তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
অশান্ত দুবাইতে রুদ্ধশ্বাস কটা দিন

আমি কিছু অফিসিয়াল মিটিং - এর জন্য গিয়েছিলাম দুবাইতে। বুধবার, ২৫ শে ফেব্রুয়ারি থেকে শুক্রবার, ২৭ শেষ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন মিটিংয়ের জন্যে দৌড়াদৌড়ি ছিল প্রচুর। অনেকগুলো খুবই জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। সেই ব্যস্ততায় অন্য কোনো দিকে নজর দেওয়ার উপায় ছিল না। গিয়েছিলাম এমিরেটসে। ওদের সার্ভিসই আমার পছন্দ। যাই হোক, দুবাইতে শনি রবিবার ছুটি। অন্যান্য অনেক ইসলামিক দেশে ছুটি হয় শুক্র ও শনিবার। কিন্তু দুবাইয়ের নিয়ম আলাদা।


সে যাই হোক, শনিবার, মানে ২৮ ফেব্রুয়ারি দিনটা বেশ রিল্যাক্সড ভাবেই কাটছিল। আমার ফেরার দিন ১ মার্চ। কোথাও কোনো ঝামেলার খবর ছিল না। হোটেলে বসেই নানান কাজের ফাঁকে ফাঁকে টিভি দেখছিলাম।
দুপুর সাড়ে দশটা এগারোটা পর্যন্ত সবকিছু নরমালই ছিল। তারপরে আচমকাই দেখলাম খবরের ধরন চেঞ্জ হয়ে গেল । আমি বরাবরই বিবিসির খবরটাকে প্রাধান্য দিই। সেখানেই দেখলাম যুদ্ধের খবর। ইজরায়েল আমেরিকা ইরানকে অ্যাটাক করেছে। তবে তার পরেও দুবাইতে দেখছিলাম তেমন কোনো এফেক্ট নেই। জনজীবন যেমন চলার তেমনই চলছিল।

দুপুরে শুনলাম, দুবাই এয়ারপোর্ট আংশিক বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বাকি সব নরমাল। দুপুরে বেরোলাম। কাজ বেশিরভাগ শেষ হয়ে গেলেও টুকটাক কিছু থেকেই যায়। এইসব নিয়ে চিন্তা ছিল। ট্যাক্সি নিয়ে যেতে হল প্রায় ২৫-৩০ কিলোমিটার। তখনই যেতে যেতে দেখলাম রাস্তায় লোকজন একটু কমে গেছে। এখন তো রমজান চলছে। ফলে, লোকজনের মুড রিল্যাক্সডই। ড্রাগন মার্ট বলে একটা চাইনিজ মলে গেছিলাম। সেখানেও দেখলাম লোকজন খুব সহজ স্বাভাবিক ভাবেই যাতায়াত করছে। সেরকম কোনো টেনশন তখনও কোথাও নেই।
তবে ওখানেই খবর পেলাম যে এয়ারপোর্ট বন্ধ হয়ে আছে।

এক তারিখে, মানে রবিবার সকালে খবর এল, ফ্লাইট ক্যানসেলড। পথেঘাটে লোকজন এইবার একটু কমছে। তবে আতঙ্ক বলতে যা বোঝায় সেটা কিন্তু নেই। আসলে দুবাই একটা খুব ব্যস্ত আধুনিক ব্যবসায়িক কেন্দ্র। সেখানে জনজীবন আচমকা তো ওইভাবে রুদ্ধ হতে পারে না । কিন্তু ছাপ তো একটা পড়বেই, বিশেষ করে এরকম অদ্ভুত একটা অবস্থায়। দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ খবর এল, আবু ধাবিতে মিসাইল অ্যাটাক হয়েছে। সন্ধেবেলা শুনলাম দুবাই এয়ারপোর্টেও মিসাইল অ্যাটাকের খবর। ব্যাস, এইবার আস্তে আস্তে সিচুয়েশন বদলে যেতে শুরু করল । বেশ টের পাচ্ছিলাম, চাপা একটা উত্তেজনা রয়েছে। এবং সেটাই স্বাভাবিক।

