'
অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎকারে বাংলা স্ট্রিট-এর সম্পাদক আশিস পন্ডিতকে জানালেন সিপিআইএম পলিটব্যুরো সদস্য কেরলের এল ডি এফ নেতা ভিজু কৃষ্ণণ

বাংলা স্ট্রিট : কেরলে এখন মানুষের পালস কেমন বুঝছেন?
ভি. কৃষ্ণণ : দেখুন, বর্তমান সরকারের অধীনে গত ১০ বছর ধরে অভূতপূর্ব উন্নয়ন এবং সমাজকল্যাণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এটি কেরলের প্রতিটি মানুষকে স্পর্শ করেছে। সেই আত্মবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই এলডিএফ (LDF) মানুষের কাছে ভোট চাইতে যাচ্ছে। আমরা দেখছি যে, কর্পোরেট মিডিয়া এবং বিরোধী পক্ষ মিথ্যে বয়ান ছড়ালেও মানুষের সাড়া অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। এই প্রথম দেখা যাবে যে, পরপর তৃতীয়বার কোনো সরকার এই রাজ্যে ক্ষমতায় আসছে। আমরা এই স্পন্দনই পাচ্ছি।
বাংলা স্ট্রিট: খুব ভালো। দেখুন, আমরা আগে জানতাম যে এখানে একবার ইউডিএফ (UDF) আর একবার এলডিএফ আসে, কিন্তু এলডিএফ সেটা ভুল প্রমাণ করেছে। গত দুটো টার্ম এলডিএফ সরকার। আপনি কি আশাবাদী যে এবারও সেই ধারা বজায় থাকবে?
ভি. কৃষ্ণণ : ২০১১ থেকে ২০১৬-এর সময়কাল বাদ দিলে—যা কিনা খুব সামান্য ব্যবধানে হাতছাড়া হয়েছিল—নইলে এটা টানা চতুর্থ বা পঞ্চম মেয়াদ হত। ২০০৬ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে অচ্যুতানন্দন সরকার কৃষকদের সংকট নিরসন করেছিল এবং পেনশনসহ প্রচুর সমাজকল্যাণমূলক কাজ করেছিল। তবুও আমরা খুব অল্পের জন্য ক্ষমতা ধরে রাখতে পারিনি। কিন্তু ২০১১ থেকে ২০১৬-এর মধ্যে কেরলের মানুষ দেখেছে দুর্নীতি, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে সম্পূর্ণ বিপর্যয়। রাস্তাঘাট, ব্রিজ, এমনকি সরকারি স্কুল-হাসপাতালের কী করুণ দশা হয়েছিল! এলডিএফ ক্ষমতায় আসার পর সেগুলোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা গিয়েছে। আজ সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্য খাতের মান অনন্য। এমনকি কোভিড এবং নিপা ভাইরাসের সময়ও আমাদের কাজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে।
বাংলা স্ট্রিট : কোভিডের সময় আপনারা দারুণ কাজ করেছেন, নিপা এবং বন্যার সময়ও।

ভি. কৃষ্ণণ: আর এই পুরো সময়ে, গত ১০ বছরে বিজেপি সরকার এই রাজ্যকে বিন্দুমাত্র সাহায্য করেনি। এমনকি বন্যার সময় যেটুকু সাহায্য এসেছিল, তার জন্যও তারা টাকা কেটেছে। সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার ব্যবহারের জন্য টাকা নিয়েছে, চালের জন্য টাকা নিয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো সাহায্য করতে চেয়েছিল, কিন্তু কেন্দ্র সেটাও আটকে দেয়। অথচ উত্তরাখণ্ড বা গুজরাটের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলো বিদেশ থেকে সাহায্য পেয়েছে। এভাবে কেন্দ্রীয় সরকার কেরলের মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে রাজ্যকে হয়রান করেছে। আর বিরোধী দল কংগ্রেস এ নিয়ে নীরব থেকেছে, যা আসলে কেন্দ্রের সঙ্গে তাদের যোগসাজশকেই প্রমাণ করে। গত ১০ বছর ধরে আমরা এটাই দেখছি।
তা সত্ত্বেও, এলডিএফ সরকার এখানে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। আপনি রাস্তাঘাট দেখুন, স্কুল ভবন দেখুন, হাসপাতালের বিল্ডিং দেখুন। যখন আমরা উন্নয়নের এই বিষয়গুলো বা সমাজকল্যাণের ইস্যুগুলো তুলছি, বিরোধীদের কাছে কোনো জবাব নেই।
বাংলা স্ট্রিট: একদম ঠিক।
ভি কৃষ্ণণ: আমরা এটাই দেখছি। ওদের হাতে কোনো ইস্যু নেই, তাই ওরা মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছে। এটাই এখনকার পরিস্থিতি। মানুষ এসব ধরে ফেলছে।
বাংলা স্ট্রিট: আমার শেষ তিনটে প্রশ্ন আছে। একটা ছোটো প্রশ্ন—যেখানে আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি, সেই ক্যানাডোর সাধারণভাবে দেখলে কংগ্রেস বা ইউডিএফ-এর শক্ত ঘাঁটি। এবার কি অন্যরকম কিছু ঘটার সম্ভাবনা আছে?
