
ইরানকে ঘিরে বাড়ছে সংঘাত, নতুন বিশ্বসংকটের আশঙ্কা
মিসাইল-ড্রোনে পাল্টা হামলা, তেলের বাজারে টানাপোড়েন, কূটনীতিতে অচলাবস্থা — দীর্ঘ সংঘাতের ইঙ্গিত দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা
পশ্চিম এশিয়ার আকাশে আবারও যুদ্ধের ঘন মেঘ। সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে Iran। তাকে ঘিরে সামরিক চাপ বাড়িয়েছে Israel এবং তার প্রধান মিত্র United States। গত কয়েক সপ্তাহে পাল্টাপাল্টি মিসাইল ও ড্রোন হামলায় পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে গোটা মধ্যপ্রাচ্য নতুন অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক কূটনীতিকরা।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে উত্তেজনা চরমে ওঠে। ইরানের একাধিক সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ ওঠে। তার জবাবে পাল্টা আঘাত হানে তেহরান। মিসাইল ও ড্রোনের পাশাপাশি আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমেও চাপ বাড়াতে শুরু করে ইরান। ফলে সংঘাত এখন আর সীমিত সামরিক মোকাবিলায় আটকে নেই—তা ধীরে ধীরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাতের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে বাড়ছে অনিশ্চয়তা। এই পথ দিয়েই বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল পরিবহন হয়। ফলে সামান্য উত্তেজনাতেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা শুরু করেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের ধরনও বদলাচ্ছে। সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের পাশাপাশি বাড়ছে সাইবার আক্রমণ, ড্রোন যুদ্ধ এবং প্রক্সি গোষ্ঠীর সংঘর্ষ। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে , সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী সীমিত যুদ্ধ। সরাসরি পূর্ণাঙ্গ সংঘাত না হলেও সীমান্তে হামলা, ড্রোন আক্রমণ এবং প্রক্সি গোষ্ঠীর লড়াই চলতেই পারে। এতে গোটা অঞ্চল দীর্ঘদিন অস্থির থাকবে।
পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তখন লেবানন, সিরিয়া বা উপসাগরীয় শক্তি, যেমন সৌদি আরবও সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। সেই পরিস্থিতিতে গোটা মধ্যপ্রাচ্য বড় যুদ্ধের মুখে পড়বে।
তবে যুদ্ধের পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চলছে। আন্তর্জাতিক চাপ এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রা বাড়লে শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে ফেরার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের অভিঘাত ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করেছে ভারতের অর্থনীতিতেও। কারণ ভারতের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই আমদানি করতে হয়, যার উল্লেখযোগ্য অংশ আসে পশ্চিম এশিয়া থেকে।
যুদ্ধের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি দীর্ঘদিন উঁচুতে থাকে, তবে তার প্রভাব পড়বে দেশের জ্বালানি খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং শিল্প উৎপাদনে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম বাড়লে ভারতের আমদানি ক্ষেত্রে বিলও দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। তার সঙ্গে বাড়তে পারে মুদ্রাস্ফীতির চাপ।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তার ছায়া পড়তে শুরু করেছে শেয়ারবাজারেও। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একাংশ ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে বাজারে ওঠানামা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে বাণিজ্য ক্ষেত্রেও বাড়ছে দুশ্চিন্তা। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে সমস্যা আরও বাড়লে ভারতীয় আমদানি-রপ্তানির ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।
তেলের দাম বাড়লে পরিবহন থেকে শুরু করে উৎপাদন খরচ—সব ক্ষেত্রেই চাপ বাড়বে। তার প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও। দীর্ঘ যুদ্ধ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে। ফলে শেয়ারবাজারে ওঠানামা এবং বিদেশি বিনিয়োগে সাময়িক ভাটা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিকল্প জ্বালানি, কৌশলগত তেল মজুত এবং নতুন জ্বালানি উৎসের দিকে আরও জোর দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে সেটাই অর্থনীতিকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত আপাতত আঞ্চলিক যুদ্ধের সীমার মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু তার প্রতিধ্বনি পৌঁছে যাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রতিটি স্তরে।প্রশ্ন এখন একটাই , মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুন কি দ্রুত নিভবে, না কি তা ধীরে ধীরে আরও বড় ভূরাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেবে, যার অভিঘাত পড়বে বিশ্বের পাশাপাশি ভারতের অর্থনীতিতেও ?