
সাক্ষাৎকারটি যে নিতান্তই সৌজন্যমূলক ছিল না , ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই আটান্নজন বিধায়ককে নিয়ে বিধানসভার স্পিকারের কাছে হাজির হয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আসলে বিজেপির প্ল্যান বি , প্ল্যান সি , প্ল্যান ডি ইত্যাদি তৈরিই ছিল। সেইসব প্ল্যান অনুযায়ী ঋতব্রত 'সৌজন্য সাক্ষাৎকারে' গিয়েছিলেন। এবং তারপর প্ল্যান অনুযায়ীই যা যা ঘটার ঘটে গিয়েছে। এই প্রসঙ্গে আলাপচারিতায় এক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ বললেন , 'এই প্ল্যান বি প্ল্যান সি প্ল্যান ডিগুলি তৃণমূল কংগ্রেস বুঝতে পারেনি। বুঝতে পারেনি বাংলায় একজন একনাথ শিন্ডেকে বিজেপি ভোটের আগেই তৈরি করে রেখেছিল। যদি ভোটে জিতে দেড়শোর বেশি আসন পেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসতেন , তাহলেও তাঁকে ক্ষমতায় থাকতে দিত না বিজেপি। শিন্ডেরা দল ভাঙানোর কাজে নেমে পড়ত।' বিজেপি এবার দুশো পার করে ক্ষমতা দখল করেছে। তাহলে আর শিন্ডের প্রয়োজন কেন তাদের ? একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যাবে , দল ভাঙানোর রাজনীতিতে দড় একটি দলের কাছে শিন্ডেদের প্রয়োজন কখনো ফুরিয়ে যাবে না। ওই রাজনীতি বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যা , আসনের সংখ্যা দিয়ে তৃণমূলকে পরিমাপ করতে যাওয়াটা ভুল হবে। মনে রাখতে হবে তৃণমূল ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। আর সার্বিকভাবে এই রাজ্যে বিজেপি বিরোধী ভোটের সংখ্যা ৫৫ শতাংশ। ৪১ শতাংশ ভোটের অধিকারী একটি দলকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে এবং সেই দলে ভাঙন ধরিয়ে দ্রুত তাকে দুর্বল করে দেওয়াটা যে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য কতটা জরুরি সেটা বিজেপি অন্তত বোঝে। সর্বোপরি , '২৯ - এর লোকসভা নির্বাচনের আগে সংসদে নিজেদের শক্তি আরও বাড়ানোর একটি পরিকল্পনা বিজেপির রয়েছে। বিহারে নীতীশ ঠিক থাকলেও , অন্ধ্রের চন্দ্রবাবুর ওপর খুব ভরসা বিজেপি আর করতে পারছে না। চন্দ্রবাবু ইদানীং যেন একটু বেসুরো ঠেকছেন। অতএব আরও কিছু রাজ্য থেকে আরো কিছু এমপি ভাঙাতে হবে। কাজেই বিধায়ক নয়। বিজেপির আসল টার্গেট বাংলার বেশ কিছু এমপি। বাংলার শিন্ডে ঋতব্রতকে বাজারে নামানোর প্রকৃত উদ্দেশ্য সেটাই। তৃণমূল ভেঙে গিয়েছে, এমন একটি আখ্যান তৈরি করে যদি বেশ কিছু এমপিকেও এই সুযোগে নিজেদের দিকে টেনে নেওয়া যায়।

এখন প্রশ্ন তৃণমূলের কী হবে ? ঋতব্রত কি সত্যিই তৃণমূলকে ভেঙে দিতে পারলেন ? নাকি টিভি ক্যামেরার সামনে বসে যাঁরা তৃণমূলের শেষযাত্রা হয়ে গিয়েছে এমনতর ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন , তাঁদের আবার দ্বিতীয়বার ভাবতে বসতে হবে ? বিজেপি রাজনৈতিক হেজিমনি বা আধিপত্যবাদে বিশ্বাস করে। এক দেশ , এক ভোট, এক নেতা , এক দল এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতেই বিজেপি বেশি তৎপর। বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় দফার প্রধানমন্ত্রিত্ব পূর্ণ হওয়ার আগে এমন একটি ব্যবস্থা সারা দেশে প্রতিষ্ঠা করে দিতে বড় বেশি তৎপর হয়ে উঠেছে তারা। এই ব্যবস্থায় রাজ্যে রাজ্যে শিন্ডে তৈরি হবে। দল ভাঙিয়ে বিরোধীদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে দেওয়া হবে। সরকার মনোনীত বিরোধীরাই একমাত্র বিরোধী বলে গণ্য হবেন।
