
পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রকে নিয়ে গর্ব আমাদের। কিন্তু এই গর্বের ভেতরে আসল সত্য হলো—প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকারকে সুনিশ্চিত করা। ভোট দেওয়ার অধিকারই সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করে রাখে। কিন্তু সেই অধিকার যদি একবার অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তবে গণতন্ত্রের গর্ব ভেঙে পড়ে এবং তা কাগজে লেখা শব্দ হয়ে দাঁড়ায়।
এই প্রসঙ্গে ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্ক আমাদের সামনে এসেছে যেখানে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের নাম প্রশ্নের মুখে। এই সংখ্যা নিছক কোনো পরিসংখ্যান নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মানুষের উদ্বেগ, ভয় এবং অনিশ্চয়তা। সেই মানুষদের অধিকাংশই সমাজের প্রান্তিক মানুষ যেমন কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, গৃহশ্রমিক, পরিযায়ী শ্রমিক ছোট ব্যবসায়ী—যাঁদের ভোটেই গণতন্ত্রের ভিত্তি তৈরি হয়।
শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি বলছে, ভোটার তালিকার নির্ভুলতা বজায় রাখা গণতন্ত্রের স্বার্থেই জরুরি। মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া বা সন্দেহজনক নাম যাচাই করা নির্বাচন ব্যবস্থার নিয়মিত কাজ। তাদের মতে, একটি পরিষ্কার তালিকা নির্বাচনকে আরও শক্তিশালী করবে। যুক্তিটা ভালো এবং কাগজের ভাষায় যুক্তিসঙ্গত শোনায়।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো এস আই আর প্রক্রিয়াকে এত সহজভাবে দেখছে না। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, এই ধরনের প্রশাসনিক উদ্যোগের আড়ালে পরিকল্পিত ভাবে বহু মানুষের ভোটাধিকার সংকুচিত করার চেষ্টা চলছে। তাদের বক্তব্য, বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে সামনে রেখে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে এই রাজ্যের ক্ষমতা দখল করার জন্য ভোটার লিস্টে গরমিল করছে। কংগ্রেসও প্রশ্ন তুলেছে—যদি এত বিপুল সংখ্যক নাম হঠাৎ প্রশ্নের মুখে পড়ে, তবে নির্বাচন কমিশনের উচিত পুরো প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা।
বামপন্থী দলগুলো, বিশেষ করে সিপিআই(এম), এই ঘটনাকে আরও গভীর রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখছে। তাদের বক্তব্য, যখন রাষ্ট্র নাগরিককে বারবার নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে বাধ্য করে, তখন গণতন্ত্রের ধারণাটাই সংকুচিত হয়ে পড়ে। ভারতের মতো দেশে যেখানে কোটি কোটি মানুষের কাছে জমির দলিল, জন্ম শংসাপত্র বা স্থায়ী নথি নেই, সেখানে কঠোর যাচাই প্রক্রিয়া অনেক সময় গরিব মানুষের ওপর এক ধরনের আমলাতান্ত্রিক খাঁড়া নামিয়ে এনেছে।

নির্বাচন কমিশন অবশ্য বলছে, নিয়ম মেনেই কাজ চলছে এবং কোনো বৈধ নাগরিককে স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়া হবে না। কিন্তু বাস্তব প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। একজন দিনমজুরের নাম যদি তালিকা থেকে বাদ পড়ে, তবে তাকে নথি জোগাড় করতে হবে, দফতরে দৌড়তে হবে, প্রয়োজনে আদালতের দরজায় যেতে হবে। পেটের দায়ে প্রতিদিন যে মানুষটাকে কাজে যেতে হয়, সেই মানুষটার পক্ষে এই লড়াই কতটা সম্ভব—এই প্রশ্নের উত্তর কাগজে লেখা নিয়ম দিয়ে মেলে না। সর্বোপরি যেভাবে একটি বিশেষ ধর্মের লোককে এস আই আর মাধ্যমে বহিরাগত বলে ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দিয়ে চিহ্নিত করে দেওয়া হচ্ছে, ঘুসপেটিয়া বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেটা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ক্ষেত্রে বিপজ্জনক।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা তাই আরও বড়। ভারতের গণতন্ত্র কি আস্তে আস্তে এমন এক ব্যবস্থায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে নাগরিকদের জীবন্ত উপস্থিতির চেয়ে নথির অস্তিত্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ? মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র কোনো ফাইলের ভাঁজে জন্ম নেয় না। গণতন্ত্র বাঁচে মানুষের অংশগ্রহণে। আর যদি সেই মানুষই একদিন মনে করে তার ভোটাধিকার অনিশ্চিত, তবে কাগজে যত নিখুঁত তালিকাই থাকুক না কেন—গণতন্ত্রের ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়ে যায়। রাষ্ট্র যদি নাগরিককে বারবার কাগজ দিয়ে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে বাধ্য করে, তবে গণতন্ত্রের আত্মাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গণতন্ত্রের শক্তি সন্দেহের মধ্য দিয়ে নয়, বরং বিশ্বাসের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকে। তাই নির্বাচন ব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত—মানুষকে বাদ দিয়ে নয়, যত বেশি সম্ভব মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে ভারতীয় গণতন্ত্রের ঐতিহ্যমণ্ডিত ভোট ব্যবস্থা আরো উন্নত করা।