
রবীন্দ্রনাথ তাঁর "আশ্রমের শিক্ষা" প্রবন্ধে লিখেছেন, "ছেলেরা বিশ্বপ্রকৃতির অত্যন্ত কাছের। আরাম কেদারায় তারা আরাম চায় না, সুযোগ পেলেই গাছের ডালে তারা চায় ছুটি। বিরাট প্রকৃতির নাড়ীতে নাড়ীতে প্রবহমান প্রাণের বেগ নিগূঢ়ভাবে চঞ্চল। শিশুর প্রাণে সেই বেগ গতি সঞ্চার করে।"
সেই সঙ্গে তিনি আরও বলেছেন, "যে গুরুর অন্তরে ছেলেমানুষটি একেবারে শুকিয়ে কাঠ হয়েছে তিনি ছেলেদের ভার নেবার অযোগ্য। যিনি জাত-শিক্ষক ছেলেদের ডাক শুনলেই তাঁর ভিতরকার আদিম ছেলেটা আপনি বেরিয়ে আসে। মোটা গলার ভিতর থেকে উচ্ছ্বসিত হয় প্রাণ ভরা কাঁচা হাসি।"
রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনের খোলা প্রান্তরে প্রকৃতির কোলে যে ব্রহ্মচর্যাশ্রম স্থাপনা করেছিলেন তার শিক্ষার ধারাটি ছিলো সর্বাঙ্গীন। বইয়ের পাঠ্যাংশ ছাড়াও, খেলাধূলা, সঙ্গীত-শিক্ষা, সাহিত্যচর্চা, ছেলেদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা—সবই এর অঙ্গ ছিল। ১৯০১ সালে ব্রহ্মচর্যাশ্রম স্থাপিত হবার পর থেকেই রবীন্দ্রনাথ ছাত্রদের জন্য নানাবিধ অনুষ্ঠানের কথা চিন্তা করতে শুরু করেন। সঙ্গীত শিক্ষাকে তিনি পাঠ্যক্রম বহির্ভূত কার্যক্রম বলে মনে করেন নি, বরং সহ-পাঠ্যক্রমিক আবশ্যিক কার্যক্রম বলে মনে করেছেন। ছাত্ররা শিল্প, কলা, সঙ্গীত, নৃত্য ও নাট্যের মাধ্যমে আত্মানুসন্ধান করবে—এই ছিলো তাঁর লক্ষ্য।
তিনি এও উপলব্ধি করেন যে গানের ক্লাসে গান শিখতে ছাত্ররা যতটা উৎসাহী হয়, তার থেকে ঢের বেশি উৎসাহ উদ্দীপনা তাদের মধ্যে দেখা যায়, যখন কোনও অনুষ্ঠানের জন্য তাদের মহলা দেওয়ানো হয়। আগেই বলেছি, তাঁর আশ্রমের ছাত্রদের কথা মনে রেখেই মূলত রবীন্দ্রনাথ এত বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানের প্রচলন ঘটান। তাদের আত্মনির্ভর করে তোলাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
বিভিন্ন জনের লেখায় পড়েছি রবীন্দ্রনাথ ও দীনেন্দ্রনাথ—দুজনের গান শেখানোয় একটা মিল দেখা যেত। দুজনেই একটি নতুন গান আগাগোড়া বারবার করে গাইতেন। যতক্ষণ না ছাত্রছাত্রীরা সেটিকে আয়ত্ত্ব করতে পারতো, ততক্ষণ তাঁরা বিরাম দিতেন না। আমরা যারা গান শেখাই, তারা বুঝতে পারি এই পদ্ধতি কী পরিমাণ সময় ও কষ্টসাপেক্ষ ছিল। যখন তাঁরা সন্তুষ্ট হতেন যে গানখানি রপ্ত হয়েছে, তখনই তাঁরা থামতেন।
শান্তিনিকেতনের কথা মনে করলেই প্রথমেই সঙ্গীত ভবনের কথা বলতে হয়। বিশ্বভারতীতে সঙ্গীত শিক্ষার ব্যবস্থা বেশ বিস্তৃত। এখান থেকে যাঁরা স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বেরোন, তাঁদের রবীন্দ্রসঙ্গীত, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও বাংলা সঙ্গীত শিখতে হয়। এছাড়া বিভিন্ন ধরণের নৃত্য, বাদ্য ও নাটক—এ সবই শেখার ব্যবস্থা আছে বিভিন্ন বিভাগে। যদিও সিলেবাসে স্পেশালাইজেশনের সুযোগ থাকে, কিন্তু এই মুহূর্তে আমি সঙ্গীত ভবনের শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করছি না। আমি ছোটদের গান শেখানো নিয়ে কিছু বলবো।
