
যেকোনো নির্বাচনে, মানুষ কীভাবে ভোট দেয় তার পেছনে কখনোই শুধু একটি কারণ থাকে না। সময়ের সাথে সাথে একাধিক শক্তি একসাথে কাজ করে। পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা প্রায় দশ কোটি, যার মধ্যে প্রায় ছয় কোটি ভোটার। গত দুবছরে আমি রাজ্যের প্রায় প্রতিটি জেলায় ঘুরেছি। সেই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে, একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠতে শুরু করেছে। মমতার এই বিপর্যয়ের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। সবচেয়ে দৃশ্যমান কারণটি ছিল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সরকার-বিরোধী মনোভাব। পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকা অনিবার্যভাবে বিরাগ তৈরি করেছিল। প্রকৃতিরই নিয়ম এই উত্থান পতন। এই বিষয়টি আমি জেলাজুড়ে ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্য করেছি: স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উত্থান। অনেক জায়গায়, 'গুণ্ডাদের' দল রাজনৈতিকভাবে সুরক্ষিত শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। তারা প্রায়ই ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করত এবং ধীরে ধীরে তোলাবাজির সংস্কৃতি শেকড় গেড়ে বসে। বিশেষ করে রিয়েল এস্টেটের মতো ক্ষেত্রগুলিতে বেশি ছিল; বালি থেকে শুরু করে সিমেন্ট পর্যন্ত সবকিছুই একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে গিয়েছিল। অনেকের জন্য এই ব্যবস্থাটি জীবিকায় পরিণত হয়েছিল। সাধারণ মানুষকে শুধু স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের নয়, কিছু ক্ষেত্রে এমনকি পুলিশকেও ‘তোলা’ দিতে হতো। ছোট ছোট দলীয় কার্যালয়গুলো প্রায়শই স্থানীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, যেখানে ক্ষমতার দালাল হিসেবে কাজ করত ছোট নেতারা। এমনকি ই-রিকশা চালানোর মতো দৈনন্দিন কাজও এই লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। অনেক চালক, যাদের রেজিস্ট্রেশন ছিল না, তারা গাড়ি চালানোর জন্য স্থানীয় মধ্যস্থতাকারীদের টাকা দিত। আর একবার এই ধরনের ব্যবস্থা গেড়ে বসলে, সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ করা কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষ সহ্য করত, কিন্তু এর থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ক্রমশ বাড়ছিল। সুশীল সমাজের একাংশের মোহভঙ্গ হয়েছিল আগেই। এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিল শিক্ষা কেলেঙ্কারির প্রভাব, যা জনমতকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। অতীতে এই গোষ্ঠীটি কংগ্রেসকে সমর্থন করে এসেছে। তারা সাধারণত বামের বিরুদ্ধে ছিল, পরে সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রামের মতো আন্দোলনের সময় তৃণমূলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। মমতা সেই অসন্তোষের রাজনৈতিক প্রবক্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, বিশেষ করে টাটা প্রকল্পের প্রস্থানের মতো শিল্পক্ষেত্রে নানা বিপর্যয়ের পর, সেই আস্থা আবার ক্ষয় হতে শুরু করে। এই ক্ষয় ভবানীপুরের মতো অভিজাত এবং রাজনৈতিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ নির্বাচনী এলাকাগুলিতে দৃশ্যমান ছিল। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি এবং সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের মতো নেতারা একসময় এখান থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। শুভেন্দু অধিকারীর ভূমিকাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অভিজাত শহুরে পরিবার থেকে না এসেও, তিনি একটি শক্তিশালী এবং বিশ্বাসযোগ্য মুখ হিসেবে আবির্ভূত হন, বিশেষ করে হিন্দু ভোট একত্রিত করার ক্ষেত্রে। এটি আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে নিয়ে যায়: ধর্মীয় মেরুকরণ। ঐতিহ্যগতভাবে, মুসলিম ভোটাররা মমতা ব্যানার্জিকে জোরালোভাবে সমর্থন করে এসেছেন। প্রত্যাশা ছিল যে এই ধারা অব্যাহত থাকবে, বিশেষ করে মোদি এবং অমিত শাহের অধীনে জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতি নিয়ে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগের কারণে। বিজেপির প্রচার কৌশল মেরুকরণকে আরও তীব্র করে তোলে। এর জবাবে মমতা ধর্মীয় প্রচার, মন্দির তৈরি এবং বাঙালি সংস্কৃতির নানা প্রতীক ব্যবহারের মাধ্যমে একটি ভারসাম্য আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেসব খুব একটা কাজে দেয়নি।