পরদিন থেকে সিচুয়েশন আরো বদলে গেল। দুবাই এখন বেশ কিছুটা থমথমে। লোকজনের মুখে , যাকে বলে আতঙ্ক, তা হয়তো নেই, কিন্তু চিন্তার ছাপ যে আস্তে আস্তে পড়ছে সেটা তখন বেশ বোঝা যাচ্ছে। পথে লোক আছে, তবে বেশি নয়। খুব কাজে না হলে বের হচ্ছে না কেউ। ঘুরে বেড়াতে তো নয়ই। ততক্ষণে বেশ চার পাঁচটা জায়গায় অ্যাটাকের খবর বাতাসে ভাসতে শুরু করেছে। দুবাই, বাহারিন, কাতার, কুয়েত ততক্ষণে আক্রান্ত। সেই দিনেই খামেইনি এবং তাঁর বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মীর নিহত হবার খবর বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে গেল সবদিকে।

সারা পৃথিবী তখন জেনে গেছে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবার খবর। আমার ফেরার কথা ছিল আগেই। কিন্তু ফ্লাইট তো আগেই ক্যানসেল হয়েছে। আমরা আটকে পড়েছি। কেউ বলতে পারছে না কবে ফের ফ্লাইট চালু হতে পারে। স্বভাবতই একটা টেনশন কাজ করছিল। আমাদের এখান থেকে বিভিন্ন টেলিভিশন এখানে ওখানে লোকের আটকে থাকার খবর ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে টেনশন প্রচুর। ভারতের এবিপি আনন্দ, টিভি নাইন, টিভি এইট্টিন, টাইমস নাউ, বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং অন্যান্য চ্যানেল থেকে বারবার ফোন আসছে, ইন্টার্ভিউ নিচ্ছে। এয়ারপোর্ট পুরো বন্ধ। খবর বলছে, এয়ারপোর্টে প্রচুর লোক আটকে পড়ে আছেন।
ফেরার দিন বলে হোটেল এক তারিখে ছাড়ার কথা। কিন্তু ছেড়ে কোথায় যাব ! ফলে, যেখানে ছিলাম অর্থাৎ হোটেল নভোটেলেই তিনগুণ টাকা দিয়ে থাকার দিন এক্সটেন্ড করতে হয়েছে ইতিমধ্যেই। যাই হোক, ২ তারিখে ফেরার টিকিট মিলল ৪ মার্চের। ফলে আরো দুদিন থাকা এক্সটেন্ড করতে হয়েছে ইতিমধ্যেই। ২ আর ৩ দুদিনই শুনলাম যুদ্ধ বাড়ছে। টিভি খুললেই কেবল অ্যাটাকের খবর আসছে নানা জায়গা থেকে।দুবাইতেও মিসাইল হানার খবর এল। বুঝলাম, পাল্টা প্রতিরোধ হলেও মিসাইলের বর্জ্য তো ছিটকে যাচ্ছে।