ভি কৃষ্ণণ: আমি এই নির্বাচনী এলাকায় সভা করেছি এবং দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীর কাছ থেকে স্পষ্ট তথ্য পেয়েছি। ইঙ্গিত এটাই যে, আমরা এই আসনটি আরও বড় ব্যবধানে ধরে রাখতে চলেছি। কালপেট্টা এবং সুলতান ব্যাটারি আসনেও আমরা জেতার জন্য লড়ছি। এটা একটা নতুন ট্রেন্ড তৈরি করবে। আর উন্নয়নের কথা যদি বলেন, ল্যান্ডস্লাইডের পর এই টাউনশিপটা দেখুন। আপনি ওখানে গিয়েছেন। এই মুহূর্তে পৃথিবীর কোথাও এমন পুনর্বাসন আপনি খুঁজে পাবেন না।
বাংলা স্ট্রিট: হ্যাঁ। আর কংগ্রেস কোথায়?
ভি. কৃষ্ণণ: ওই ভূমিধসের পর কেন্দ্রীয় সরকার বিন্দুমাত্র সাহায্য করেনি। আমরা মানুষের কাছে গিয়েছি। কেরলের মানুষ এলডিএফ সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। এলডিএফ সরকার এমন এক মডেল তৈরি করেছে যা সারা বিশ্বের কাছে উদাহরণ। আর কংগ্রেস? যারা টাকা তুলে দাবি করেছিল যে এখানে বাড়ি বানিয়ে দেবে, তারা কত টাকা তুলেছে সেই হিসেব পর্যন্ত দিতে পারছে না। অভিযোগ আছে যে তারা ওই টাকা আত্মসাৎ করেছে। এটাই কংগ্রেসের চরিত্র। মানুষ এসব দেখছে। এই কেন্দ্রে কংগ্রেস প্রার্থীর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আছে এবং ৫ জন সক্রিয় কংগ্রেস নেতা তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে আত্মহত্যা করেছেন। একসময় এই এলাকাটি কৃষক আত্মহত্যার জন্য কুখ্যাত ছিল, যার মূলে ছিল মনমোহন সিং-এর আমলের আসিয়ান (ASEAN) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। এটি বাজপেয়ী শুরু করেছিলেন, যার ফলে রাবার, গোলমরিচ, কফি এবং চায়ের দাম মুখ থুবড়ে পড়েছিল—কারণ আসিয়ান দেশগুলো থেকে সস্তা পণ্য চলে আসত। আমাদের সরকার রাবার এবং ১৬টি সবজির ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করেছে। ধানের জন্য আমরা তিন হাজার টাকা দিচ্ছি, যা এলডিএফ ইশতেহারে বাড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার করার কথা বলা হয়েছে। ভারতের আর কোথাও কৃষকদের এই পরিমাণ সহায়তা দেওয়া হয় না। ঋণ মকুব কমিশনও নিশ্চিত করেছে যাতে কৃষকদের দেনা মেটানো হয়। এর ফলে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।
বাংলা স্ট্রিট : এবার ইউডিএফ-এর প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার নিয়ে একটা কথা। রাহুল গান্ধী ২৫ লাখ টাকার চিকিৎসা সহায়তা, শিক্ষার্থীদের মাসে ১০০০ টাকা এবং বয়স্কদের ৩০০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আপনারা কি এগুলোর মোকাবিলা করতে পারবেন?
ভি কৃষ্ণণ : শুনুন, আমরা ইতিমধ্যেই কেরলের ৬২ লাখ মানুষকে ২০০০ টাকা করে বার্ধক্য ভাতা দিচ্ছি এবং আমাদের ইশতেহারে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে এটাকে ৩০০০ টাকা করা হবে। কংগ্রেসও একই রকম প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু আমি জিজ্ঞাসা করতে চাই—হিমাচল, কর্ণাটক বা তেলেঙ্গানায় তো ওদের সরকার আছে, সেখানে কি ওরা ৩০০০ টাকা দিচ্ছে? কেরলে ২০১১-১৬ সালে যখন ওরা ক্ষমতায় ছিল, তখন সমাজকল্যাণ ভাতা ছিল মাত্র ৬০০ টাকা, আর ১৮ মাস ওরা এক পয়সাও দেয়নি। আমরা সেই বকেয়া মিটিয়েছি এবং এই এপ্রিলে ৪০০০ টাকা করে দিয়েছি। এমনকি গৃহবধূ যাঁরা চাকরি করেন না, তাঁদেরও ১০০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। কেরলে স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প রয়েছে, কিন্তু লক্ষ্য করবেন—ওরা সরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে খুব কড়া কথা বলছে। বিজেপি এবং কংগ্রেস এমন দল, যারা ইলেক্টোরাল বন্ডের মাধ্যমে বড় বড় ফার্মা কোম্পানি এবং কর্পোরেট স্বাস্থ্য খাত থেকে বিপুল পরিমাণ তহবিল নিয়েছে। তাই ওরা আসলে সরকারি স্বাস্থ্য খাতকে ধ্বংস করে দিতে চায়। পেশাদার কোর্সে পড়তে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের জন্য ১০০০ টাকা দেওয়ার যে কাজ এলডিএফ সরকার ইতিমধ্যেই করেছে, ওরা শুধু সেটারই পুনরাবৃত্তি করার চেষ্টা করছে।
বাংলা স্ট্রিট: আমার শেষ প্রশ্ন—কেরলে বিজেপি কোথায়? আমি তিন দিন ধরে ঘুরছি কিন্তু কোথাও কোনো পোস্টার বা কিছুই দেখলাম না। তবুও বিজেপি ভোট পায় কী করে?
