তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
লেন্সে ধরা অর্ধেক আকাশের গল্পগুলি

একটি আলোকচিত্র কি শুধুই ছবি নাকি আরও অনেক কিছু ? তা কি কেবল আলো-ছায়ায় ফুটে ওঠা মানুষ কিংবা প্রকৃতির আকার প্রকার, না কি এদের আড়ালে থেকে যাওয়া কথাও ? তবে আলোর সাহায্যে ও প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি মুহূর্তকে ফ্রেমে বন্দি করা শিল্পকলাই তো আলোকচিত্র নয়, কারণ শুধু ছবি তোলা নয়, সেই সঙ্গে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে একটি গল্প বলাও তো জরুরি, যা দৃশ্যশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একজন আলোকচিত্রী যেমন এক্সপোজার এবং কম্পোজিশনের মাধ্যমে সাধারণ দৃশ্যকে অসাধারণ করে তোলেন তেমনি একইসঙ্গে তো তিনি তাঁর নিজস্ব ভাবনা, অনুভূতি, দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যক্তিগত গল্প বা দর্শনকেও তুলে ধরেন। আলোকচিত্র তাই একটি ডকুমেন্টারি, পোর্ট্রেট, ল্যান্ডস্কেপ থেকে শুরু করে ফাইন আর্ট, ফটোগ্রাফি পর্যন্ত বিস্তৃত। যদিও সব ছবিই ‘আর্ট’ বা শিল্প নয়, তবুও যখন একটি ছবিতে বিষয়বস্তুর চেয়ে ফটোগ্রাফারের নিজস্ব শৈল্পিক অভিব্যক্তি (Narrative) বেশি প্রকাশ পায়, তখনই ফটোগ্রাফি প্রকৃত শিল্পের মর্যাদা পায়।

১০ মার্চ ‘কলকাতা সেন্টার ফর ক্রিটেভিটি’-তে জিতাবতী দাস আয়োজিত ‘ব্লারিং অফ দ্য মার্জিন: উইমেন অ্যাট ওয়ার্ক’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে কৌন্তেয় সিনহার ফোটোগ্রাফি দেখতে দেখতে এই কথাগুলি মনে হল। কৌন্তেয় তাঁর ফ্রেমে বন্দি করেছেন কেরল থেকে কাশ্মীর, মণিপুর থেকে অরুণাচল, উত্তর প্রদেশ থেকে রাজস্থান, কর্ণাটক থেকে বাংলার বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে থাকা একাধিক মহিলার কাহিনি, বা বলা ভালো তাঁদের কর্মক্ষেত্রের অনুপ্রেরণামূলক অংশগ্রহণের না বলা গল্প। যেমন একজন নিরক্ষর রাজস্থানী কৃষক মহিলা যিনি তাঁর স্বামী মারা যাওয়ার পর কাজ শুরু করেন, এবং থর মরুভূমির প্রান্তে ছ’হাজারেরও বেশি জলপাই গাছ রোপণ করেন। এই অঞ্চলে জলপাইয়ের চাষ সত্যিই অবিশ্বাস্য, কিন্তু তিনি তাঁর জলপাই খামার থেকে জলপাই তেল উৎপাদনও শুরু করেন। ভিজ্যুয়াল গল্পকার কৌন্তেয়া সিনহার লেন্সে ধরা আছে শ্রীনগরের বাসিন্দা আফশান আশিকের গল্প। ভদ্রমহিলা একসময় কাশ্মীরে পাথর নিক্ষেপকারী (stone-pelter) হিসেবে কুখ্যাত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে জম্মু-কাশ্মীর মহিলা ফুটবল দলের গোলরক্ষক এবং অধিনায়ক হন। তিনি তাঁর অতীত জীবন মুছে ফেলে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ হন এবং পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেন। আফশান আশিকের রূপান্তরের গল্পটি অনেক তরুণীর জন্য যে অনুপ্রেরণা তা বলাই বাহুল্য।

এইরকম ৭০টির কিছু বেশি আলোকচিত্র নিয়ে সাজানো ‘ব্লারিং অফ দ্য মার্জিন: উইমেন অ্যাট ওয়ার্ক’ শীর্ষক প্রদর্শনীতে দেখা মিলল মির্জাপুরের কার্পেট তাঁতি থেকে কাশ্মীরের জাফরান চাষি, কর্ণাটকের কফি চাষি থেকে শুরু করে মহিলা জেলে কিংবা একটা হাত বাদ যাওয়ার পরে কাপড়ে নিপুণ কাঁথার কাজ করে যিনি তাক লাগান সেই মহিলার। আর এইসব জীবন্ত অনুপ্রেরণা নারীদের না-জানা, না- বলা গল্পগুলি অনুসন্ধান করতে কৌন্তেয় চার মাস ধরে চল্লিশ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছেন। প্রদর্শনীর আয়োজক জিতাবতী দাস বললেন, 'ব্লারিং অফ দ্য মার্জিন: ইন্ডিয়া অ্যাট ওয়ার্ক' হল একটি যুগান্তকারী ফটোগ্রাফি প্রদর্শনী যা ভারতীয় মহিলাদের নেতৃত্বে অর্থনীতির এগিয়ে যাওয়ার কাহিনি। মেয়েদের কাজ প্রায় সবসময়েই অনানুষ্ঠানিক, অবমূল্যায়িত বা সরবরাহ চেনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে, তাঁদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়ই না। এই প্রদর্শনী নারীর শ্রমকে শুধুমাত্র একটি সহায়ক ভূমিকার পরিবর্তে একটি চালিকা শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করবে।' প্রদর্শনীটি পরিচালনা করছেন ঐন্দ্রিলা রায় কাপুর। তাঁর কথায়, 'নারীরা সবসময় নীরবে, নিঃশব্দে, প্রয়োজনের বাইরেও কর্মশক্তির অংশ হয়েছে। তাঁদের আকাঙ্ক্ষাকে, সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টাকে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।' প্রদর্শনীর প্রথম দিন উপস্থিত ছিলেন জাতিপুঞ্জের নারী বিষয়ক আধিকারিক নিশীথা সত্যম, অভিনেত্রী দিব্যা দত্ত, লিলেট দুবে, নৃত্যশিল্পী শান্তিপ্রিয়া, পরিচালক অনুপর্ণা রায়, টেবিল টেনিস তারকা মৌমা দাস, কবি যতীন্দ্রমোহন মিশ্র-সহ আরও অনেকে।


Scroll to Top