
শতবর্ষের আলোয় মহানায়ক উত্তমকুমারের মূল্যায়ন করার অর্থ কেবল গতানুগতিক নস্টালজিয়ায় ভেসে যাওয়া বা পুরোনো দিনের খাতার পাতা উল্টে দুনিয়ার চর্বিতচর্বণ আউড়ে যাওয়া নয়। বরং সেই গণ্ডিটা চিরতরে ছিন্ন করে একজন রক্তমাংসের বাস্তব মানুষকে আবিষ্কার করা—তাঁর স্বপ্ন, তাঁর না-পারার বেদনা এবং তাঁর ভেতরের লড়াইকে অনুভব করতে চেষ্টা করা।
সদ্য স্বাধীনতালাভের পর পঞ্চাশ থেকে সত্তর দশকের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সামাজিক ও বাণিজ্যিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তিনি, উত্তম, কেবল বাংলা তথা ভারতীয় পপুলার সিনেমার 'রোমান্টিক আইকন'ই ছিলেন না, বরং তিনি হয়ে উঠেছিলেন আপামর বাঙালির মনস্তত্ত্বের এক চিরন্তন ঠিকানা। মঞ্চের হাজার দর্শকের সামনে গলা চড়িয়ে বা পুরো শরীর দিয়ে অভিনয় করার যে পুরোনো বাধ্যবাধকতা ছিল, ক্যামেরার ক্লোজ-আপ লেন্সের সামনে যে তা টেকে না—এই সত্য তিনি, তাঁর সময়ে বসে, খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, ক্লোজ-আপ লেন্স মুখের পেশির অতিসূক্ষ্ম কাঁপুনি, চোখের পলকের ব্যবধান বা চোখের তারার সামান্য নড়াচড়াকে কীভাবে বিশাল করে তুলতে পারে। এবং সেই লক্ষ্য তিনি করেছিলেন কেবল যে একজন রোম্যান্টিক নায়কের জায়গা থেকেই তা কিন্তু নয়, বরং সেই বিরল প্রতিভাধর অভিনেতা হিসেবেও, যিনি মুখের সামান্য ইশারা বা চোখের পলকেই এক-একটি মনস্তাত্ত্বিক দলিল তৈরি করে দিতে পারতেন।

শুধুমাত্র এই সচেতনতার জন্যেই স্রেফ বাণিজ্যিক ছবির খোলসের ভেতরে দাঁড়িয়েও তাঁর ছবির চরিত্রগুলোর ভেতরের অন্ধকার, ট্রমা, ইগো বা নিঃসঙ্গতা একেবারে দর্শকের হাড়ের ভেতর গিয়ে লাগত।
এক অর্থে দেখলে পঞ্চাশ থেকে সত্তর দশক পর্যন্ত সময়পর্বটি ছিল সারা বিশ্বের মতো বাংলা তথা ভারতীয় স্ক্রিন অ্যাক্টিংয়ের জন্যেও জ্যান্ত একটা ল্যাবরেটরি। এই দীর্ঘ সময়ে আন্তর্জাতিক সিনেমা নানা নতুন ছাঁচে নিজেকে বদলাচ্ছিল। একদিকে হলিউডে যখন মারলন ব্র্যান্ডো, জেমস ডিন বা মন্টগোমারি ক্লিফটদের মতো অভিনেতারা ঝড় তুলছেন, আবার অন্যদিকে বলিউডে দিলীপকুমারের নিচু স্বরে গভীর বেদনা প্রকাশ বা রাজ কাপুর-দেব আনন্দদের নিজস্ব ঘরানাও যখন তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, তখন বাংলায় উত্তমকুমার নাট্যধর্মী ব্যাকগ্রাউন্ড আর নিজের সহজাত বুদ্ধিতে সম্পূর্ণ নতুন এক স্ক্রিন প্রেজেন্স তৈরি করেছিলেন।
‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘সপ্তপদী’, ‘বিপাশা’, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ বা ‘যদুবংশ’-এর মতো একের পর এক ছবি শুধু বক্স অফিসই কাঁপায়নি, বাঙালির মনের দুনিয়ার গভীর কোণাতেও গিয়ে ধাক্কা দিয়েছিল।
বাণিজ্যিক ছবির চেনা ফর্মুলার মধ্যেই কীভাবে শান্ত থেকে, অতিরিক্ত চেঁচামেচি বা বাহুল্যের আশ্রয় না নিয়ে চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করা যায়, তা তিনি করে দেখিয়েছিলেন। ‘সপ্তপদী’ ছবির কৃষ্ণেন্দু চরিত্রে তাঁর মুখের অভিব্যক্তি বা শারীরিক ভাষা সমসময়ের চলতি ধারার সঙ্গে এক নীরব লড়াইয়ের সাক্ষ্য দেয়। আজকের দিনে আধুনিক সিনেমার অভিনেতারা যেভাবে চোখের ইশারা ও পজের মাধ্যমে টান টান উত্তেজনা তৈরি করেন, উত্তমকুমার সেই যুগে দাঁড়িয়েই মুখের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তিতে আদ্যন্ত বাঙালি রোমান্টিক হিরোর খোলসের মধ্যেই সেই জটিল মনস্তাত্ত্বিক চরিত্রের জন্ম দিয়েছিলেন।
সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ ছবিতে অরিন্দম মুখার্জি চরিত্রটি এক অর্থে প্রায় নিখুঁত এক রূপায়ণ। পর্দার পেছনের রিয়েল লাইফ স্টার-আইডেন্টিটি এবং চরিত্রের ভেতরের ট্রমা এখানে একবিন্দুতে এসে মিশেছে। পিনাকীভূষণ মুখোপাধ্যায়ের ‘চৌরঙ্গী’ ছবিতে সত্যসুন্দর বোসের চরিত্রে তাঁর নিভৃত অভিনয় আজকের ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বা আধুনিক রিয়েলিস্টিক ড্রামার মানদণ্ডকে অব্দি চ্যালেঞ্জ করে। একইভাবে সলিল দত্তের ‘স্ত্রী’ ছবিতে মাধব দত্তের চরিত্রে গ্রামীণ জমিদারের ইগো, অহংকার ও নিরাপত্তাহীনতাকে তিনি যেভাবে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও পজের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা রোমান্টিক নায়কের ইমেজ ভেঙে খলনায়ক বা ডার্ক শেডের চরিত্রে পা রাখার এক সাহসী ঘোষণা ছিল।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক পটভূমিতে দাঁড়িয়ে, যখন চারপাশটা টালমাটাল, উত্তমকুমারের রোমান্টিক হিরোর ইমেজ কিন্তু স্রেফ বিনোদনের উপাদান-মাত্র ছিল না। তাঁর নীরব চাউনি সেই সময়ের টালমাটাল অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এক নির্বাক প্রতিবাদের সমতুল্য ছিল। তাঁর অভিনীত বহু চরিত্রের ভেতরেই একটা তীব্র বিচ্ছিন্নতাবোধ কাজ করত, যা পপুলার কমার্শিয়াল ফ্রেমে মোড়া থাকায় মূলধারার দর্শক সহজে গ্রহণ করেছিল।
স্টার স্টাডিজ় ও মেলোড্রামার মূল কথাই হল—তারকা নিজের বাস্তব ব্যক্তিত্ব এবং পর্দার চরিত্রের ভেতর এক সেতু তৈরি করবেন। এই জায়গাতেই উত্তমকুমার অনন্য। ‘নায়ক’-এর অরিন্দম মুখার্জি নিছক অভিনয় ছিল না; এটি ছিল তাঁর জায়গা থেকে সেলুলয়েডের ফ্রেমে নিজের স্টার-ইমেজকে প্রকাশ্যে ব্যবচ্ছেদ করার এক নির্মম শৈল্পিক সততা। সত্যজিতের স্ক্রিপ্টকে অবলম্বন করেই তাকে কিছুটা অন্তত ছাপিয়ে গিয়ে নিজের তারকাখ্যাতির ভেতরকার ফাঁকফোকর ও অপরাধবোধকে তিনি এই ছবিতে ক্যামেরার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিতে সত্যজিৎ রায়ের নির্দেশেই হোক বা অন্য কোনো ছবিতে, উত্তমকুমার বারবার প্রমাণ করেছেন যে রোমান্টিক নায়কের চাদরের নিচে একজন ক্ষয়ে যাওয়া, ক্লান্ত ও নীতিভ্রষ্ট মানুষের ছায়াও সমানভাবে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।
আজ, শতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে যখন আমরা পেছন ফিরে তাকাই, তখন এটাই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, উত্তমকুমার মোটেই একজন গতানুগতিক অভিনেতা-মাত্র ছিলেন না। তিনি ছিলেন এমন একজন দ্রষ্টা, যিনি সময়ের বহু আগে ক্যামেরার ভাষা এবং মানুষের অবচেতন মনটাকে পড়তে পেরেছিলেন। তাঁর হাঁটাচলা, তাঁর কোট পরার স্টাইল, সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ার ভঙ্গি—সবকিছুর পেছনেই একটা পরিমিতিবোধ কাজ করত। তিনি জানতেন ঠিক কতটুকু দেখাতে হবে এবং ঠিক কতটুকু আড়ালে রাখতে হবে। এই সংযমই তাঁকে সাধারণ ছাঁচ থেকে অনেক ওপরে তুলে দিয়েছিল।
ইউরোপীয় স্ক্রিন থিওরি বা আমেরিকার মিনিমালিস্ট অ্যাক্টিংয়ের জটিল পরিভাষায় না গিয়েও একথা হলফ করে বলা যায়, মহানায়ক উত্তমকুমার কেবল বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বকালের সেরা নায়কই নন, বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম দূরদর্শী ও আধুনিক স্ক্রিন পারফর্মার হিসেবে চিরকাল অমলিন থাকবেন। তাঁর জাদুকরী উপস্থিতি এবং অভিনয়ের নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়া খাস বাঙালি মেজাজ বাংলা সিনেমা যতদিন থাকবে, ততদিন মানুষকে সম্মোহিত করে রাখবে।