ভি কৃষ্ণণ: আসলে আপনি খুব অল্প সময় ঘুরছেন। বিজেপি প্রচুর টাকা খরচ করছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ওদের বড় বড় হোর্ডিং আছে। আমি এই মাসের ২৩ তারিখ থেকে বিভিন্ন জেলায় ঘুরছি, সেখানে ওদের উপস্থিতি আছে এবং ওরা অর্থশক্তি ব্যবহার করছে। আরএসএস তো অনেক আগে থেকেই এখানে শক্তিশালী। শুধুমাত্র বামপন্থীরা আছে বলেই আদর্শগত, রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিকভাবে ওদের দূরে রাখতে পেরেছি। আগে ওদের একটা আসন ছিল, এখন শূন্য। গত লোকসভা নির্বাচনে ত্রিশূরে কংগ্রেসের প্রায় এক লাখ ভোট বিজেপিতে চলে গিয়েছিল। সম্প্রতি তিরুবনন্তপুরম কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রায় ২১টি ওয়ার্ডে কংগ্রেস তৃতীয় স্থানে চলে গেছে এবং বিজেপি সেখানে উঠে এসেছে। অরুণাচলের মতো এখানেও এমন পঞ্চায়েত আছে যেখানে কংগ্রেস জেতার পরদিন সবাই বিজেপিতে যোগ দিয়েছে। কংগ্রেস থেকে বিজেপিতে এই রূপান্তর খুব সহজেই ঘটছে, যা কেরলের মানুষ জানে। গত ১০ বছরে কেরল সাম্প্রদায়িক হিংসা মুক্ত। পশ্চিমবঙ্গ বা ত্রিপুরার কথা ভাবুন—জ্যোতি বসুর আমলে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময়ও সেখানে সম্পূর্ণ শান্তি ছিল। কিন্তু এখন সেখানে রাম নবমীর সময় কী ধরণের হামলা হচ্ছে দেখছেন? আমরা এগুলো প্রতিহত করেছি। মানুষ বোঝে এলডিএফ মানেই শান্তি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সবার জন্য উন্নয়ন। কেরলই ভারতের একমাত্র রাজ্য যা চরম দারিদ্র্য দূর করেছে। বন্যা, কোভিড বা নিপার মতো সংকটের পরেও এই সরকার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পেরেছে।
বাংলা স্ট্রিট: আপনারা কি এবারও পিনারাই বিজয়নের ওপরই ভরসা রাখছেন?
ভি কৃষ্ণণ : আমাদের দলে একঝাঁক প্রতিশ্রুতিবান, যোগ্য নেতৃত্ব আছে—প্রচুর তরুণ এবং নারী নেতৃত্বে উঠে আসছেন। তবে আমরা এটা নিয়ে খুব পরিষ্কার যে, এই নির্বাচনে যিনি আমাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং গত ১০ বছর ধরে সমস্ত সংকটে রাজ্যকে পথ দেখিয়েছেন, তিনি তাঁর লক্ষ্যের প্রতি অবিচল। সেই কারণেই আপনি সব জায়গায় ওঁর হোর্ডিং দেখছেন। তবে মূল বিষয় হল, গত ১০ বছরে এলডিএফ যা করেছে, সেই রাজনীতিকেই আমরা এগিয়ে নিয়ে যাব। বর্তমানে কমরেড পিনারাই বিজয়ন সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দল যারা এখনও তাদের নেতা ঠিক করতে পারেনি, তাদের মতো আমরা দ্বিধাগ্রস্ত নই। সিপিআইএম সহ পুরো এলডিএফ জোট পরিষ্কার জানে যে, ওঁর নেতৃত্বেই আমরা কেরলকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাব।
বাংলা স্ট্রিট : ধন্যবাদ। আগামী নির্বাচনের জন্য অনেক শুভকামনা