তিন তারিখেই খবর এল ৪ তারিখের ফ্লাইট ক্যানসেল হয়ে গেছে। কবে আবার ফ্লাইট ছাড়তে পারে কেউ বলতে পারছে না। দিনদিন দুবাইয়ের অবস্থাও আরো থমথমে হয়ে আসছে। স্কুল, কলেজ হয়ত অফিসিয়ালি বন্ধ নয়, কিন্তু আনঅফিসিয়ালি বন্ধই। এই ঝামেলার মধ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়তে স্কুলে-কলেজে পাঠাবে কে , আর পড়াতেই বা আসবে কে ! মেট্রো চলছে খবর আসছিল, কিন্তু দারুণ ভিড়। সাধারণ মানুষের ওটাই এখন প্রধান বাহন। আমার একজন বন্ধু কাম বিজনেস অ্যাসোসিয়েট থাকেন আবু ধাবি আর দুবাইয়ের মাঝামাঝি। আমায় ঐ বন্ধুই ২৭ তারিখে আবু ধাবি ঘুরিয়ে এনেছিলেন ওঁর গাড়িতে। এখন ও আর ইচ্ছে থাকলেও আসতে পারছিল না। সব আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে এসেছে। ২৮ তারিখ থেকে শুনলাম বুর্জ খলিফাও বন্ধ। স্বাভাবিক, কারণ বুর্জ খলিফার আশেপাশে মিসাইল অ্যাটাক হয়েছে বলে কানে এল। সারা দিনই হোটেলের লবিতে বসে থাকি, আর খবর দেখি। ৩ তারিখ দোল গেল। ৪ তারিখ হোলি। ৪ তারিখে কলকাতায় আমার মেয়েকে কলকাতার এমিরেটস অফিসে পাঠালাম। অনেক কাকুতি মিনতির পর ৬ তারিখে মুম্বইয়ের টিকিট মিলল। ওখান থেকে ফের ফ্লাইট ধরে কলকাতায় ফিরতে হবে। সে-ও নাহয় হল, কিন্তু ৫ তারিখে শুনলাম সেটাও আবার ক্যান্সেলড। আস্তে আস্তে টের পাচ্ছিলাম কী ভয়াবহ বিপদ ঘনিয়ে আসছে। এদিকে যুদ্ধের অবস্থা, যত সময় যাচ্ছে, ঘোরালো হচ্ছে। দুবাইয়ের মতো শহরও এবার মনে হচ্ছিল অচল হতে চলেছে। কিছুই বন্ধ নেই, কিন্তু কোথাও লোক নেই, ফলে কাজ হবে কী করে ! কী করা যায় ভাবতে ভাবতে মেয়েকে ফের পাঠালাম কলকাতার এমিরেটস অফিসে। যদি কোনো উপায় বার করা যায় ! মেয়ের মুখেই শুনলাম, দোল হোলি সব যেহেতু শেষ, সব কিছু খুলেও গেছে , ফলে এমিরেটসের অফিসে বেজায় ভিড়। যে যেখানে আটকে আছে, সেখান থেকে ফেরার উপায় জানতে তাঁদের আত্মীয়-স্বজন ভিড় করছেন এমিরেটসের অফিসে। দুবাইতে বসেই ফোন করলাম এক বন্ধুকে, যিনি
আদানিদের অফিসে কাজ করেন। তিনি বললেন, যতটা পারবেন চেষ্টা করবেন।
মেয়েই জানাল, তখন নাকি ৭ তারিখের বেঙ্গালুরুর টিকিট পাওয়া যাচ্ছে। বললাম সেটাই নিয়ে নিতে। কারণ তখন পর্যন্ত ভারতের সব জায়গায় এমিরেটস ফ্লাইট চালালেও কলকাতারটা চালায়নি। ভাবলাম বেঙ্গালুরু তো যাই, তারপর না হয় ফেরার ব্যবস্থা করে নেওয়া যাবে।

