
যতবার কলকাতায় আসি ততবারই দেখি আমার সময় কোথা দিয়েছে কেটে গেল বুঝতেই পারি না। এই শহরে প্রতিনিয়ত এত নাটক হয়, এত সিনেমা চলে, এত নতুন নতুন বইপত্র দেখতে পাই, যা পড়তেই হবে, যে সেগুলো পড়তে পড়তে, দেখতে দেখতে আর শুনতে শুনতেই ফিরে যাবার দিন চলে আসে। এবারেও তার অন্যথা হয়নি। তার ওপর এবার আবার ডাক্তার দেখিয়ে যাবার ব্যাপারও তো আছে সেই সঙ্গে। ফলে, দিনগুলো কোথা দিয়ে যে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না।
এবারেও অনেক নাটক দেখেছি। অনেক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছে। সবাই নাটকের লোক। বন্ধুবান্ধব, ছাত্র। তাদের কাজ, তাদের নতুন ভাবনাচিন্তার কথাও শুনলাম। কলকাতার বাইরেও গিয়েছিলাম। সব সময় দেখি কলকাতার বাইরেও এত রকম নতুন কাজ হচ্ছে যে সেগুলোর সম্পর্কে বাইরে বসে জানাটা খুবই কঠিন। সব থেকে বড়ো কথা একটা অদ্ভুত স্বতঃস্ফূর্ততা আছে। এবারেও সেরকম বেশ কিছু কাজ দেখেছি। বেশ কিছু উৎসব হচ্ছে নাটকের। সেসবও দেখলাম । অধিকাংশই কমবয়সী, তরুণদের কাজ বলে খুব ভালো লাগে সে সব দেখলে। নতুন ভাবনা-চিন্তার খোরাকও তো পাই। সেই জন্যেই আমার আরও বেশি উৎসাহ এখানে , বিশেষত কলকাতায় আসার জন্য। সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত স্বতঃস্ফূর্ততা দেখি এখানে কাজ করে। ওয়ার্কশপ হচ্ছে। ভালো ভালো অভিনেতা অভিনেত্রীরা কাজ করছেন। তার ওপর আমার নিজের নাটকও এবার আছে। একক নাটক। কয়েক বছর আসতে পারিনি। নানা জটিলতা ছিল। এবার সব বাধা কাটিয়ে চলেই এলাম একটু জোর করেই হয়ত।

আমার আসল উৎসাহ হল, পশ্চিমবঙ্গের একটা বিরাট ভালো জিনিস দেখতে পাই । আগেও দেখেছি, এখনো দেখি। এখানেও সমস্যা আছে। নানারকম রাজনৈতিক আন্দোলন হয়। এবারেও হচ্ছে। এস আই আর নিয়ে এত উত্তেজনা। এসব তো অবশ্যই আছে। জনজীবনে অবশ্যই এসবের বিশাল প্রভাবও পড়ে। নিশ্চয় পড়ে। কিন্তু বিরাট চাপ কিন্তু পড়ে না, যে তার জেরে নাটক, সিনেমা , বই পড়া, তা নিয়ে কথা বলা এসব বন্ধ হয়ে যাবে। একটা স্রোত, ভাবনাচিন্তার স্রোত বয়ে চলে। চলছে । এটা চলতেই থাকে। রাজনৈতিক আন্দোলন এখানে বিশাল ছাপ কিছু ফেলে যায় না, যার জন্যে নাটক বন্ধ হয়ে যাবে, করা যাবে না, এসব হয় না।
শুধু নাটক নয়, সিনেমাও এখানে অনেক ভালো ভালো হচ্ছে । ‘অদম্য’ নামে একটা সিনেমা দেখলাম। একদম নতুন ছেলের ছবি। সুন্দর অভিনয় । দারুন ক্যামেরা। সব মিলে একটা অদ্ভুত ব্যক্তিকতা কাজ করেছে গোটা ছবিটাতে। খুব ভালো ছবি। নতুন ধরনের। দারুন লাগল। এরকম নতুন জনরার কাজ, এগুলো দেখলে খুব ভালো লাগে।
এখানে আরেকটা ট্রেন্ড আছে পত্রপত্রিকার। সেটা অবশ্য ও বাংলাতেও আছে। তবে এখানে যেন বেশি। অনেক পত্র-পত্রিকাই নানারকম বিষয় নিয়ে বিশেষ সংখ্যা করে এখন। নতুন ভাবনার, পুরনো বিষয়কে নতুন অ্যাঙ্গেলে দেখার অদ্ভুত একটা চেষ্টা, ইতিহাসকে সমসময়ের পার্সপেক্টিভে বিশ্লেষণের চেষ্টা, নতুন প্রজন্মের ভাবনার, বিশ্লেষণের চেষ্টা--- এগুলো খুব মূল্যবান। এই নতুন অ্যাঙ্গেলটা খুব ভালো লাগে। কিছু এরকম পত্রপত্রিকা দেখেছি। কলেজ স্ট্রিটে যাব নিশ্চয়। খুব ইচ্ছে আছে। গেলে নিশ্চয় আরো সংগ্রহ করে নিয়ে যাব। আসল কথা, কাজ কিন্তু হচ্ছে। এটাই দরকার। একটা জাতি, তাকে তো এগোতে হবে। থেমে তো আর থাকবে না।
দীর্ঘদিনের একটা সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা এখানে আসলে কাজ করে।এটা যত যাই হোক কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। বলতে পারেন কেউ, যে, কলকাতা খুব দ্রুত এগোচ্ছে না। এই যে বলছিলাম থিয়েটার নিয়ে, এই চর্চা , এটা চলতেই থাকে। এটাই বড়ো কথা। যেমন ধরা যাক, ঋত্বিক ঘটককে একটা কাজ দেখলাম এবার এসে। মেঘে ঢাকা ঘটক। খুব ভালো লেগেছে। এরকম একটা ট্রিবিউটের কথা কিন্তু ভেবেছে এই সময়ের কলকাতা। শহরটাকে এইসব জন্যেই এত ভালো লাগে। প্রাণবন্ত।

ইউরোপেও এই ব্যাপারটা আছে । খুব প্রবল ভাবেই আছে। কিন্তু চরিত্রে পুরো আলাদা। ইন্ডিভিজুয়াল চিন্তাটা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ওখানে বেশি প্রাধান্য পায়। এইটা ওদের শিল্প বিপ্লব থেকে পাওয়া চিন্তা, বিপ্লবের শিক্ষা থেকে পাওয়া চিন্তা। এইটাই বড়ো ফারাক ওদের সঙ্গে আমাদের। ওখানেও বাঙালি আছে। ওদের সমাজে যেটা প্রবল সেই ভায়োলেন্স , বা সেক্স তার পাশেপাশেই কিন্তু এটাও আছে। অন্তত এখনো আছে। কিন্তু সেকেন্ড জেনারেশনে গিয়ে সেটা কতটা থাকবে বলা যায় না। কিন্তু সব কিছু সত্বেও এই যে নতুন কিছু করার চেষ্টা, ভাবনা এটাই তো বড়ো কথা। কলকাতায় আমার আসতে ভালো লাগে কেবল এই এটারই জন্যে।