তাছাড়া, বিজেপি হিন্দু ভোটারদের একটি বড় অংশকে নিজেদের পক্ষে আনতে সক্ষম হয়েছিল। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এমন একটি ধারণাও ছিল যে, আইনশৃঙ্খলার মতো বিষয় জড়িত থাকলেও রাজ্য সরকার নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর প্রতি অতিরিক্ত নমনীয়। এই ধারণাটি সঠিক হোক বা না হোক, নির্বাচনে এর প্রভাব পড়েছিল।
পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো শিক্ষা। এই ক্ষেত্রটিতে বছরের পর বছর ধরে অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ দেখা গেছে, যার ফলস্বরূপ দুর্নীতির প্রবেশ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায়, বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগে, গুরুতর অনিয়ম ঘটেছে। এমন নয় যে এর প্রভাব আগে ছিল না, কিন্তু গত নির্বাচনে তা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল না। এবার এর প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এছাড়াও, বিজেপির সাংগঠনিক ক্ষমতা বেশ দুর্বল ছিল। সেই কারণে, দলটি কার্যকরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে বা মাঠ পর্যায়ে তাদের ইস্যুগুলো তুলে ধরতে পারেনি। তবে এবার বিজেপি তার সাংগঠনিক কাঠামোকে যথেষ্ট শক্তিশালী করেছে। আরএসএস-এর সঙ্গে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। সুনীল বনসাল এবং অমিত মালব্যর মতো নেতারা প্রচারের কৌশল নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বস্তুত, যেখানে দলটি আগে বুথ এজেন্ট নিয়োগ করতে হিমশিম খেত, সেখানে এবার তারা আরও পেশাদারী পন্থা অবলম্বন করেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়াটি একটি সংগঠিত পদ্ধতিতে, প্রায় একটি আনুষ্ঠানিক বাছাই প্রক্রিয়ার মতো করে সম্পন্ন করা হয়েছে, যেখানে যথাযথ যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়নের পর তরুণ-তরুণীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে, যে বুথগুলো আগে কর্মীশূন্য থাকত, সেখানে এবার কর্মী উপস্থিত ছিল। এই শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামোর কারণে, যে অসন্তোষ আগে ভোটে রূপান্তরিত হয়নি, বিশেষ করে শিক্ষা খাত নিয়ে, তা এখন ব্যালট বাক্সে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থার ক্রমাবনতিশীল নিয়েও ব্যাপক অসন্তোষ দেখা গেছে। এমনকি রাজ্যপালও একাধিকবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এই সবকিছুই জনগণের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশার জন্ম দিয়েছিল।
পরবর্তী প্রধান বিষয়টি হলো শিল্পবিমুখতা। টাটা প্রকল্প সরে যাওয়ার পর থেকে রাজ্যে বৃহৎ শিল্প স্থাপনে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিজিবিএস সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে, বড় বড় ঘোষণা হয়েছে, কিছু প্রস্তাবও এসেছিল, কিন্তু বাস্তবে সেগুলোর খুব কমই উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে। অনেক বড় শিল্পপতি প্রথমে আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত সরে যান। ফলস্বরূপ, রাজ্যে শিল্প বৃদ্ধিতে ক্রমাগত পতন দেখা গেছে। যার ফলে কর্মসংস্থান কমেছে এবং অর্থনৈতিক অসন্তোষ বেড়েছে, যা নির্বাচনী ফলাফলের পেছনের কারণগুলোতে আরেকটি মাত্রা যোগ করেছে। পরিশেষে, কাঠামোগত কারণগুলোও বড় ভূমিকা পালন করেছে। বিজেপি মনে করে, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো প্রক্রিয়াগুলো (এস আই আর) বিশেষ করে সীমান্ত জেলাগুলোতে ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে। শেষে বলা যায়, কোনও একটি কারণ নয় বরং নানা কারণের সম্মিলিত ধাক্কায় রাজ্যে পট পরিবর্তন ঘটল। একটিমাত্র ভুলের কারণে মমতা ব্যানার্জি পথভ্রষ্ট হননি। বিজেপির কৌশলগত উত্থানের সম্মিলিত প্রভাব এবং তার সঙ্গে মমতার নেওয়া একাধিক পদক্ষেপ, যার কিছু ছিল ধীরে ধীরে এবং কিছু আকস্মিক—গেরুয়া ঝড়ে ঢেকে দিল পশ্চিমবঙ্গের আকাশ।