এরমধ্যে বন্ধু আবু ধাবি থেকে এসে দেখা করে গেলেন। ওর বাড়ির পাশেও শুনলাম, মিসাইল ডেব্রি পড়েছে। অবস্থা শোচনীয়। তাও তিনি জানালেন, ৭ তারিখ ফ্লাইট ঠিক থাকলে তিনি এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেবেন। এদিকে দুবাইয়ের অবস্থা একরকম, কোনো উন্নতি নেই। সব খোলা, অথচ প্রাণ নেই। নানান খবর আসছে এখান থেকে ওখান থেকে। যে হোটেলটাতে উঠেছিলাম, সেটা যেহেতু তারকা হোটেল, ফলে শয়ে শয়ে মানুষ আসছেন, যাচ্ছেন, থাকছেন। সারাদিন সময় কাটছে হোটেলের লবিতেই, দেশী, বিদেশী মুখের মিছিল দেখে।
৬ তারিখে হোটেলে বসে বসে একঘেয়ে লাগছিল বলে ভাবলাম কাছাকাছি কোথাও ঘুরে আসা যাক। যা হবার হবে। সামনেই মেট্রো স্টেশন। মেট্রোয় চড়ে বুর্জুমান মলে গেলাম। প্রায় ফাঁকা মল। সময় কাটাচ্ছি। কী করব ! হঠাৎ কলকাতা থেকে খবর এল, ৭ তারিখে প্রথম দুবাই-কলকাতা এমিরেটসের ফ্লাইট যাচ্ছে। এদিকে ওই ৭ তারিখেই আমাদের বেঙ্গালুরুর টিকিট। এমিরেটসে কথা বলে জানা গেল, ফ্লাইট নাকি ৭ আর ৮ দুদিন যাবে। কিন্তু ৭ তারিখে কোনো টিকিট নেই। চাইলে ৮ তারিখ যেতে পারি। ৮ তারিখ ফের ফ্লাইট ক্যানসেলড হবে কিনা তার কী গ্যারান্টি। এইবার খুব মাথা গরম হয়ে গেল। ফোনে রীতিমত ঝগড়া করলাম। সঙ্গে কাকুতি মিনতিও। শারীরিক সমস্যার কথাও বললাম। ফোনের ওদিকের মহিলা, শুনলাম ওঁদের কাস্টমার কেয়ার অফিস নাকি মুম্বইতে, সেখানেই বসেন, একটু নরম হয়ে আমায় ৭ তারিখের টিকিটের ব্যবস্থা করে দিলেন। তখন রাত এগারোটা। পরদিন দুপুর একটায় শুনলাম ফ্লাইট। ভীষণ আনন্দ হল। মনে শান্তি পেলাম। তখন তো আর জানতাম না যে পরদিনও বেশ কিছু ক্লাইম্যাক্স অপেক্ষায় আছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার টিভি চ্যানেলগুলোতে সাক্ষাৎকার দিতে হল। চ্যানেলগুলো কলকাতায় আমার বাড়িতেও যোগাযোগ করে ইন্টারভিউ আগেই নিয়ে গেছে।
যাইহোক, ৭ তারিখ অনেক তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু গিয়ে যা দেখলাম, তাতে মাথা ঘুরে গেল। গাড়ি চালাচ্ছিলেন একজন পাকিস্তানি ড্রাইভার। হোটেল থেকেই গাড়ি নিয়েছিলাম। বন্ধুকে আর ডাকিনি। দেখলাম, এয়ারপোর্ট ঘিরে রেখেছে মিলিটারি। গাড়ি দাঁড়াতেই দিচ্ছে না প্রায়। থামাতে তো নয়ই। ড্রাইভার খবর নিয়ে জানালেন, এয়ারপোর্টে মিসাইল হানা হয়েছে। সব বন্ধ। ছড়িয়ে থাকা ভাঙা টুকরোও দেখা গেল। স্বভাবতই এয়ারপোর্ট বন্ধ। যেহেতু হোটেল থেকেই গাড়ি নিয়েছিলাম, ড্রাইভার বলল হোটেলেই ফিরে যাবার কথা। এই মুহূর্তে কিছুটা হয়তো থার্ড সেন্স কাজ করছিল। বললাম, এখানে কোথাও নামিয়ে দাও। এয়ারপোর্টের অদূরেই আইবিস এয়ারপোর্ট হোটেল। ওখানেই গেলাম, আমি ও আমার সঙ্গে থাকা সহকর্মী লবিতে অপেক্ষা করতে লাগলাম । অনেক লোক। সবাই অপেক্ষা করছেন, চারপাশে কী হয় কী হয় আশঙ্কা।
এরই মধ্যে ফ্লাইট সাসপেনশনের খবর মোবাইলে চলে এল। সিডিউলড ফ্লাইট ছাড়তে তখনও দু'ঘণ্টা বাকি। কিছুটা রিস্ক নিয়েই সামনের ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে একজন ড্রাইভারকে ডেকে বললাম, চলুন তো দেখে আসি সরেজমিনে। অপেক্ষমান সহকর্মীকে বলা থাকল, যদি এয়ারপোর্ট খুলে যায়, তাহলে সে যেন আমার ফোন পেয়েই লাগেজ নিয়ে চলে যায়।
দেখলাম, এয়ারপোর্টের মূল রাস্তায় তখন গাড়ির একেবারে ঢল নেমেছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মিলিটারি অফিসাররা প্রচন্ড সার্চ করে তবে যেতে দিচ্ছে। যাইহোক, ড্রাইভার বুদ্ধি করে পেছন দিক দিয়ে নিয়ে গেল একদম বিজনেস ক্লাস গেটে। আমারও টিকিট বিজনেস ক্লাসেরই। দেখলাম, ঢোকা ফের শুরু হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সহকর্মীকে ফোন করে বলে দিলাম, এক্ষুনি সব লাগেজ নিয়ে চলে আসতে। কিন্তু ও জানাল, কোনো গাড়ি যেতে চাইছে না। নিরুপায় হয়ে ফের আমার সেই ট্যাক্সি নিয়েই হোটেলে গিয়ে তাকে নিয়ে আসতে হল। এয়ারপোর্টে ঢুকে দেখলাম, একেবারে মাছের বাজার হয়ে গেছে। একটার ফ্লাইট ছ ঘন্টা লেট হয়ে ছাড়ল সেই সাতটায়। তারপর মাঝরাতে কলকাতা। বাড়ি ফেরার আনন্দ।


Scroll to Top