উদাহরণ ? ঋতব্রত ৫৮ জন বিধায়ককে নিয়ে স্পিকারের সঙ্গে দেখা করার আগেই তৃণমূল তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। আইনত ঋতব্রত এখন তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক নন। এখন উনি নির্দল বিধায়ক। একজন নির্দল বিধায়ক আইনত কখনো কোনো স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের পরিষদীয় নেতার স্বীকৃতি দাবি করতে পারেন না। যতদূর মনে হয় এই বিষয়টি নিয়ে অদূর ভবিষ্যতে আদালতের দ্বারস্থ হবে তৃণমূল। কিন্তু আইন- কানুনের খুব একটা তোয়াক্কা বিজেপি করে বলে বিজেপির অতি বড় সমর্থকও বলবেন না। ঋতব্রতর বহিষ্কার নিয়ে বিধানসভার স্পিকার বলে বসলেন , ওই বহিষ্কার বৈধ নয়। প্রশ্ন উঠতেই পারে , কোন রাজনৈতিক দল কাকে বহিষ্কার করবে , কিভাবে বহিষ্কার করবে , সেটা একান্ত তাদের বিষয়। বিধানসভার স্পিকার কোন এক্তিয়ারে সে প্রসঙ্গে হস্তক্ষেপ করতে আসেন ? আইন কানুনের তোয়াক্কা না করে স্পিকারকে এই প্রসঙ্গে হস্তক্ষেপ করতেই হত। কারণ এক দেশ , এক নেতা , এক দল নীতিতে বিরোধী আসনে নিজেদের মনোনীত গোষ্ঠীকে বসাতে এছাড়া অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। এই সব বিষয়ই আদালত অবধি গড়াবে এমন সম্ভাবনা আঁচ করা যাচ্ছে।
আসা যাক তৃণমূল প্রসঙ্গে। ঋতব্রত ৫৮ জন বিধায়ক নিয়ে স্পিকারের কাছে হাজির হওয়ার চব্বিশ ঘণ্টার ভিতরেই খেলাটি কিন্তু ঘুরতে শুরু করেছে। ঋতব্রত বিধায়ক ভাঙাতে পারলেও , দল ভাঙাতে পারেননি। বরং বিধায়ক ভাঙানোর পর দলের তৃণমূল স্তরের কর্মী - সমর্থকরা এককাট্টা হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে এসে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। তাঁদের ক্ষোভ আছড়ে পড়েছে ঋতব্রত এবং তাঁর সহযোগী বিধায়কদের ওপর। দলের কর্মীদের এই ক্ষুব্ধ চেহারা অনেক বিধায়ককেই আশঙ্কিত করে তুলেছে। ৫৮ জন বিধায়কের ভিতর অনেকেই তাই চব্বিশ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই উল্টো সুরে কথা বলতে শুরু করেছেন। এঁদের অনেকেই বলছেন , মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তাদের নেত্রী। দল তারা ভাঙতে চান না। এমনকি , এ-ও বলছেন , তাঁদের ভুল বোঝানো হয়েছে। কয়েকজন তো আবার তৃণমূল নেত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টাও করছেন। তাঁদের ভয় দেখিয়ে , চাপ দিয়ে এই কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে --- এমন বার্তাও নাকি তৃণমূল নেতৃত্বকে পৌঁছে দিয়েছেন। কে কাকে ভয় দেখিয়েছেন , কে কাকে ভুল বুঝিয়েছেন , কে কে লোভের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন, এসব বিষয়ে না ঢুকেও বলা যায় , ৫৮ জনের ভিতর কতজন শেষ পর্যন্ত ঋতব্রতর সঙ্গে থাকবেন , সে নিয়ে ইতিমধ্যেই সংশয় দেখা দিয়েছে। এই বিধায়কদের ভিতর অনেকেই এটুকু অন্তত বুঝতে পারছেন , ঋতব্রতর সঙ্গে থাকলে এলাকায় ফিরে গিয়ে রাজনীতি করাটা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।