১৯০১ সালে ব্রহ্মচর্যাশ্রম স্থাপিত হয়। তার
ঠিক ৫৮ বছর পরে ১৯৫৯ সালে আমি
পাঠভবনে (ব্রহ্মচর্যাশ্রমের নাম বদল
হয়) দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হই। আমি
১৯৬৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ
হই। আমাদের গানের ক্লাসগুলি বেশিভাগ
ক্ষেত্রেই খোলা জায়গায়, কোনও
গাছতলায় বা কোনও খোলা বারান্দায়
নেওয়া হত। কখনও কখনও বন্ধ ঘরে
ক্লাস করেছি, কিন্তু তা নেহাতই কম।
আমাদের শৈশব ও প্রথম কৈশোরে
শ্রীমতী আরতি বসু ও শ্রীমতী মঞ্জু
বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের ক্লাস নিতেন।
পিচ পাইপে ফুঁ দিয়ে গানের স্কেলটি নির্ধারণ করে তাঁরা গান শেখাতে শুরু করতেন প্রথম 'টিপ' কানে
নিয়ে। আমরা গান শিখতে শুরু
করতাম খালি গলাম। সেই সময়
তানপুরা, হারমোনিয়াম তো নয়ই
'টিপ' টিকে কানে নিয়ে আমাদের গান শেখা। তবলা থাকতো না। হাতে তালি দিয়ে তাল ও লয় রাখতে শিখেছিলাম। তাই গানের ছন্দ ও ঝোঁকগুলি অনায়াসে আত্মস্থ করতে পারতাম। শুনে গানের মাত্রা গুনিনি কখনও। বা বোল বাণী না জানা থাকলেও খুব সহজে ঝাঁপতাল, তেওডা বা অন্যান্য তালের গান গাইতে পারতাম।
এর সঙ্গে ছিলো পারিপার্শ্বিক। খোলা আকাশের তলায়, গাছের পাতায় পাতায় আলোর নাচন দেখতে দেখতে, পাখির কাকলি শুনতে শুনতে প্রকৃতির কোলে আমাদের প্রথম সঙ্গীত শিক্ষা।
সেই সময় থেকে সমবেত ভাবে, এবং আনন্দের সঙ্গে গান করা আমাদের মজ্জাগত সত্ত্বায় মিশে গিয়েছিলো। যাঁরা ঐচ্ছিক গান বিষয় নিয়ে গান শিখতেন, তাঁদের শিক্ষা অনেকটাই Structured ও technical ছিলো। যাঁরা সাধারণ গানের ক্লাসে যেতেন, তাঁদের গানে একটা খোলা, স্বতঃস্ফূর্ত ধরন তখনও ছিলো, এখনও আছে।
তাছাড়া ছেলেবেলা থেকে বিভিন্ন সাহিত্যসভা, বারো মাস জুড়ে নানারকম অনুষ্ঠানে অংশ নেবার ফলে নির্ভয়ে গান করতে পারার একটা মানসিকতা তৈরি হয়ে যেতো। আমাদের সময় ছোটদের একক সঙ্গীতের তুলনায় সমবেত সঙ্গীতে অংশ নিতেই বেশি দেখা যেত। আমি এখনও অবাক হয়ে লক্ষ্য করি পাঠভবনের ছাত্রছাত্রীদের গানে এমন একটা factor আছে, যেটা সচরাচর আর কোথাও দেখা যায় না। সেই উপাদানটি আনন্দের। এই আনন্দটুকুই ছিলো ছোটদের গান শেখানোর মূল উৎস, যা রবীন্দ্রনাথ প্রথম যুগ থেকেই প্রবর্তন করেছিলেন। তাই Stage fright হলো না কোনওদিন। ছোটবয়স থেকেই কোথাও একক গানের জন্য মনোনীত হলে, সেটিও অতি অনায়াসে পরিবেশিত হতো। এই বয়সে পৌঁছিয়েও আমার মনে হয় গানের মধ্যে থেকে নিজেকে আনন্দ পেতে হবে, তবেই শ্রোতাদের আনন্দ দেওয়া সম্ভব।