৎ যেভাবে সিপাহী বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটকে ব্যবহার করেছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বৃহৎ ইতিহাস বা গ্র্যান্ড ইতিহাসের বদলে তিনি জোর দিয়েছেন দুই দাবাড়ুর ব্যক্তিগত আসক্তির ওপর। যখন ব্রিটিশরা অযোধ্যা দখল করছে, তখন কুশীলবরা দাবার ছকে মগ্ন। এই যে চরম বাস্তবতার মুখে ব্যক্তিগত অবসরকে গুরুত্ব দেওয়া, এটি উত্তর-আধুনিক জীবনবোধেরই একটি প্রকাশ। এখানে ইতিহাসকে তিনি কেবল করুণ রস বা বীরত্বে সাজাননি, বরং এক ধরণের ব্যঙ্গ বা শ্লেষের মিশেলে উপস্থাপন করেছেন।

এক শিল্পের সঙ্গে অন্য শিল্পের সংলাপ বা ইন্টারটেক্সুয়ালিটি উত্তর-আধুনিকতার প্রধান স্তম্ভ। সত্যজিতের ছবিগুলোতে এই প্রবণতা অত্যন্ত প্রবল। তিনি যখন বিভূতিভূষণ, রবীন্দ্রনাথ বা তারাশঙ্করের লেখা নিয়ে কাজ করছেন, তখন তিনি কেবল অনুবাদ করছেন না, বরং নিজের সমকালীন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে মূল টেক্সটকে 'রি-রাইট' করছেন। রবীন্দ্রনাথের 'নষ্টনীড়' গল্পের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও 'চারুলতা' ছবিতে সত্যজিৎ যে সূক্ষ্ম দৃশ্যকাব্য তৈরি করেছেন (যেমন সেই বিখ্যাত দূরবীন ব্যবহারের দৃশ্য), তা শব্দের চেয়ে চাক্ষুষ প্রতীকের মাধ্যমে নতুন এক পাঠ তৈরি করে। এটি মূল টেক্সটের একটি আধুনিক তথা উত্তর-আধুনিক ব্যাখ্যা।

উত্তর-আধুনিক মানুষ মূলত বিচ্ছিন্ন। সত্যজিতের সত্তরের দশকের ছবিগুলোতে এই বিচ্ছিন্নতা এক চরম আকার ধারণ করে। শহরের চার বন্ধু যখন জঙ্গলে বেড়াতে যায়, তখন তাদের প্রথাগত মুখোশগুলো খুলে পড়ে। তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, আদিবাসী তরুণীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিজেদের ভেতরের শূন্যতা—সবই উত্তর-আধুনিক বিচ্ছিন্নতাবোধের পরিচয় দেয়। এখানে মূল্যবোধের যে অবক্ষয় দেখানো হয়েছে, যেখানে শেষ পর্যন্ত সোমনাথ নিজের বোনকে ব্যবহার করে দালালি করতে বাধ্য হয়, তা আধুনিকতার নৈতিকতাকে চুরমার করে দেয়। এই অন্ধকার ও নিরাশা উত্তর-আধুনিক জগতের এক ক্রূর সত্য।

সত্যজিতের শেষ ছবি 'আগন্তুক' (১৯৯১)-কে অনেকে তাঁর 'ফিল্মিক উইল' বা উইলনামা বলে মনে করেন। এই ছবির মনমোহন মিত্র চরিত্রটি সরাসরি আধুনিক 'সভ্যতা'র ভিত নাড়িয়ে দেয়। মনমোহন মিত্র যখন জিজ্ঞেস করেন, 'তোমরা যেটাকে সভ্যতা বলছ, সেটাই কি চরম সত্য?' তখন তিনি আসলে আধুনিকতাবাদের অহংকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। আদিবাসীদের নৃত্য এবং তাদের জীবনযাত্রাকে আধুনিক শহুরে জীবনের চেয়ে উন্নত বা শুদ্ধ হিসেবে দেখানো উত্তর-আধুনিক নৃতাত্ত্বিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। এখানে কোনো একটি সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠ না মেনে বহু সংস্কৃতির সহাবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

উত্তর-আধুনিক নারীবাদী আলোচনার নিরিখে সত্যজিতের নারী চরিত্ররা আজও গবেষণার বিষয়। তারা কেবল পরিবারের প্রয়োজনে কাজ করছে না, বরং কাজের মাধ্যমে নিজের আত্মপরিচয় খুঁজে পাচ্ছে। ছবির শেষে যখন সে এবং তার স্বামী দুজনেই বেকার হয়ে রাস্তায় দাঁড়ায়, তখন তাদের সমান্তরাল অবস্থানটি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণকে নির্দেশ করে। রাজনীতির অন্দরমহল এবং বাইরের জগতের টানাপোড়েনে বিমলার যে বিবর্তন, তা অত্যন্ত জটিল। এখানে দেশপ্রেমের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে নৈতিক পছন্দ এবং ব্যক্তিগত সততা।

উত্তর-আধুনিক শিল্পে অলঙ্করণের চেয়ে মূল নির্যাস বা 'Minimalism' অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পায়। সত্যজিৎ তাঁর কেরিয়ারের শুরুতে যে বিশদ দৃশ্যসজ্জা (যেমন 'জলসাঘর') ব্যবহার করতেন, শেষ জীবনে এসে তিনি অনেক বেশি ঘরোয়া বা ইনডোর-ভিত্তিক ছবিতে মনোনিবেশ করেন (যেমন 'শাখা-প্রশাখা')। এই শৈলীগত পরিবর্তন নির্দেশ করে যে, তিনি বাইরের জগতের চেয়ে ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক ভাঙনকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিলেন।

সত্যজিৎ রায় আজীবন নিজেকে আধুনিকতাবাদী বললেও, তাঁর কাজের গভীরতা এবং বিবর্তন তাঁকে উত্তর-আধুনিক সময়ের এক প্রধান দার্শনিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। তিনি জানতেন যে সত্য একক নয়, তা বহুমাত্রিক। তাঁর ছবিতে যেমন লজিক বা যুক্তি আছে, তেমনই আছে মানুষের অযৌক্তিক আচরণের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ। আজকের 'পোস্ট-ট্রুথ' বা উত্তর-সত্যের যুগে দাঁড়িয়ে সত্যজিতের সিনেমা আমাদের শেখায় কীভাবে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, কীভাবে প্রতিষ্ঠানকে চ্যালেঞ্জ করতে হয় এবং কীভাবে নিজের শেকড় খুঁজে পেতে হয়। তাঁর সিনেমা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা চিরকালই 'সমকালীন' হিসেবে থেকে যাবে।


Scroll to Top