যতই তৃণমূল ভেঙে গিয়েছে এরকম একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হোক না কেন , বাস্তবে দলটি কিন্তু ভাঙেনি। দলের জনভিত্তিতে ঋতব্রতরা আঁচড় কাটতে পারেননি। তদুপরি ঋতব্রত নিজেই কোনোদিন জনপ্রিয় মাস লিডার ছিলেন না। এখনো নন। এমন এক ব্যক্তির পক্ষে কোনো দলের জনভিত্তিতে আঁচড় বসানো সম্ভব নয়। ধর্মতলায় মমতা যেদিন ধর্নায় বসলেন, সেদিনই দলের কর্মী সমর্থকদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি এবং মেজাজ বুঝিয়ে দিয়েছে , ঋতব্রতরা শিন্ডে হতে পারেন , কিন্তু মমতা হওয়ার যোগ্যতা এখনো অর্জন করতে পারেননি।
নিজের জনভিত্তি কতটুকু অটুট আছে সেটি মমতা যাচাই করে নিতে চেয়েছিলেন। ধর্নায় বসে সেটি তিনি যাচাই করে নিতে পেরেছেন। পেরেছেন বলেই সময় নষ্ট না করে তিনি ৪ তারিখই রাস্তায় নেমে পড়েছেন। এরপর রাজপথের আন্দোলনে যে আরও গতি তিনি আনবেন সেটি বোঝাই যাচ্ছে। এরই পাশাপাশি আর একটি কাজ তিনি করেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের যাবতীয় কমিটি ভেঙে দিয়ে দলটির পূর্ণ কর্তৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন , এই দলে দুই ,তিন,চার নম্বর বলে কিছু নেই। এই দলে তিনিই এক এবং অদ্বিতীয়। মনে হচ্ছে , নিজের হাতে গড়া দলটি তিনি এবার রিকনস্ট্রাকশন করবেন।
কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে নিজের কয়েকজন তরুণ সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস গড়ে তুলেছিলেন মমতা। ২০০৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেস যখন মাত্র একটি সাংসদকে জিতিয়ে আনতে পেরেছিল , যখন অনেকেই ছেড়ে গিয়েছিলেন মমতাকে -- সেই বিপর্যয়ের ভিতর থেকেও দলকে শক্ত জমির ওপর দাঁড় করিয়ে দিতে পেরেছিলেন মমতা। বিপর্যয় মোকাবিলা করার ক্ষমতা যে মমতার আছে , সেটা বিজেপি ভালো বোঝে। ঋতব্রত খুব সফল হতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না। বিজেপি হয়তো এবার প্ল্যান ডি নিয়ে বাজারে নামবে। সেই প্ল্যান কী কেউ জানে না। উলটোদিকে আক্রমণাত্মক মেজাজে মমতাও বাজারে নামছেন। যত দিন যাবে তত মমতার মেজাজ আরও আক্রমণাত্মক হবে। কাজেই খেলাটি এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। যত দিন যাবে মমতা বনাম বিজেপি খেলাটি আরও রোমাঞ্চকর হয়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত খেলা কতদূর গড়াবে সে ভবিষ্যৎ বলবে। তবে , যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে যে নোংরা খেলাটি প্রফুল্ল ঘোষ খেলেছিলেন , ঠিক সেই একই রকম খেলা এবার ঋতব্রত খেললেন। ইতিহাস ঋতব্রতকে কোনো আদর্শ ভিত্তিক রাজনীতির জন্য মনে রাখবে না। মনে রাখবে আদর্শ বিবর্জিত এক রাজনীতিক হিসেবে।